বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

গত বৃহস্পতিবার ৮৩৪টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ভোট গ্রহণ করা হয়। নির্বাচনে অনিয়ম, হামলা ও সংঘর্ষের কারণে বেশ কিছু ইউনিয়নের ভোটের ফল স্থগিত রয়েছে।প্রথম আলো ৭৪৫টি ইউপির ভোটের ফল বিশ্লেষণ করেছে। এতে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা ৪১১টি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে জয়ী হয়েছেন। দলের বিদ্রোহী প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন ২০৬টি ইউনিয়নে। এ নির্বাচনে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়ে বিএনপির প্রার্থীরা জিতেছেন ৬৪টি ইউনিয়নে। আর জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলনসহ বিভিন্ন দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জিতেছেন ৬৪টি ইউনিয়ন পরিষদে।

২০৬টি ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থীর জয় এবং দলীয় প্রার্থীর পরাজয়ের পেছনে মনোনয়ন-বাণিজ্যের প্রভাব রয়েছে বলে মনে করেন মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি তাহমিনা সিদ্দিকা। তিনি সংরক্ষিত নারী আসনেরও সাংসদ।

তাহমিনা সিদ্দিকা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা উপজেলা আওয়ামী লীগ থেকে যাঁদের নামের তালিকা কেন্দ্রে পাঠিয়েছিলাম, সেটা পরিবর্তন হয়ে গেছে। তখনো আমরা বলেছিলাম, এক প্রভাবশালী ব্যক্তি তাঁর ইচ্ছেমতো টাকার বিনিময়ে মনোনয়ন দিয়েছেন। ভোটে আওয়ামী লীগের পরাজয় হয়নি। পরাজয় হয়েছে মনোনয়ন-বাণিজ্যের।’

দ্বিতীয় ধাপে মাদারীপুরের কালকিনি ও ডাসার উপজেলার ১৩টিতে ইউনিয়নে নির্বাচন হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র চারটি ইউনিয়নে জয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা। বাকি নয়টি ইউনিয়নের আটটিতেই জয় পেয়েছেন বিদ্রোহীরা। একটিতে জিতেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী।

default-image

ভোটের ফলে মাদারীপুরের মতোই অবস্থা হয়েছে নওগাঁয়। ২০১৬ সালে নওগাঁ সদর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের ১১টিতেই জিতেছিলন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। এবার তা ছয়টিতে নেমে এসেছে। এর মধ্যে দুবলহাটি, হাঁসাইগাড়ী ও কীর্তিপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী এবং শৈলগাছী, বক্তারপুর ও হাপানিয়া ইউনিয়নে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে বিএনপির স্থানীয় নেতারা ভোটে জিতেছেন।

দলীয় প্রার্থীদের পরাজয়ের বিষয়ে নওগাঁ সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মাহবুবুল হক প্রথম আলোকে বলেন, বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় ভোট ভাগাভাগি হয়েছে। এটি আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ। এর বাইরে আরও কিছু কারণ রয়েছে। এসব বিষয়ে দলীয় ফোরামে আলোচনা করে পরবর্তী সাংগঠনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের ৬টিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয়ী হলেও ৮টিতেই হেরেছেন। উপজেলার গোকর্ণ, হরিপুর ও চাতলপাড়ে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী, ধরমন্ডল, বুড়িশ্বর ও গোয়ালনগরে বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং কুন্ডায় স্বতন্ত্র প্রার্থী জিতেছেন।

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের ১৪টি ইউনিয়নের ৮টিতেই স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। এর মধ্যে পাঁচটিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা হেরেছেন বিদ্রোহী প্রার্থীদের কাছে। বাকি তিন ইউপিতে জিতেছেন বিএনপির স্থানীয় তিন নেতা। এর মধ্যে বাহারুল নামের বিএনপির এক নেতা কারাগার থেকে নির্বাচন করে জয়ী হয়েছেন। তিনি দুর্গাপূজার সময় মন্দিরে হামলা-ভাঙচুরের মামলার আসামি।

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া ও ধোবাউড়া উপজেলার ২০টি ইউনিয়নেও ভরাডুবি হয়েছে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের। দুই উপজেলা মিলে মাত্র পাঁচটিতে জয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। বাকি ১৫টি ইউনিয়নের ১৩টিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। দুই উপজেলার কুশমাইল ও বাঘবেড় ইউপির ফলাফল স্থগিত রয়েছে। স্থগিত ইউনিয়ন দুটিতেও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা এগিয়ে আছেন।

ধোবাউড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রিয়তোষ বিশ্বাস বলেন, মনোনয়ন-বাণিজ্যের মাধ্যমে অযোগ্য প্রার্থীদের নৌকার মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। ফলে নির্বাচনে নেতা-কর্মীরা তাঁদের গ্রহণ করেননি।

পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার সাতটি ইউপির মাত্র দুটিতে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। বাকি পাঁচটি ইউপির তিনটিতে বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং দুটিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। তবে সব কটি ইউনিয়নেই প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের ১০টিতেই ভরাডুবি হয়েছে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থীদের। এর মধ্যে একটি ইউপিতে জিতেছেন জামায়াত–সমর্থিত প্রার্থী। দুটিতে বিএনপির দুই নেতা, দুটিতে স্বতন্ত্র এবং বাকি পাঁচটি ইউপিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন।

একইভাবে গাইবান্ধা সদর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের মাত্র ৩টিতে বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা। বাকি ১০টি ইউপির ৪টিতে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী ও ৬টিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। এর মধ্যে লক্ষ্মীপুর ইউপিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে জিতেছেন জামায়াতের স্থানীয় এক নেতা।

আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীদের ভরাডুবি সম্পর্কে গাইবান্ধা সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, দলীয় প্রতীকে ইউপি নির্বাচন হলেও প্রার্থীদের স্থানীয় প্রভাব বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তাই এখানে ভোটাররা শুধু প্রতীক দেখেই ভোট দেন না। এ ছাড়া নৌকার অনেক কর্মী-সমর্থক দলের প্রার্থীদের পক্ষে ঠিকমতো কাজ করেননি।

**প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার নিজস্ব প্রতিবেদকপ্রতিনিধিরা।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন