default-image

মেয়ে পড়াশোনায় বেশ ভালো ছিল। তাই একটি স্মার্টফোন কিনে দেওয়ার আবদার করলে বাবা-মা আর ‘না’ করেননি। বাড়িতে ওয়াই–ফাই সংযোগ নিয়ে নেন। শুরুতে অল্প কিছু সময় মেয়েকে ইন্টারনেটে ঢুকতে দেখেছেন। পরে ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রামে বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেখেছেন। তবে সীমিত সময়ের জন্যই চলত মুঠোফোনের ওপর আঙুলের নড়াচড়া। তবে কখন সেই মাত্রা ছাড়িয়ে গেল, তা তাঁরা টেরই পাননি। প্রথমবার তা নজরে পড়ে মেয়ে পরীক্ষায় খারাপ ফল করার পর। খোঁজ নিতে গিয়ে দেখেন, ঘটনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।

১৪ বছর বয়সের মেয়েটি তত দিনে পর্নো সাইটে আসক্ত হয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়—এমন কিছু ছেলের সঙ্গে ফোনে অসামাজিক সম্পর্কে জড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে একটি ছেলে সেই কথোপকথন ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিলে মেয়েটি আতঙ্কে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। ব্লেড দিয়ে হাতের নানা জায়গা কেটে ফেলে। রাজধানীর একটি ক্লিনিকে মেয়েটিকে বেশ কিছু দিন ভর্তি রাখেন বাবা-মা।

একই বয়সী এক কিশোরের অভিভাবক অনেকটা জোর করেই ছেলেকে নিয়ে আসেন চিকিৎসকের কাছে। তাঁদের অভিযোগ, সারাক্ষণ মুঠোফোনে ইন্টারনেটে বুঁদ হয়ে থাকে ছেলে। বাসায় ওয়াই–ফাই সংযোগ নেই। মুঠোফোনের ডেটা দিয়ে ইন্টারনেটে যুক্ত হয় ছেলে। ডেটা শেষ হলেই বাবা-মায়ের কাছে টাকা চায়। টাকা না দিলে হইচই করে। ছেলেকে নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় তাঁরা।

এমন সমস্যা নিয়ে এখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালের বহির্বিভাগে আসছেন অনেকে। তবে প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে কমবয়সীদের সংখ্যাই বেশি। মূলত, বাবা-মায়ের সঙ্গেই আসছে কমবয়সীরা। হাসপাতালের ই ব্লকের ছয়তলায় ৬০৮ নম্বর কক্ষে প্রতি সোমবার ‘ডিঅ্যাডিকশন ক্লিনিকে’ তাদের চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং করা হচ্ছে। এক বছর ধরে হাসপাতালে এই সেবা দেওয়া হচ্ছে। ৩০ টাকা টিকিট কেটে এ সেবা নেওয়া যায়।

দেশের মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কমবয়সী থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক ও বেশিবয়সী অনেকেই এখন ইন্টারনেটে মাত্রাতিরিক্ত সময় ব্যয় করেন। তাঁদের অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি সময় দেন। অনেকে পর্নো সাইটগুলো নিয়মিত দেখেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ঘোষণা না দেওয়ায় এটাকে এখনো ‘আসক্তি’ বলে উল্লেখ করা যাচ্ছে না। তবে মাদকাসক্তির উপসর্গ আর ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উপসর্গগুলো প্রায় কাছাকাছি। শুরুতে প্রত্যেকে এতে সময় কম দেয়। তবে ধীরে ধীরে সময় কাটানোর পরিমাণ বাড়তে থাকে। গত বছরের জানুয়ারিতে ভিডিও গেমিং আসক্তিকে রোগ হিসেবে ডব্লিউএইচও তালিকাভুক্ত করার ঘোষণা দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে (এসএনএস) অংশগ্রহণের মাত্রা যে হারে বাড়ছে, তাতে ভবিষ্যতে তা রোগ হিসেবে শনাক্ত হলে অবাক হওয়ার কিছু হবে না বলে মনে করা হচ্ছে।

ডিঅ্যাডিকশন ক্লিনিকের সমন্বয়কারী হিসেবে রয়েছেন বিএসএমএমইউয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ শামসুল আহসান মাকসুদ। প্রথম আলোকে তিনি জানান, গত এক বছরে ইন্টারনেট সমস্যায় আক্রান্ত এমন ৭০ থেকে ৮০ জনকে চিকিৎসা দিয়েছেন তাঁরা।

শামসুল আহসান বলেন, ইন্টারনেট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কত ঘণ্টা ব্যয় করলে তা আসক্তি হিসেবে ধরা হবে, সেটা আন্তর্জাতিকভাবে এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। রোগ নির্ণয়ে তা ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্যাল ম্যানুয়েল অব মেন্টাল ডিসঅর্ডারস-৫ (ডিএসএম-৫) অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ফলে এটাকে কোন রোগ হিসেবে কোন প্রক্রিয়ায় চিকিৎসা করা হবে, তা নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব রয়েছে। তবে বিষয়টি মনোরোগ হিসেবে শনাক্ত না করলেও বিশ্বব্যাপী খুব উদ্বেগজনক বলে মনে করা হচ্ছে।

default-image

শামসুল আহসান জানান, বিএসএমএমইউয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগ মনোরোগ সমস্যা, মাদকসহ বিভিন্ন নেশায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের সেবা দিতে গত বছরের জানুয়ারি মাসে বহির্বিবিভাগে এই বিশেষ সেবা চালু করা হয়। ইন্টারনেট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি সময় ব্যয় করা নিয়ে অনেকে পারিবারিক সমস্যায় ভোগেন। তবে এ নিয়ে কোথায় যাবেন, কী সেবা পাবেন, সেটা নিয়ে অনেকে অবহিত নন। ডিঅ্যাডিকশন ক্লিনিকে তাঁরা এই সেবা পাবেন। এখানে দুজন কনসালট্যান্ট আছেন, মনোরোগ চিকিৎসক এবং মনোবিজ্ঞানীরা কাজ করছেন। প্রতি সোমবার বেলা ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত ৩০ টাকার টিকিটের বিনিময়ে এ সেবা নেওয়া যাবে।

শামসুল আহসান বলেন, ‘অতিরিক্ত সময় ইন্টারনেটে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যয় করার দিকে আমাদের আরও সতর্ক হওয়া উচিত। আমাদের কাছে এমন অনেক রোগী আসে, যারা এর ভয়াবহ প্রভাব সামাল দিতে না পেরে আত্মহত্যার চেষ্টা করছে। কিশোরী-কিশোরীদের পর্নো সাইটে আসক্ত হওয়ার ঘটনাটি অনেক বেশি ঘটছে।’

ডিঅ্যাডিকশন সেন্টারের সহকারী সমন্বয়কারী মনোরোগবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সালেহ উদ্দীন এ ব্যাপারে প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একটি নিয়মের মধ্যে ব্যবহার করতে হবে। আপনি যদি খাওয়াদাওয়াসহ অন্যান্য কাজ রুটিন মেনে করতে পারেন, তাহলে ইন্টারনেট ব্যবহার কেন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রাখতে পারবেন না? ফেসবুকে বিনোদনের জন্য থাকুন বা কোনো ঘটনার প্রতিবাদে শামিল হতে থাকুন, সমস্যা নেই। তবে সেটি মাত্রা ছাড়ালে দৈনন্দিন অন্য কাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবেই।’

বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সপ্তাহের ছয় দিন ই ব্লকের ৬০৮ নম্বর কক্ষে মনোরোগের ধরন হিসেবে সেবা দেওয়ার জন্য পৃথক পৃথক সময় ভাগ করা হয়েছে। শনিবার আত্মহত্যার প্রবণতা থেকে সুরক্ষা, রোববার অতি চঞ্চলতা রোগ (অ্যাটেনশন ডেফিসিয়েট হাইপার অ্যাক্টিভিটি ডিসঅর্ডার-এডিএইচডি), সোমবার ডিঅ্যাডিকশন ক্লিনিক, মঙ্গলবার শুচিবায়ু রোগ (অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডার-ওসিডি), বুধবার ১৮ বছরের নিচের বয়সীদের আবেগীয় সমস্যা, আচরণ ও মস্তিষ্কের সমস্যাসংক্রান্ত সমস্যার জন্য চাইল্ড অ্যাডলসেন্ট ক্লিনিক এবং বৃহস্পতিবার ষাটোর্ধ্ব প্রবীণদের মানসিক সমস্যা ও হতাশাসংক্রান্ত সংকটের সেবা দেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0