default-image

সব মা–বাবাই স্বপ্ন দেখেন তাঁদের ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে একদিন মানুষের মতো মানুষ হবে। স্বপ্নই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। স্বপ্ন দেখার অনুভূতি হারিয়ে গেলে মানুষের আত্মার নাকি মৃত্যু ঘটে! কিন্তু সবার সব স্বপ্নই কি পূরণ হয়? কামার-কুমোর-জেলে-তাতি-চর্মকার-কৃষক—এঁদের মতো সাধারণ মানুষের স্বপ্নগুলো অনেক সময় অঙ্কুরেই ঝরে পড়ে। বাস্তবতার কশাঘাতে থেমে যায় স্বপ্নের চাকা। কেউ কেউ অবশ্য, সেই থেমে যাওয়া চাকা উপেক্ষা করে মাথা তুলে দাঁড়ায় এক উচ্চতর মানুষ হয়ে। এমন হাজারো বিখ্যাত মানুষ আমাদের সমাজে রয়েছেন। তাঁদের কেউ কেউ অকপটে স্বীকার করেন তাঁর ছেলেবেলার দারিদ্র্যে কথা-কষ্টের কথা। আর এই স্বীকারোক্তি শক্তি হয়ে, সাহস হয়ে অনুপ্রেরণা জোগায় সাধারণ মানুষকে।

শ্যাম চরণ দাসের মা–বাবাও স্বপ্ন দেখেছিলেন, ছেলে একদিন মস্ত বড় মানুষ হবে। সাহেবদের মতো গাড়ি চড়বে, বড় চেয়ারে বসে চাকরি করবে। কিন্তু বিধি বাম, শ্যাম চরণ দাস সাহেব হননি, হয়েছেন সাহেবদের জুতা পলিশওয়ালা।

শ্যাম চরণের বাবা হালচাষ করতেন। তাই পড়ালেখা না করে অল্প বয়সেই বাবার সঙ্গে হাল ধরেছিলেন অভাবের সংসারে। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে চর্মকারের (মুচি) কাজ করছেন তিনি। আগে বসতেন ঢাকার শ্যামলীতে। বছর দশেক হলো কলাবাগান বাসস্ট্যান্ডের ধারে বসেই করছেন নিজের এই ক্ষুদ্র ব্যবসা। তপ্ত রোদ-ঝড়-বৃষ্টি—সবটাই সামলে নেন ততোধিক ছিদ্রযুক্ত বয়সী এই কালো রঙের ছাতার তলায় বসে।

ভোর ছয়টা নাগাদ বের হন সাভারের ট্যানারির মোড়ে নিজের কষ্টের টাকায় বানানো টিনশেডের একটা ছোট্ট বাড়ি থেকে। ঘরে ফেরেন রাত আটটা নাগাদ। স্ত্রী-এক মেয়ে-তিন ছেলে এবং ছেলের বউদের নিয়ে একসঙ্গেই থাকেন শ্যাম চরণ দাস।

এই বয়সে ছেলেরা আপনাকে কাজে আসতে দেয়? তারা নিজেরা কিছু করে না?
ছেলেরা তো বারণ করে, মা, কিন্তু বসে থাকলে কী আর পেট চলবে? তারা তো পোশাক কারখানায় কাজ করত। করোনায় তো তাদের কাজকর্মও বন্ধ হয়ে গেছে, তাইলে কেমনে চলব, মা কন?
তিন মাস তো লকডাউন ছিল, তখন কীভাবে সংসার চালাতেন?
ছিল, জমানো হাজার দশেক টাকা ছিল। তাই দিয়ে কোনো রকমে চলেছি।
কোনো সাহায্য বা সরকারি ত্রাণ পেয়েছিলেন?
না না, আমরা কিছুই পাই নাই। সরকার আমাগো কিছুই দেয় নাই মা, মিথ্যা কথা বলব না। তয় এলাকার মেম্বার কিছু দিছিল।
সেই তো একই কথা, মেম্বার তো সরকারি লোক।
না গো মা, চেয়ারম্যানই কিছু দেয় নাই! মেম্বার তার নিজের পকেট থেইকাই দিছিল।

এ নিয়ে আর কথা বাড়ালাম না। অভাবের সংসারে ঘানি টানতে গিয়ে শ্যাম চরণ যদিও–বা সাহেব হতে পারেননি, দামি চেয়ারে বসে মা–বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে পারেননি কিন্তু রোজই তার কাছে বড় সাহেবেরা আসেন, গাড়ি থেকে নেমে পা জোড়া এগিয়ে দেন তার সামনে। মন দিয়ে মাথাটা ডানে–বাঁয়ে হেলিয়ে চমৎকারভাবে দক্ষ হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় একেবারে নতুনের মতো ঝকঝকে করে দেন তাদের জুতা-স্যান্ডেল। এতে অবশ্য তার মনে কোনো দুঃখ নেই। হাসি মুখে সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি করে যান নিজের কাজ। আসলে কাজকে ভালোবাসলে সেখানে কোনো দুঃখ থাকে না, থাকে এক আত্মতৃপ্তি।

আচ্ছা চরণ বাবু, এই যে চারপাশে এত এত করোনার আতঙ্ক, মৃত্যুভয়—আপনার ভয় করে না? সারাক্ষণ অন্যদের ময়লা জুতা পরিষ্কার করেন, হাতে তো জীবাণু লাগে, তখন কী করেন?

ভয় করে কী করব মা, পেটে তো লাগে। ছেলেদেরও কারখানা বন্ধ, তাই কাজে আসি। আর সবার যা হয়, আমারও তাই হবে। কত বড় বড় মানুষ ঘরে থেকেও তো বাঁচতে পারছে না। তাইলে কন কী লাভ? ভগবানের কাছে তো একদিন যাওয়াই লাগবে, দুদিন আগে আর পরে। আর ওই যে বোতলডার মধ্যে ওষুধ মিশায়ে নিছি। মাঝেমধ্যে হাতে লাগাই।
মুখে মাস্ক কোথায়?

আমার কথা শুনে কালো রঙের পাতলা মুখে হালকা একটু হাসি দিয়ে থুতনির নিচে নামিয়ে রাখা মাস্কটা পরে নিলেন শ্যাম চরণ বাবু।

আচ্ছা, প্রবাদের কথাটা কি পুরোপুরি সত্যি? ‘জন্ম হোক যথাতথা কর্ম হোক ভালো।’

একজন রিকশাওয়ালা বা মাছওয়ালা এদের সন্তানেরা কত দূর যেতে পারে? ওই শেষ বেলায় বাড়িতে একটা টিনের ঘর কিংবা কয়েক শতক জমি। ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার খুব কি তৈরি হয় এদের মধ্যে। মেধা থাকলেও টাকা এবং সুযোগের অভাবে খুব বেশি দূর যাওয়া হয় না তাদের। কিন্তু একজন ধনী বাবার সন্তান পরবর্তী জীবনে ধনীই থেকে যান। তাদের স্বপ্ন খুব কমই বিফলে যায়।

একটা গল্প বলি। কিছুদিন আগে করোনাপূর্ব সময়ে দেশের নামকরা একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘তরুণেরা কীভাবে সফল উদ্যোক্তা হবে, কীভাবে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী বা স্বাবলম্বী হয়ে দেশের সেবা করবে’, এ বিষয়ের ওপর বক্তব্য দিতে এসেছিলেন বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট শিল্পপতি। সেখানে প্রশ্নোত্তর পর্ব ছিল।

একজন শিক্ষার্থী উঠে দাঁড়িয়ে শিল্পপতিকে প্রশ্ন করল। স্যার, আপনার কোম্পানিতে তো কয়েক হাজার কর্মী কাজ করেন। তাদের মধ্যে অনেক মেধাবী-দক্ষ এবং নেতৃত্ব দেওয়ার মতো যোগ্য কর্মীও রয়েছেন, তাহলে তাদের ম্যানেজিং ডিরেক্টর বা তার সমকক্ষ পদ দেওয়া হয় না কেন? কিন্তু অভিজ্ঞতাবিহীন আপনাদের পরবর্তী প্রজন্মই সেই পদটি পেয়ে যান। অথচ আপনারা একটা পিয়ন পদের জন্যও দুই থেকে তিন বছরের অভিজ্ঞতা চেয়ে থাকেন। কেন?

ধন্যবাদ তোমাকে এমন ক্ষুরধার প্রশ্ন করার জন্য, বলেই বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হাতের স্পিকারটা ঠোঁটের খুব কাছে নিয়ে বললেন, হয় না, কারণ ওই প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী বা এমডি আরও ২০ থেকে ২৫ বছর আগে আমার সাত বছরের ছেলেই নির্ধারিত হয়েছিল।

একজন সামান্য শ্যাম চরণ দাসের সঙ্গে বিশিষ্ট শিল্পপতির গল্পটা কেন করছি তা বলি।

আসলে খুব কম মানুষই পারে সততা আর নিষ্ঠা নিয়ে একেবারে তৃণমূল থেকে সমাজের উচ্চতর জায়গায় পৌঁছাতে। তাই অর্থবিত্ত হলেও ক্ষমতার শিকড় আঁকড়ে থাকতে ভুল হয় না তাদের ।

default-image

আসলে আমরা জাতিগতভাবে খুব স্বার্থপর। অন্যকে জ্ঞান দিতে যতটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি, অন্যকে ওপরে উঠতে দেখতে ঠিক ততটা নই। একদল মানুষ কিছু মানুষের ওপর আধিপত্য কায়েমের জন্য সমাজে ছোট-বড়, ধনী-দরিদ্র ইত্যাদি ব্যবধান সৃষ্টি করেছে। এ কারণে সমাজে মানুষে মানুষে আপাতদৃষ্টিতে ভেদাভেদ সৃষ্টি হয়েছে। তাই যেকোনো পেশা যেকোনো কাজই মানুষ করুক না কেন, তা সমাজে গুরুত্বহীন নয়। তাই জন্ম পরিচয়ের ঊর্ধ্বে আপন কর্মপরিচয় তুলে ধরাই মানুষের সত্যিকারের জীবনব্রত। নিজের আয়ত্তের বাইরে জন্মের জন্য মানুষ দায়ী নয়, কিন্তু কর্মে কার কী অবদান, সেটাই ইতিহাস হয়ে রয়ে যায় জন্ম-জন্মান্তর। আসলে আভিজাত্যের বড়াই করে অমানুষ হওয়ার মধ্যে গৌরবের কিছু নেই।

তবে স্বপ্ন দেখে যেতে হবে। স্বপ্ন মানুষকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে, তার এক জীবন্ত প্রমাণ নারায়ণগঞ্জের টানবাজার সুইপার কলোনির সনু রানি দাস। হরিজন সম্প্রদায়ে সনু প্রথম গ্র্যাজুয়েট (স্নাতক)। তাঁর এই গ্র্যাজুয়েশন তাঁর নিজের সম্প্রদায়ে তো বটেই, আমাদের নাক উঁচু সমাজের বিদ্যমান ধারণাতেও এক অপার বিস্ময়। সনু তাঁর শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে চান অন্ধকারে থাকা তাঁর স্বজন ও সম্প্রদায়ের মধ্যে। হরিজন সম্প্রদায়কে নিয়ে তিনি ভাবেন এবং সব প্রতিবন্ধকতা দূর করার স্বপ্ন দেখেন।

ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালামের ভাষায় বলি, স্বপ্ন পূরণ না হওয়া পর্যন্ত স্বপ্ন দেখে যাও। স্বপ্ন সেটা নয়, যা তুমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখো; স্বপ্ন সেটাই, যা তোমাকে ঘুমোতে দেয় না।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন