default-image

বার্ন ইউনিটের যে বিছানায় ছোট ভাই শুয়ে, তার কাছ পর্যন্ত গিয়ে আবার ছুটে বেরিয়ে এলেন মানসুরুল হক। বিস্ময়ের ঘোর তিনি তখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি। বিছানায় শোয়া মানুষটির যে তাঁর ভাই, তা যেন তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। কয়েক মুহূর্ত পর তিনি যেন সংবিৎ​ ফিরে পেলেন। কান্নায় ভেঙে পড়লেন মানসুরুল হক। বললেন, ‘আমি তো ওর মুখের দিকে তাকাতে পারি না। আমাদের কী সুন্দর সংসার ছিল। সব শেষ হয়ে গেল।’
আজ সোমবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের চিত্র এটি। মানসুরুল পেট্রলবোমায় দগ্ধ তানজিমুল হকের (অয়ন) বড় ভাই। ভাইয়ের কাছে যেতে গিয়েও তিনি বারবার ফিরে আসছিলেন। অয়নের মুখ পুড়ে বিকৃত হয়ে গেছে। শুধু ভাই নয়, মায়ের মুখও দগ্ধ হয়েছে। সঙ্গে থাকা বোন সালমা আনিকার কান ও হাতের কিছু জায়গা দগ্ধ হয়েছে। এর ফলে পুরো পরিবার এখন দিশেহারা।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের ডাকা হরতালের আগের দিন গত রোববার রাত আটটার দিকে রাজধানীর মিরপুরের কাজীপাড়ায় দুর্বৃত্তরা একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় পেট্রলবোমা ছুড়ে মা​রলে সেটিতে আগুন ধরে যায়। এতে অয়ন, তাঁর মা শামসুন নাহার বেগম ও বোন সালমা আনিকা দগ্ধ হন।

নোয়াখালী জেলার হাতিয়া থেকে আনিকাকে চিকিৎসক দেখানোর জন্যই ঢাকায় এসেছিলেন শামসুন নাহার।
হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, অয়নের পুরো মুখ দগ্ধ। চেহারা বীভৎস হয়ে গেছে। চোখ বন্ধ। শ্বাসনালি আক্রান্ত হওয়ায় কথা বলতে পারছেন না। শামসুন্নাহারের মুখ, হাত ও শরীরের বিভিন্ন জায়গাও দগ্ধ হয়েছে। তবে তিনি কথা বলতে পারছেন।
বড় ছেলেকে উদ্দেশ করে শামসুন নাহার বলছিলেন, ‘চোখ তো মেলতে পারি না। চোখে তো কিছু দেখি না। আমাদের তো জীবনটাই চলে যাচ্ছে।’
দুপুরে ৬০২ নম্বর কেবিনে যাওয়ার আগে ওয়ার্ডের বিছানায় শুয়ে শুয়েই শামসুন নাহার বলছিলেন, ‘আনিকা তো কিছু খায়নি।’
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের (বার্ন ইউনিট) অবৈতনিক উপদেষ্টা চিকিৎসক সামন্ত লাল সেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘অয়নের ৯ শতাংশ এবং তাঁর মায়ের সারা শরীরের বিভিন্ন জায়গাসহ ১০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। মা ও ছেলের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এর বেশি এখন আর সেভাবে কিছুই বলা সম্ভব হচ্ছে না।’
শামসুন নাহার বেগম হাতিয়া ইউনিয়ন মডেল পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা। অয়নের বাবা জাবের উদ্দিন ব্যবসায়ী। অয়ন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তাঁর বড় ভাই মানসুরুল হক চট্টগ্রামে একটি ব্যাংকে কর্মরত। একমাত্র ছোট বোন আনিকা এবার এইচএসসি পরীক্ষা দেবে।
মানসুরুল হক বলতে থাকেন, ‘আমার আদরের ভাইটির গায়ে কেউ কখনো হাত তোলেনি। সে অন্যায় করলেও বাবা আমাকেই বকত। ভাইয়ের ক্যামেরা কেনার শখ ছিল। আমি চাকরি পেয়েছি। মা চাকরি করছেন। আমরা একটু গুছিয়েই ওর জন্য একটি ক্যামেরা কেনার পরিকল্পনা করছিলাম। কিন্তু এখন ওর যে চেহারা, ক্যামেরা দিয়ে আর কী করবে? ও যাতে কোনো রাজনীতি বা বাজে কাজের সঙ্গে যুক্ত না হয়, তার জন্য যা করা দরকার, আমরা তা-ই করতাম। দেশের এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে সে যায়নি। ঘুরে বেড়াতে সে খুব পছন্দ করত।’
মানসুরুল হক জানালেন, তিনিই তাড়া দিয়ে মা ও ছোট বোনকে ঢাকায় পাঠিয়েছিলেন। ছোট বোনের মাইগ্রেনের ব্যথা। ব্যথার জন্য পড়তে পারছিল না। অন্যদিকে হরতাল শুরু হয়ে যাচ্ছে। তাই তাড়া দেওয়া হয়।
অয়নের চাচা জামসেদ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘রোববার ভাবি ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে মেয়েকে চিকিৎসক দেখানোর জন্য শান্তিনগরে যান। গিয়ে শোনেন চিকিৎসকের শরীর খারাপ, তাই তিনি আসবেন না। তখন তিনি মিরপুরে তাঁর ভাইয়ের বাসায় ফিরে যাচ্ছিলেন। তারপরই শুনি এ ঘটনা।’

আনিকা সেভাবে দগ্ধ না হলেও মা ও ভাইয়ের অবস্থা দেখে ভড়কে গেছে। সেদিন আসলে কী ঘটেছিল, কীভাবে ঘটেছিল, তা বলতে পারবে একমাত্র আনিকাই। তবে সে কোনো কথাই বলতে চাচ্ছে না।
ঘটনার পরই হাসপাতালে অয়নের বন্ধু, বিভাগের বড় ভাই-বোনেরা ছুটে এসেছেন। বড় চুলের বাউল বাউল ভাবের তরতাজা যুবকের এখন যে পরিণতি, তা তাঁরা মানতে পারছেন না। তাঁরা বলছেন, এখন অয়নের নাটক করা তো দূরের কথা, সে বাঁচবে কি না, তাই নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। শুধু রাজনীতির কারণে এভাবে মানুষকে দগ্ধ করার বিষয়ে অয়নের বন্ধু ও অন্যান্যরা তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করেন।
অয়নের পরিবারের সদস্যরা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার দাবি তুলেছেন। তবে তার পরও তাঁদের বক্তব্য, দুবৃ‌র্ত্তরা শাস্তি পেলেও কী পরিবারটি কখনো আগের জায়গায় পৌঁছাতে পারবে? এর দায় কে নেবে?

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন