কুষ্টিয়ায় বিআরবি গ্রুপের তিনটি প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ এবং একই গ্রুপের আরেকটি প্রতিষ্ঠানের নামে হাসপাতাল করার জন্য কৃষকদের প্রায় ১৬ একর তিন ফসলি জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। অধিগ্রহণের জন্য নোটিশও দিয়েছে জেলা প্রশাসন।
কিন্তু ‘কৃষি জমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন-২০১১-এর ৪(১) এর ক, খ, গ ও ঘ উপধারায় বলা আছে, “বাংলাদেশের সকল কৃষি জমি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে জমির ব্যবহারভিত্তিক শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না। এক বা একাধিক ফসলি যাই হোক না কেন তা কৃষি জমি হিসেবেই ব্যবহার করতে হবে; কৃষি জমি নষ্ট করে ঘরবাড়ি, শিল্প-কারখানা, ইটের ভাটা এমনকি সরকারি-বেসরকারি অফিস ভবন, বাসস্থান, কোনও ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ বা অন্য কোনও অকৃষি খাতে ব্যবহার করা যাবে না। এই আইনের ব্যত্যয় ঘটলে বা কেউ অমান্য বা লংঘন করলে সেই প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী ব্যক্তিবর্গ কিংবা সহায়তাদানকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাগণের অনূর্ধ্ব দুই বছর কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা হতে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।”’
ফসলি জমি অধিগ্রহণ চেষ্টার প্রতিবাদে ভূমির মালিকেরা মানববন্ধন করেছেন।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানগুলো জমি ক্রয় করতে না পেরে সরকারের কাছে অধিগ্রহণের জন্য আবেদন করেছে।
কাগজপত্র ঘেঁটে জানা গেছে, কুষ্টিয়া শহরতলিতে অবস্থিত বিআরবি কেব্ল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড সম্প্রসারণের জন্য ১০ দশমিক ৭৪ একর, এমআরএস ইন্ডাস্ট্রিজের জন্য ৩ দশমিক ৬৩ একর এবং বিআরবি এনার্জি লিমিটেডের জন্য ১ দশমিক ৬৮ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করে। একই গ্রুপের কিয়াম-ছিরাতুন্নেছা মেমোরিয়াল ট্রাস্ট ছিরাতুন্নেছা মেডিকেল সেন্টার স্থাপনের জন্য কুষ্টিয়া শহরের চৌড়হাস মৌজায় জেলা প্রশাসনের নোটিফাইড এলাকায় ব্যক্তিমালিকানার ২ দশমিক ২২ একর এবং আরও দশমিক ০৩ একর জমি অধিগ্রহণের আবেদন করে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নোটিফাইড এলাকার জমির এক মালিক বলেন, ‘কোরবানির ঈদের আগে মজিবর রহমান ওরফে মজনু (বিআরবি গ্রুপের চেয়ারম্যান) জমি কেনার কথা বলে ডেকেছিলেন। দরদাম নিয়ে এখনো কথা চলছে। এর মধ্যেই জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। আমরা জমি অধিগ্রহণ করতে দিতে চাই না। অধিগ্রহণ হলে জমির প্রকৃত দাম পাওয়া যাবে না।’
কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়কের বাঁ দিকে কুষ্টিয়া শহরতলির কুমারগাড়া ও টাকিমারা এলাকায় বিসিক শিল্পনগরীতে বিআরবি গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো সারিবদ্ধভাবে গড়ে উঠেছে। চারটি প্রতিষ্ঠানের পেছনে (পূর্ব ও দক্ষিণে) টাকিমারার বিশাল মাঠ। এই মাঠের জমি ব্যক্তিমালিকানাধীন। এ জমিতে ধানসহ বিভিন্ন ধরনের ফসল আবাদ হয়। ওই মাঠে গিয়ে কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন বলেন, প্রায় তিন মাস আগে স্থানীয় কয়েক ব্যক্তির মাধ্যমে মজনু সাহেব তাঁর কার্যালয়ে তাঁদের (জমির মালিক) ডেকেছিলেন। কারখানা সম্প্রসারণের জন্য জমি কেনার আগ্রহ দেখান তিনি। কিন্তু জমির দাম নিয়ে বনিবনা না হওয়ায় তাঁরা চলে আসেন। এমনকি কয়েকজন মালিক জমি বিক্রিতে অনীহা দেখান। তবে সরকারিভাবে এসব জমি অধিগ্রহণের বিষয়টি তাঁদের জানা নেই।
জমির আরেক মালিক বলেন, ওই মাঠে ধানসহ নানা ধরনের ফসল খুব ভালো হয়। এবার ধানের ভালো ফলন হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যে সেখানে গমের আবাদ করবেন। তিনি কখনোই জমি বিক্রি করবেন না। তিনিসহ আরও কয়েকজন অভিযোগ করেন, মজনু সাহেব ক্ষমতার দাপটে সব তিন ফসলি জমি অধিগ্রহণ করাচ্ছেন।
গত ২৫ জানুয়ারি কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়কে বিআরবি গ্রুপের কিয়াম মেটাল কারখানার সামনে জমি অধিগ্রহণের প্রতিবাদে কৃষকেরা মানববন্ধন করেন। সেসময় তাঁরা ফসলি জমি রক্ষার দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে খোলা চিঠি বিলি করেন।
খোলা চিঠিতে বলা হয়, বিআরবি কেব্লের স্বার্থে এবং এলাকার উন্নয়নের জন্য কৃষকেরা এর আগে অনেক জায়গা দিয়েছেন। এভাবে তারা বড় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এখন তিন ফসলি জমি অধিগ্রহণের জন্য তারা হাত বাড়িয়েছে। এ জমি অধিগ্রহণ করা হলে কুমারগাড়া, জগতি, বটতলা, টাকিমারা, চৌড়হাস এলাকার কৃষকদের ৯০০ পরিবার ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ওই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া কৃষক আহমদ উল্লাহ বলেন, ‘আমার ১ একর ২৭ শতক তিন ফসলি জমি আছে। এটা চইলি গিলি, কাইড়ি নিলি আত্মহত্যা করা ছাড়া উপায় থাকবে না। না খাইয়ি মরা লাগবি।’ জাফর আলী জানান, তাঁর তিন বিঘা জমি আছে। এর আগেও তিনি জমি দিয়েছেন। এই জমি চলে গেলে আবাদ বন্ধ হয়ে যাবে।
জেলা প্রশাসক সৈয়দ বেলাল হোসেন বলেন, জমি অধিগ্রহণের আবেদন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে দুবার শুনানি হয়েছে। শুনানিতে তিনি উপস্থিত ছিলেন। প্রথম দিনের শুনানি সম্পর্কে তিনি বলেন, সেখানে বেশির ভাগ কর্মকর্তা জমি অধিগ্রহণে অনীহা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু পরের শুনানির দিন সবাই জমি অধিগ্রহণে সম্মতি দেন। জেলা প্রশাসক আরও বলেন, নোটিফাইড এলাকায় জমি অধিগ্রহণে তিনি রাজি ছিলেন না।
জানতে চাইলে বিআরবি গ্রুপের চেয়ারম্যান মজিবর রহমান বলেন, ‘জমি অধিগ্রহণ করছে জেলা প্রশাসন, সেটা তাদের বিষয়।’

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন