দেশে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে অসংক্রামক রোগ বিশেষ করে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা, রক্তে চর্বির আধিক্যতে আক্রান্তের হার ও এর প্রকৃত কারণ খুঁজে দেখার উদ্দেশ্যে ২০২১ সালে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সেন্টার ফর গ্লোবাল হেলথ রিসার্চ ওই গবেষণা করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী কিশোর-তরুণদের নিয়ে প্রথম এ ধরনের গবেষণা করা হয়েছে। এতে অর্থায়ন করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নন–কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল কর্মসূচি। গত বছর ২৮ আগস্ট থেকে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের আট বিভাগের ১০ জেলায় অনুষ্ঠিত সমীক্ষায় অংশ নেন ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ২ হাজার ৪৬৮ জন। অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ৫২ শতাংশ নারী ও ৪৮ শতাংশ পুরুষ ছিল। সবচেয়ে বেশি অংশগ্রহণ ছিল ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সীদের—৫৫ শতাংশ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক মোহাম্মদ রোবেদ আমিন প্রথম আলোকে বলেন, সরকার ৪০ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ অসংক্রামক রোগগুলোকে স্ক্রিনিং করছে। এখন যে পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে, তাতে কম বয়সীদেরও স্ক্রিনিং ও সেবার আওতায় আনতে হবে। তিনি আরও বলেন, তরুণদের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। একদিকে তারা ফাস্ট ফুড খাচ্ছে, অন্যদিকে কায়িক পরিশ্রম কম করছে। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে ২০০ স্কুলে এসব বিষয়ে সরকার সচেতনতামূলক প্রচার চালিয়েছে। কোভিডে তা বন্ধ ছিল। এই কার্যক্রম আবার শুরু হবে।

জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের (নিপসম) ‘ন্যাশনাল স্টেপস সার্ভে ফর নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ রিস্ক ফ্যাক্টরস ইন বাংলাদেশ ২০১৮’ প্রতিবেদন অনুসারে, দেশে ১৮ থেকে ৬৯ বছর বয়সীদের মধ্যে ডায়াবেটিসের হার ৮ শতাংশের বেশি।

উপসর্গ নেই বেশির ভাগের

‘বাংলাদেশে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে অসংক্রামক রোগ’ প্রতিবেদন অনুসারে, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৭ শতাংশের ডায়াবেটিস শনাক্ত হয়। এর মধ্যে ৬১ শতাংশের কোনো উপসর্গ ছিল না। এ কারণে তারা জানত না যে ডায়াবেটিস আছে। ৩০ ও ৩০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে ডায়াবেটিসের হার ছিল ২১ শতাংশের বেশি। উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তের হার ছিল প্রায় ১৪ শতাংশ। ৬৮ শতাংশের উচ্চ রক্তচাপের কোনো উপসর্গ ছিল না। সাধারণ স্থূলতার হার ছিল প্রায় ২৭ শতাংশ। স্থূলতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, মেটাবলিক সিনড্রোমের হার তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। সাত ঘণ্টার কম ঘুমায়, এমন ব্যক্তিদের মধ্যে এসব সমস্যা দেড় থেকে দুই গুণ বেশি।

সেন্টার ফর গ্লোবাল হেলথ রিসার্চের প্রকল্প পরিচালক বিশ্বজিৎ ভৌমিক বলেন, পশ্চিমা দেশের তুলনায় এ অঞ্চলে খুব কম বয়সে কম ওজনেই জটিলতা দেখা দেয়। তিনি বলেন, পরিবারে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের ইতিহাস থাকলেও বেশির ভাগের ক্ষেত্রে দেখা গেছে তারা কখনো স্ক্রিনিং করেনি। ফলে সমস্যাগুলো থেকে গেলেও তা আগেভাগে শনাক্ত হয়নি। রোগের চিকিৎসার চেয়ে তা সময় থাকতে প্রতিরোধ করা ভালো। শুধু পরিমিত খাবার ও হাঁটাহাঁটির মাধ্যমে জীবনযাপন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা গেলে ৬০ শতাংশ টাইপ-২ ডায়াবেটিস প্রতিরোধ সম্ভব। গ্রাম এলাকায়ও দেখা গেছে, খোলা মাঠ থাকার পরও অনেকে হাঁটাহাঁটি করে না।

সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের ৫১ শতাংশ নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করে না এবং পরিমিত সুষম খাবার (পাঁচ ধরনের শাকসবজি ও ফলমূল) খায় না প্রায় ৯৯ শতাংশ।

ভাত-লবণ বেশি খাওয়া হয়

অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে দেখা গেছে, দিনে একেকজন গড়ে দুবারের বেশি ভাত খায়। প্রতিদিন অন্তত একবার ভাত খায় প্রায় শতভাগ। প্রায় ৬২ শতাংশ একবার হলেও রুটি খায়। দিনে একবার হলেও কোমল পানীয় পান করে ১৭ শতাংশ, মিষ্টি খায় প্রায় ১৪ শতাংশ, ফাস্ট ফুড খায় ১৫ শতাংশ। রান্নার বাইরেও পাতে অতিরিক্ত লবণ খায় প্রায় ৭৪ শতাংশ। চারজনের একটি পরিবার মাসে গড়ে প্রায় ৬ লিটার সয়াবিন তেল খরচ করে।

প্রতিবেদনে জীবনযাপন–প্রক্রিয়ার কারণে অসংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে একেক বিভাগে একেকটি মাত্রা বেশি এসেছে। যেমন কোনো কোনো এলাকার লোক তিন বেলাই ভাত খায়। কোথাও পাতে লবণ বেশি খায়। ঢাকায় স্থূলতার হার সবচেয়ে বেশি—৩৮ শতাংশ। সিলেটে ডায়াবেটিসের হার বেশি (১৪ শতাংশ), ময়মনসিংহে উচ্চ রক্তচাপের হার বেশি (২৭ শতাংশ) এবং রাজশাহীতে মেটাবলিক সিনড্রোমের হার বেশি প্রায় ৩৩ শতাংশ।

বারডেম একাডেমির পরিচালক অধ্যাপক মো. ফারুক পাঠান প্রথম আলোকে বলেন, অল্প বয়সীদের মধ্যে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ অন্যান্য অসংক্রামক রোগ বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি বেশ উদ্বেগজনক। এর ফলে কিডনি, হৃদ্‌রোগসহ অন্য রোগের ঝুঁকি বাড়বে। সেই সঙ্গে গড় আয়ু কমে যাওয়ারও আশঙ্কা বাড়বে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন