বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

১৫০ দিনের মধ্যে শ্রম আদালতের মামলা নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে। অথচ হোসেন আহমেদ ও বিল্লাল হোসেনের মতো হাজারো শ্রমিকের মামলা বছরের পর বছর ঝুলে আছে। চট্টগ্রাম শহর থেকে নিজের বাসা বাঁশখালীতে আসা-যাওয়া করতে করতে ক্লান্ত হোসেন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘কবে শ্রমিকদের টাকা উদ্ধার হবে, জানি না। অনেকেই বিচারের আশা ছেড়ে দিয়েছেন।’

বিল্লাল হোসেন বলেন, ২০১২ সালে দ্বিতীয় শ্রম আদালত মামলা করেন। মামলার খোঁজ নিতে বেশ কয়েকবার চট্টগ্রাম এসে ফিরে যান। এরপর আইনজীবীর মাধ্যমে মামলা পরিচালনা করছেন। আদালত সূত্র জানায়, বিল্লালের মামলায় পাঁচজনকে দ্বিতীয় পক্ষ (বিবাদী) করা হয়। মামলা দায়েরের পর থেকে শুধু দ্বিতীয় পক্ষের একজনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়জনের সাক্ষ্যের জন্য তারিখ রয়েছে।

হোসেন আহমেদের করা মামলাটি সাক্ষীদের ৩৪২ ধারায় পরীক্ষার জন্য রয়েছে। জেলার আনোয়ারা, বাঁশখালী, সাতকানিয়া, চকরিয়া সড়ক যানবাহন শ্রমিক ইউনিয়নের ১৭ লাখ ৮৯ হাজার ৪৭৯ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলাটি করা হয়েছিল। শ্রমিকদের জমানো এই টাকার ভবিষ্যৎ কী জানেন না বলে জানান কয়েকজন শ্রমিক।

আইনজীবীরা জানিয়েছেন, শ্রম আদালতে মামলা করার ৬০ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে। তবে এই সময়ের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি না হলে উপযুক্ত কারণ ব্যাখ্যা করে আরও ৯০ দিন সময় পাওয়া যাবে। শ্রম আদালতে নিষ্পত্তি হওয়া মামলায় ঢাকায় শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে আপিল করা যায়।

চট্টগ্রামের প্রথম শ্রম আদালতের আওতায় চট্টগ্রাম জেলাসহ রয়েছে কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী ও চাঁদপুর। চট্টগ্রামের দ্বিতীয় শ্রম আদালতের আওতায় রয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলা। অবশ্য ২০১৯ সালের জুন মাসে সিলেটে একটি শ্রম আদালত চালু হয়। এর আগে সিলেট বিভাগের ওই চার জেলার যেসব মামলা চট্টগ্রামে হয়েছে, সেগুলো চট্টগ্রামেই বিচার হবে।

চট্টগ্রামের দুটি শ্রম আদালতে এখন ২ হাজার ৪৪৯টি মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে প্রথম শ্রম আদালতে মামলা রয়েছে ১ হাজার ৭৮৭টি এবং দ্বিতীয় শ্রম আদালতে ৬৬২টি। এর মধ্যে ১ হাজারের বেশি মামলা রয়েছে, যেগুলো ছয় থেকে আট বছরেও নিষ্পত্তি হয়নি। দুটি আদালতে এক বছরে (গত বছরের মে থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত) নিষ্পত্তি হয়েছে ৫৭০টি।

চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ এলাকার একটি সরকারি বাড়িতে দুটি শ্রম আদালতের কার্যক্রম চলে। ২৭ এপ্রিল দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, আইনজীবী, বিচারপ্রার্থীরা রয়েছেন। দুটি আদালতে শুনানি চলছে।

আদালত প্রাঙ্গণে কথা হয় একটি কারখানার শ্রমিক ঝর্ণা দাসের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ২০১৪ সালে মামলা করেন। এখনো মালিকপক্ষের কেউ হাজির হননি। যার কারণে মামলাটি ঝুলে আছে। ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা পাওনা আদায়ের জন্য মামলা করেছিলেন তিনি।

একই অবস্থা আরেক কারখানার শ্রমিক মেজবাহ উদ্দিনের। আদালত প্রাঙ্গণে ঘুরতে দেখা যায় তাঁকে। ৬ লাখ টাকা পাওনা আদায়ের জন্য কারখানার মালিকের বিরুদ্ধে মামলা করেন তিনি। মেজবাহউদ্দিন বলেন, করোনার বন্ধ, বিচারকশূন্যতা, মালিক–শ্রমিক প্রতিনিধিদের অনুপস্থিতি, বারবার সময়ের আবেদন—এসব কারণে তাঁর মামলাটি ঝুলে আছে।

আদালত সূত্র জানায়, দুটি আদালতই কিছুদিন পরপর বিচারকশূন্য থাকায় মামলাজট বেড়ে যায়। অবশ্য এখন দুটি আদালতে বিচারক রয়েছেন। পাঁচ বছর ধরে দুটি শ্রম আদালতে রেজিস্ট্রারও ছিল না। প্রথম শ্রম আদালতে রেজিস্ট্রার থাকলেও দ্বিতীয় শ্রম আদালত রেজিস্ট্রারশূন্য। সেখানে হিসাবরক্ষক, অফিস সহকারীসহ কয়েকটি পদ খালি রয়েছে।

আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিচারকশূন্যতা, মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধিদের অনুপস্থিতি, সমন জারিতে দেরি, জবাব দাখিলে আইনজীবীদের বারবার সময় নেওয়া, প্রতিনিধিদের মতামত প্রদানে দেরির কারণে শ্রম আদালতে বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন মামলার বিচার ঝুলে আছে।

৩০ বছর ধরে চট্টগ্রাম শ্রম আদালতে মামলা পরিচালনা করে আসছেন আইনজীবী সুখময় চক্রবর্তী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতার মাধ্যমে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব। সামান্য পাওনা টাকার জন্য অনেক শ্রমিককে আদালতে ঘুরতে হয়। শ্রমিকদের সামান্য পাওনা মামলা ছাড়াই মালিকপক্ষের দিয়ে দেওয়া উচিত বলে মনে করেন এই আইনজীবী।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন