default-image

‘ভাই, বাড়ি থাকি বেড়াইলে (বের হলে) বুক ধড়ফড় করে। ঢাকার লোকজন আসি হাটবাজারোত ঘুরি বেড়াওছে। দ্যাশোত দিনাও রোগী বাড়োছে, মানুষ মরোছে। তাও মাইনষের হুঁশ হওছেনা। বাজারোত যায়া গাওত গাও নাগে হাঁটাহাঁটি করোছে। দ্যাশোত যে করোনাত এত্তকিছু হয়া যাওছে, তাক কায়ও মনে করোছে না।’

আজ রোববার রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ইকরচালী বাজারে সবজি কিনতে এসে বরাতি গ্রামের আবদুর জব্বার (৫০) এভাবেই নিজের ক্ষোভের কথা বলছিলেন।

ক্রমে করোনাভাইরাসে সংক্রমিতের সংখ্যা বাড়লেও তারাগঞ্জের প্রায় মানুষের আচার-আচরণে কোনো পরিবর্তন নেই। স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে অনেকেই ভিড় ঠেলে চলাচল করছেন। হাটবাজার রাস্তাঘাট থেকে বাসস্ট্যান্ড, সবখানেই মানুষের উপচে পড়া ভিড়। পাড়ার মোড়ে মোড়ে, বিপণি বিতানগুলোর সামনে দল বেঁধে আড্ডা দিচ্ছেন তরুণেরা। এ অবস্থায় করোনার ঝুঁকি বাড়ছে। গত তিন দিন উপজেলার তারাগঞ্জ, ইকরচালী, বালাবাড়ি, ডাঙ্গীরহাট, কাশিয়াবাড়ি, বুড়িরহাট, কাজীরহাটসহ অন্তত ছয়টি গ্রাম ঘুরে এই চিত্র পাওয়া গেছে।

আজ সকাল ১০টায় ডাঙ্গীরহাট কাঁচাবাজারে গিয়ে ক্রেতাদের ভিড় দেখা গেছে। গা–ঘেঁষাঘেঁষি করে বাজার করছেন তাঁরা। বেশির ভাগ ক্রেতার মুখে মাস্ক নেই। বাজার করতে আসা স্কুলশিক্ষক রমজান আলী বলেন, প্রত্যেকের সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা করা উচিত। কিন্তু কেউ তো মানছে না। গা–ঘেঁষে এসে বাজার করছে। সকাল-বিকেল সব সময় বাজারে ভিড়। শুরুর দিকে মানুষ কিছুটা সামাজিক দূরত্ব মেনে চললেও এখন স্বাভাবিক সময়ের মতোই চলাফেরা করছেন।

বেলা ১১টার দিকে তারাগঞ্জ হাটের সবজি বাজারে গিয়ে দেখা যায়, গায়ে গা–ঠাসাঠাসি করে চলছে কেনাবেচা। এ দোকান, সে দোকানে ঘোরাঘুরি করছেন অনেকে। সবজি ব্যবসায়ী হাফিজুল ইসলাম বলেন, ‘হামরা কি করমো কন? হামার কথা তো শোনোছে না। মানুষ সবজি কিনার জন্য গায়োত পড়োছে।’

ইকরচালী হাটের মাংসের বাজারেও দেখা গেল শতাধিক মানুষের জটলা। একে অপরের সঙ্গে গা–ঘেঁষে দাঁড়িয়ে মাংস কেনাকাটা করছেন। মাংস কিনে বাড়ি ফিরছেন ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের হাকিম উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘ছাওয়াগুলা অনেক দিন থাকি মাংস খিলবার পাও না। আইজ মাংস কিনবার আলছুন। বাজারোত খুব ভিড়। মানুষ হুমড়ি খেয়া মাংস কিনোছে। আধা ঘণ্টা দাঁড়ে থাকি অনেক কষ্টে মাংস কিননু।’

থানার মোড়, চৌপথী মোড়, কেল্লাবাড়ি মোড়, অগ্রণী ব্যাংকের মোড়ের বিভিন্ন দোকানের সামনে প্রচুর মানুষের দেখা মিললো। বিভিন্ন জায়গায় দাঁড়িয়ে অনেককেই খোশগল্প করতে দেখা যায়। তাঁদের অনেকের মুখে মাস্ক নেই। কথা হয় রিকশাচালক জাহেদ রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘করোনা শুরু হওয়ার আগেত যে অবস্থা ছিল, এখনও হাটবাজার ও শহরে সেই অবস্থা। মানুষ মাস্ক ছাড়াই ঘরের বাইরোত চলা ফেরা করোছে।’

বেলা দেড়টার দিকে ওকড়াবাড়ি বাজারের একটি চায়ের দোকানে ২০-২৫ জনকে চা–পান করতে দেখা যায়। কারওর মুখেই মাস্ক নেই। ছবি তুলতে গেলে তাঁরা নিষেধ করেন। আবদুস সালাম নামের এক যুবক বলেন, ‘এ্যালা তো চায়ের দোকানোত বসি চা খাওয়া হয় না। আইজ একনা চা খাবার বসছি। মাস্ক পকেটোত থুছি।’

তারাগঞ্জ বণিক সমবায় সমিতির সভাপতি জয়নাল আবেদীন বলেন, তারাগঞ্জের হাটবাজারে সামাজিক দূরত্বের কোনো বালাই নেই। দোকানপাট খোলার পর বাজারগুলোতে মানুষের ভিড় প্রচুর বাড়ছে। ব্যবসায়ীরা মাঝেমধ্যে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে কেনাকাটার কথা বললেও ক্রেতারা তা শুনছেন না। কার আগে কে কেনাকাটা করে বাড়ি ফিরতে পারেন, সেই প্রতিযোগিতা চলছে।

ইউএনও আমিনুল ইসলাম বলেন, সামাজিক দূরত্ব মেনে দোকান খোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিদিন মাইকিং করা হচ্ছে। মাস্ক, গ্লাভস ব্যবহার করে পণ্য বিক্রির কথা বিক্রেতাদের। স্বাস্থ্যবিধি না মেনে চললে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0