default-image

একাত্তরের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও অপরাধের বিচার ভবিষ্যৎ গণহত্যার আশঙ্কা রোধ করবে। সে লক্ষ্যেই দেরিতে হলেও বাংলাদেশ একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু করেছে। গণহত্যার আন্তর্জাতিক মানচিত্রে একাত্তরের গণহত্যা অন্তর্ভুক্তিরও চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
‘বাংলাদেশে গণহত্যা ও অপরাধের বিচার’ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় এসব কথা বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। গতকাল শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আয়োজিত তিন দিনের এ সম্মেলন শুরু হয়েছে।
এবারই প্রথম এ ধরনের কোনো সম্মেলনে পৃথিবীর সব কটি মহাদেশ থেকে গণহত্যাবিষয়ক গবেষক, পণ্ডিত ও আন্তর্জাতিক সংস্থার ১৭ জন বিশিষ্ট প্রতিনিধি অংশ নিচ্ছেন। দেশের আইনজীবী, গবেষক, শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ শতাধিক ব্যক্তিও এতে অংশ নিচ্ছেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরও উপস্থিত ছিলেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কিছু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বাংলাদেশ একটি নতুন ধারার সূচনা করেছে। একাত্তরের গণহত্যা নিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে মেরুকরণের ফলে চার দশকেও গণহত্যার আন্তর্জাতিক মানচিত্রে এই গণহত্যা স্থান পায়নি। এ অবস্থায় ওই অপরাধের বিচারে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ আশা করা সঠিক হতো না। তিনি বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে মৃত্যুদণ্ডের বিধান নিয়ে অনেক দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার দ্বিমত কিংবা আপত্তি আছে। কিন্তু বাংলাদেশের আইনে মৃত্যুদণ্ড অসিদ্ধ নয়। তবে এ দণ্ড মওকুফের বিধানও দেশের সংবিধানে রয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি সারওয়ার আলী বলেন, দেশের যে অসংখ্য মানুষ মানবতাবিরোধী অপরাধের শিকার, অপরাধীদের বিচার ছাড়া তাদের ক্ষত শুকাতে পারে না। তাই বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের সামাজিক প্রভাব হবে খুবই শুভ। তিনি বলেন, একাত্তরে বাংলাদেশে জঘন্যতম গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু পাকিস্তান ও তার সমর্থকদের প্রচারণায় পৃথিবীর প্রায় কোনো বইপত্র-নিবন্ধেই তা স্থান পায়নি। এমনকি হত্যাকাণ্ডের শিকার মানুষের সংখ্যা নিয়েও তারা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার-প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্যও তারা অনেক চেষ্টা চালিয়েছে ও চালাচ্ছে। এ সম্মেলনের মাধ্যমে সেই বিচার-প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও মান সম্পর্কে আন্তর্জাতিক মহলের ভুল ধারণার অবসান হতে পারে।
অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের গণহত্যা প্রতিরোধ-সংক্রান্ত বিশেষ উপদেষ্টা অ্যাডামা ডিয়েংয়ের একটি ভিডিওবার্তা দেখানো হয়। বক্তব্য দেন আর্জেন্টিনার যুদ্ধাপরাধ আদালতের বিচারক ডেরিয়েল হোরাসিও অবলিগাদো, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক ও জিয়াউদ্দিন তারিক আলী।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর ‘গণহত্যার শিকার জাতির বিচার পাওয়ার অধিকার: ভিন্ন বাস্তবতা, বিভিন্ন পথ’ শীর্ষক প্লেনারি অধিবেশন হয়। মফিদুল হকের সঞ্চালনায় এ অনুষ্ঠানে বক্তব্য উপস্থাপন করেন ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব জেনোসাইড স্কলারসের সভাপতি ডেনিয়েল ফেইয়েরস্টেইন, নিউইয়র্কভিত্তিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল কোয়ালিশন অব সাইটস অব কনসাইন্স-এর নির্বাহী পরিচালক এলিজাবেথ সিল্কস ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি তুরিন আফরোজ।
এ অধিবেশনে ডেনিয়েল ফেইয়েরস্টেইন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে আন্তর্জাতিক ও সংশ্লিষ্ট দেশের উদ্যোগের বিষয়ে আলোকপাত করেন। তিনি মৃত্যুদণ্ডের বিধানের বিপক্ষেও মত প্রকাশ করেন।
তুরিন আফরোজ বলেন, আন্তর্জাতিক উদ্যোগে যুদ্ধাপরাধের বিচার-প্রক্রিয়া অত্যন্ত শ্লথগতির। তা ছাড়া ১৯৯৯ সালে গঠিত যুদ্ধাপরাধের বিচারবিষয়ক আন্তর্জাতিক আদালত কার্যকর হয়েছে ২০০২ সালে। ওই বছরের ১ জুলাইয়ের আগে সংঘটিত কোনো যুদ্ধাপরাধের বিচার ওই আদালতের এখতিয়ারবহির্ভূত। তাই ওই আদালতে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার সম্ভব নয়। এ অবস্থায় বাংলাদেশের নিজস্ব আদালত গঠন ছাড়া উপায় ছিল না। আর এই আদালত গঠনের মৌলিক আইন ১৯৭৩ সালেই বাংলাদেশ করেছিল। কিন্তু নানা রাজনৈতিক উত্থান-পতনে তা কার্যকর করা যায়নি।
আজ শনিবার সকাল সাড়ে নয়টায় সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের কার্যক্রম শুরু হবে।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন