default-image
>

*নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জেলায় গায়েবি মামলা হয়েছে
*জামিনের জন্য মানুষ এখন হাইকোর্টের দ্বারস্থ হচ্ছেন
*মামলার আসামিদের অনেকের বয়স ষাটের বেশি
*অভিযোগ—মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে হামলার

সুপ্রিম কোর্টের অ্যানেক্স চত্বরে ন্যায়বিচারের প্রতীক গ্রিক দেবী থেমিসের ভাস্কর্য ঘিরে দলে দলে ভাগ হয়ে জামিনের জন্য অপেক্ষা করছেন ‘আসামি’রা। একেক জেলার একেক দল। যশোর জেলার দল থেকে বেরিয়ে আবু বকর মোল্লা বললেন, ‘আমার বয়স এক কম আশি। আমি নাকি ভোটকেন্দ্র দখল করেছি।’

ওই দলে আবু বকর মোল্লা সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ। চোখে ভালো দেখেন না। শীতকালে বার্ধক্যজনিত কষ্ট বাড়ে। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মামলার যন্ত্রণা। তবে বৃদ্ধ বয়সে ছেলেকে সঙ্গে পাচ্ছেন। কারণ, একই মামলায় তাঁর একমাত্র ছেলে আবু হানিফাও আসামি। আর সঙ্গে পাড়া–প্রতিবেশী আছেন অনেক। হয়েছিল কী? আবু বকর মোল্লা প্রথম আলোকে বলেন, কীভাবে কী হলো কিছুই বুঝতে পারছেন না। তিনি শ্রীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোট দিতে যাচ্ছিলেন। যখন তিনি ভোটকেন্দ্রের কাছাকাছি, তখন হঠাৎ গুলির শব্দ শোনেন। ভোট না দিয়েই বাড়ি ফিরতে হয় তাঁকে। হঠাৎ শোনেন, তিনি ও তাঁর ছেলে দুজনেই ওই ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার আসামি।

হাইকোর্ট চত্বরে গতকাল আবু বকর মোল্লার কথা শেষ হতে না হতেই ষাটোর্ধ্ব আরও তিন–চারজন ব্যক্তি জটলা থেকে বেরিয়ে আসেন। তাঁদের একজন আবু তালেব খান। তাঁর বিরুদ্ধেও ভোটকেন্দ্রে গুলি ও বোমা হামলার অভিযোগ। বললেন, ‘এজাহারে সব অভিযোগই আছে। যেসব নিয়ে হামলা কইরেছি বলে বলছে, সেসব তো চোখে দেখিনি। এখন মামলার কাগজে দেখছি। ককটেল, গুলি আরও কী কী সব।’

এই মানুষগুলোর বড় অংশই এলাকায় চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এখন গ্রেপ্তারের ভয়ে এলাকাছাড়া। তাঁদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত চটপটে ও অল্প বয়স্ক কয়েকজন জানান, যশোরের মনিরামপুর থেকে এক মামলায় ৪০ জন, যশোর সদরের দুই মামলায় ১৫০ জন, অভয়নগরে ৭৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। শার্শা উপজেলাতেও একই ধরনের মামলায় আসামি অনেক। তবে তাঁরা সংখ্যা বলতে পারেননি।

এই ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা কতটুকু? যশোর জেলার পুলিশ সুপার মঈনুল হক প্রথম আলোকে বলেন, প্রাথমিকভাবে তাঁদের সম্পৃক্ততা আছে বলে মনে হয়েছে। সে কারণেই মামলা হয়েছে। তদন্তে তাঁদের অপরাধ প্রমাণিত না হলে নাম বাদ যাবে।

যশোর জটলায় বৃদ্ধদের সঙ্গে আলাপের ফাঁকে বৃহত্তর ময়মনসিংহের লোকজন এলেন। বাহাত্তর বছর বয়সী মো. আবদুল হাইয়ের বাড়ি নেত্রকোনার কেন্দুয়া। মামলা কিসের জানতে চাইলে বলেন, ‘কইতারি না গো। মামলার পরও বাড়িতেই রইসি। পুলিশের পাশ দিয়া গেছি। চিনছেও না। তাও আইসি। হগলে জামিনের কথা কইতাছে।’

টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার আবদুল আজিজ ওরফে আজিজ মুন্সি শুধু নিজেই মামলার ঝামেলায় জড়িয়েছেন তা নয়, সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণে প্রায় অচল মানুষ শামসুল হককে। শামসুল কানেও ভালো শোনেন না। দু–একটি কথা চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করতে জবাব দেন তিনি, তারপর থেমে যান। তাঁর হয়ে আজিজ মুন্সিই কথা বলছিলেন। তাঁদের মামলায় আসামি ৫১ জন। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ঘাটাইলে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী অফিসে হামলার। যে মানুষ নড়তেচড়তে পারেন না, অত দূরে গিয়ে তিনি হামলা করবেন কীভাবে?

বৃহত্তর ময়মনসিংহ জটলা থেকে জানা গেল, আইনজীবীর খরচ, বাড়ি থেকে আদালতে আসা, থাকা–খাওয়ার খরচ সবাই মিলে বহন করছেন। কিন্তু শামসুল হকের জন্য খরচটা বেশি। তিনি বাসে যাতায়াত করতে পারেন না। তাঁর জন্য আট হাজার টাকা খরচ করে মাইক্রোবাস ভাড়া করতে হয়েছে। ঘাটাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাকসুদুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।

বিভিন্ন বয়সের মানুষগুলোর মতো এই বৃদ্ধরা কয়েক দিন ধরে আদালত চত্বরে ন্যায়বিচারের আশায় ঘুরছেন। হাতে টাকা নেই, বেশির ভাগের পরনে জীর্ণ পোশাক, পায়ে চপ্পল, দিন কাটে মুড়িমাখা বা বাদাম খেয়ে। তবু আশা, জামিন নিয়ে বাড়ি ফিরে নিজের বিছানায় ঘুমাবেন। ফেরার সময় ঘাটাইলের আজিজ মুন্সি বললেন, ‘দোয়ার দরখাস্ত রাখলাম। এক বিন্দু অপরাধ করি নাই। ওপরের উনি সব দেখছেন।’

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন