default-image

২০ ফেব্রুয়ারি তিনটার দিকে আমরা যখন মধুর ক্যান্টিনে বসে স্বেচ্ছাসেবকের তালিকা তৈরি করছিলাম, তখন মাইকযোগে পূর্ববঙ্গ সরকারের তরফ থেকে ১৪৪ ধারা জারির ঘোষণা করা হয়। সন্ধ্যায় সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে ফকির সাহাবুদ্দিন আহমদের (স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অ্যাটর্নি জেনারেল) সভাপতিত্বে একটি সভা হয়। সভায় স্থির হয় যে ১৪৪ ধারা মেনে নেওয়া হবে না। ১৪৪ ধারা অমান্য করতে হবে এবং এ সিদ্ধান্ত সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের সভায় জানিয়ে দিতে হবে। অনুরূপভাবে ফজলুল হক মুসলিম হলেও আবদুল মোমিনের (স্বাধীনতার পর খাদ্যমন্ত্রী) সভাপতিত্বে একটি সভা হয়। ওই সভাতেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে ১৪৪ ধারা মেনে নেওয়া চলবে না। ফজলুল হক মুসলিম হলে তখন সহসভাপতি ছিলেন শামসুল আলম ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আনোয়ারুল হক খান (ফজলুল হক হলের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক। পরে বাংলাদেশ সরকারের সচিব)।

২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার পর নবাবপুর আওয়ামী মুসলিম অফিসে আবুল হাশিমের সভাপতিত্বে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের সভা আরম্ভ হয়। অলি আহাদ, মেডিকেল কলেজের সহসভাপতি গোলাম মাওলা ও আবদুল মতিন—এঁরা সবাই ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে জোর বক্তব্য দেন এবং এঁদের সমর্থন করেন ফজলুল হক মুসলিম হল ইউনিয়নের সহসভাপতি শামসুল আলম। মোহাম্মদ তোয়াহা যদিও ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে তাঁর বক্তব্য পেশ করেছিলেন, কিন্তু যেহেতু কমিউনিস্ট পার্টির সিদ্ধান্ত ভিন্ন রকম ছিল, সেহেতু তিনি ভোটাভুটির সময় ভোটদানে বিরত থাকেন। ফলে ১১-৪ ভোটে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ সিদ্ধান্ত নেয় যে ১৪৪ ধারা ভাঙা হবে না।

ভোটাভুটির পরও অলি আহাদ দৃঢ়কণ্ঠে বললেন, ‘এ সিদ্ধান্ত আমরা মানি না এবং আগামীকাল বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ছাত্রসভা হবে, সে ছাত্রসভায় ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে যদি রায় হয়, তবে আমরা ভাঙার পক্ষে।’

বিজ্ঞাপন
default-image

সেদিন রাতে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের সিদ্ধান্ত ‘১৪৪ ধারা ভাঙা হবে না’—এ সংবাদটুকু পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন হলে যোগাযোগ করা হলো। রাত প্রায় ১২টার দিকে ফজলুল হক হল ও ঢাকা হলের (বর্তমানে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্​ হল) মাঝখানে যে পুকুর আছে, তার পূর্ব পাড়ের সিঁড়িতে বিভিন্ন হলের নেতৃস্থানীয় ছাত্রদের নিয়ে ১৪৪ ধারা ভাঙার প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য এবং ২১ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি স্থির করার জন্য আমরা এক বৈঠকে মিলিত হই।

বৈঠকে স্থির হলো, যেকোনো মূল্যেই হোক, আমরা ১৪৪ ধারা ভাঙবই। ১৪৪ ধারা ভাঙতে গিয়ে আমাদের কতগুলো কৌশলগত কাজ করতে হবে। আমরা একটা কথা গভীরভাবে ভাবছিলাম, যেহেতু আওয়ামী মুসলিম লীগ ১৪৪ ধারা ভাঙার বিপক্ষে, সেহেতু যদি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের কোনো সদস্য বা নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রসভায় সভাপতিত্ব করেন, তবে তিনি হয়তো ১৪৪ ধারা ভাঙার বিপক্ষে মতামত দিতে পারেন এবং ফলে একটা বিভ্রান্তিকর পরিবেশের সৃষ্টি হতে পারে। সে জন্য বৈঠকে প্রথমেই স্থির করা হলো, আমাকেই আমতলার সভায় সভাপতিত্ব করতে হবে। বৈঠকে আরও একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়: সভা শুরু হওয়া মাত্র শামসুল হক সাহেবকে বক্তৃতা করতে দেওয়া হবে এবং তার পরে বক্তৃতা করতে দেওয়া হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক আবদুল মতিনকে। এরপর আমি সভাপতি হিসেবে ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে বক্তব্য রাখব এবং ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত জানিয়ে সভার কাজ শেষ করব।

সে রাতের বৈঠকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তা হলো আন্দোলনে যাঁরা নেতৃত্ব দেবেন, তাঁদের মধ্যে একমাত্র মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ছাড়া পারতপক্ষে আর কেউ গ্রেপ্তারবরণ করবেন না। আন্দোলনের স্বার্থের খাতিরে তাঁদের বাইরে থাকার চেষ্টা করতে হবে। কেননা, সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতেই সংগ্রামী ছাত্রনেতাদের অংশটি আন্দোলনকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে গ্রেপ্তার এড়িয়ে যাওয়া প্রয়োজন।

২০ ফেব্রুয়ারির রাতের বৈঠক শেষ হলো। রাত সাড়ে তিনটার সময় বিশ্ববিদ্যালয় জিমনেসিয়াম গ্রাউন্ডের মধ্য দিয়ে মেডিকেল কলেজের ভেতরে ঢুকি এবং রাতের শেষ সময়টুকু বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে কাটিয়ে দিই। তারপর ভোর হলো। সূর্য উঠল। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আমি একা, নিঃসঙ্গ। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয় গেট পার হয়ে প্রথম ভেতরে ঢুকলেন মোহাম্মদ সুলতান। তাঁর সঙ্গে এস এ বারী এ টি এবং আরও দুজন। তাঁদের নাম মনে পড়ছে না।

সকাল আটটার মধ্যে দেখি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ‘কর্ডন’ করা হয়েছে। আটটার কিছু পর থেকেই বিভিন্ন হল ও স্কুল–কলেজ থেকে দুজন দুজন করে ছাত্রবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় জমায়েত হতে শুরু করেন। সাড়ে নয়টার মধ্যে বেশ কিছুসংখ্যক ছাত্র হাজির হলেন। এ সময়ে শামসুল হকও এসে উপস্থিত হন। তিনি এসে মধুর রেস্তোরাঁয় বসলেন এবং সেখানে উপস্থিত সব ছাত্রকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন, ‘১৪৪ ধারা ভাঙা ঠিক হবে না, সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা মেনে চলা উচিত। নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনই আমাদের করা উচিত।’ কিন্তু তাঁর এ বক্তব্য শোনার মতো মানসিক অবস্থা তখন ছাত্রদের ছিল না। ছাত্ররা উত্তেজিত হয়ে শামসুল হককে নানা প্রশ্ন করছিল। তিনি যথাসাধ্য ছাত্রদের বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন।

এ সময়ের আরও একটি ঘটনা মনে পড়ে। আমানুল্লাহ খান নামে একজন দীর্ঘদেহী উন্নতনাসা। তিনি বেঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে বক্তৃতা শুরু করে দেন। সমস্ত পরিবেশ ছিল উত্তেজনা ও বিশৃঙ্খলাপূর্ণ। এরপর একটি ছোট্ট চেয়ার নিয়ে আমতলায় রাখা হলো। ৪ ফেব্রুয়ারি বেলতলাতে দাঁড়িয়ে ২১ ফেব্রুয়ারিতে যে ধর্মঘট এবং মিছিলের আহ্বান জানানো হয়েছিল, ২১ ফেব্রুয়ারিতে বেলা ১১টা থেকে সাড়ে ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলাতে সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে সভা আরম্ভ হলো। সভাপতি হিসেবে আমার নাম প্রস্তাব করেন এম আর আখতার মুকুল, সমর্থন করেন কমরুদ্দিন শহুদ।

বিজ্ঞাপন

সভাপতি হিসেবে আমি প্রথমে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের পক্ষ থেকে শামসুল হককে তাঁর বক্তব্য দেওয়ার জন্য আহ্বান জানাই। কিছু ছাত্র এতে বাধা দিলেও শেষ পর্যন্ত তিনি তাঁর বক্তব্য দেন। এরপর আবদুল মতিনকে বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির পক্ষ থেকে বক্তব্য দেওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়। আবদুল মতিন শান্তভাবে যুক্তি দিয়ে ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে বক্তব্য দেন।

সবশেষে সভাপতি হিসেবে আমি আমার বক্তব্য দিই। আমার মনে পড়ে, আমি বেশ উত্তেজিত হয়েই পড়েছিলাম। আমার সেদিনের বক্তব্যের সব কথা মনে পড়ে না। যুক্তির চেয়ে আবেগই ছিল বেশি। আমার বক্তৃতা শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে চারদিক থেকে ধ্বনিত হলো, ‘১৪৪ ধারা মানি না, মানি না।’

ঠিক এমন সময় আবদুস সামাদ চিৎকার করে বললেন, ‘আমরা সত্যাগ্রহ করব এবং কীভাবে করব, কতজন করে?’ তিনি একটি প্রস্তাবও আনলেন—১০ জন ১০ জন করে সত্যাগ্রহ করা হবে—১৪৪ ধারা ভাঙা হবে। প্রস্তাবটি গৃহীত হলো। সত্যাগ্রহীরা শান্তিপূর্ণভাবে ভাষার দাবিতে স্লোগান দিয়ে পরিষদ ভবনের দিকে যাবে।

মোহাম্মদ সুলতানকে ডেকে বলা হলো, যেসব সত্যাগ্রহীর দল বাইরে যাবেন, তাঁদের প্রত্যেকের নাম–ঠিকানা লিখে রাখার জন্য, যাতে পরে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে সহজেই নাম–ঠিকানা পাওয়া যায়। মোহাম্মদ সুলতান বিশ্ববিদ্যালয় গেটে চলে গেলেন। বিশ্ববিদ্যালয় গেট তখন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সত্যাগ্রহীরা একেকটি দলে বের হচ্ছে, আর সুলতান নাম লিখে চলেছেন, তাঁকে সাহায্য করছেন জনাব আজহার (কাজী আজহার আলী, পরে শিক্ষাসচিব)। হাসান হাফিজুর রহমানও গেটে দাঁড়িয়ে সত্যাগ্রহীদের নামগুলো ঠিক করে দিচ্ছিলেন। প্রথম দলের নেতৃত্ব পূর্বসিদ্ধান্ত মোতাবেক মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বেই প্রথম সত্যাগ্রহীর দলটি বেরিয়ে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয় দলের নেতৃত্ব দিয়ে ইব্রাহীম তাহা ও আবদুস সামাদ বাইরে বেরোলেন। তৃতীয় দল নিয়ে বেরোলেন আনোয়ারুল হক খান এবং আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। তিনটি সত্যাগ্রহী দলকেই পুলিশ গ্রেপ্তার করে এবং ট্রাকে তুলে নেয়। এ সময় পুলিশের তরফ থেকে গেটে একটি হামলা ও লাঠিচার্জ হয়।

লাঠিচার্জের পরিপ্রেক্ষিতে আরেকটি সিদ্ধান্ত আমরা নিলাম: চতুর্থ যে দলটি যাবে, তা যাবে শাফিয়ার (ড. শাফিয়া খাতুন, পরে মন্ত্রী) নেতৃত্বে। এই দলে বেশ কয়েকজন ছাত্রী ছিলেন। এঁদের সবার নাম মনে পড়ছে না। ড. শাফিয়া, সুফিয়া ইব্রাহিম (শিক্ষাবিদ সুফিয়া আহমেদ), রওশন আরা বাচ্চু, শামসুন নাহারসহ আরও কয়েকজন ছিলেন। পুলিশ এ সময় লাঠিচার্জ করে এবং কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। রওশন আরা বাচ্চু, ড. শাফিয়া প্রমুখ বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন পুলিশ তাঁদের ওপর লাঠিচার্জ করে।

মেয়েদের সত্যাগ্রহীর দলটি বেরিয়ে যাওয়ার পরপরই এস এ বারী এ টি, শামসুল হক, আনোয়ারুল আজিম (পরে ছাত্র ইউনিয়নের সম্পাদক) সাইয়িদ আতীকুল্লাহ (কবি), সৈয়দ ফজলে আলীর নেতৃত্বে আরও দুটি সত্যাগ্রহী দল বের হয়ে যায় এবং এর পরই দলে দলে ছাত্ররা পুলিশি হামলা এবং বাধা উপেক্ষা করে বেরিয়ে আসতে থাকে। (সংক্ষেপিত ও ঈষৎ পরিমার্জিত)

গাজীউল হক (আবু নছর মোহাম্মদ গাজীউল হক): আইনজীবী, রাজনীতিক, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও লেখক।

ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি, মহান একুশে সুবর্ণজয়ন্তী গ্রন্থ (উপদেষ্টা সম্পাদক আবদুল মান্নান সৈয়দ, সম্পাদক মাহবুব উল্লাহ, অ্যাডর্ন পাবলিকেশন, ২০০৮) গ্রন্থ থেকে

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন