default-image

কলাপাড়া-কুয়াকাটার একসময় মালিক ছিল রাখাইন জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা। এ উপকূলকে বাসযোগ্য করেছে তারাই। এক সময় শুধু কলাপাড়ায় সাত হাজার রাখাইন পরিবার ছিল। এখন আছে ১ হাজার ১০০ পরিবার। রাখাইনদের সংখ্যা চলে যাওয়ার কারণ কী? তারা কী দেশান্তরি হলো? কেন?

এসব প্রশ্ন আজ তুলেছেন কলাপাড়ার স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা, ওই জাতির মানুষ, জাতীয় পর্যায়ের মানবাধিকারকর্মী এবং ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা। ‘বরিশাল অঞ্চলের রাখাইনদের ভূমি সমস্যা এবং বর্তমান পরিপ্রেক্ষিত’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় এ বিষয়গুলো উঠে আসে। আজ রোববার সকালে কলাপাড়া উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে ঢাকা থেকে আসা নাগরিক প্রতিনিধিদলের সঙ্গে এ সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। কারিতাসের সমন্বিত সমাজ উন্নয়ন প্রকল্প (আইসিডিপি) রাখাইন-কলাপাড়া এ সভার আয়োজন করে।

সভায় ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পংকজ ভট্টাচার্য বলেন, ‘একসময় এ অঞ্চলে কোনো বাঙালির জমি ছিল না। রাখাইনরা এসে জঙ্গল পরিষ্কার করে, হিংস্র পশুর সঙ্গে যুদ্ধ করে বাসযোগ্য করে তুলেছে। কৃষিকাজের জন্য জমির খেত তৈরি করেছে। হতাশার কথা হলো, মনুষ্য সৃষ্ট বিপর্যয়ে উপকূলের রাখাইনরা ভূমির অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।’ প্রবীণ এই নেতা বলেন, ‘রাখাইনদের ওপর যে অসদাচরণ করা হচ্ছে, তাদের কান্না শুনে আমরা ছুটে এসেছি। সাঁওতাল-রাখাইনরা পাহাড়ে-সমতলে ভালো থাকুক, সেটা আমরা চাই।’
পংকজ ভট্টাচার্য বলেন, এরপর থেকে রাখাইনদের ওপর সম্প্রদায়গতভাবে কোনো অত্যাচার-অবিচার করা হলে কোনোভাবে মেনে নেব না। সেটা প্রশাসনিক হোক, আর গোষ্ঠীগত হোক। এখন থেকে রাখাইনরা প্রতিবাদী হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, ‘একটি রাষ্ট্র তখনই ভালো চলছে বোঝা যাবে, যখন সে রাষ্ট্রের সংখ্যালঘু মানুষগুলো ভালো থাকে। কলাপাড়া-কুয়াকাটার রাখাইনদের জীবন-জীবিকা দেখে আমরা হতাশই হলাম।’
কলাপাড়া উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল মোতালেব তালুকদার আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, ‘কলাপাড়ায় সাত হাজার রাখাইন পরিবার ছিল। এখন তা কমে ১ হাজার ১০০ জনে ঠেকেছে। আমারও প্রশ্ন এমন কী ঘটল যে, রাখাইনদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে? পৃথিবীর সব দেশের সংখ্যালঘুরাই অভিশপ্ত।’
কলাপাড়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ বি এম সাদিকুর রহমান বলেন, ‘আমি নিজে রাখাইন পাড়াগুলোতে গিয়ে দেখি তারা কেমন আছে। তাদের অধিকার সম্পর্কে আমরা সচেতন রয়েছি। সরকারের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা তাদের দেওয়ার চেষ্টা করছি। রাখাইন জনগোষ্ঠীর মানুষকে শুধু জমির ওপর নির্ভরশীল হলেই হবে না। তাদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে। নিজেদের সব কাজের সঙ্গে ব্যাপৃত করতে হবে।’
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক মঙ্গল কুমার চাকমা বলেন, ‘এ এলাকার ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী হিসেবে রাখাইনদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করার চেষ্টা চলছে বলে মনে হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন রাখাইনদের স্বার্থের ব্যাপারে পুরোপুরি উদাসীন। আদিবাসীদের ভূমির সমস্যা সমাধানে পৃথক একটি ভূমি কমিশন গঠন করার দাবি জানাই।’
এর আগে নাগরিক প্রতিনিধিদলের সদস্যরা বরগুনার তালতলী উপজেলা এবং পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার বিভিন্ন রাখাইন পাড়া ঘুরে দেখে তাদের নানাবিধ সমস্যা সম্পর্কে অবগত হন। প্রতিনিধিদলে অন্যদের মধ্যে ছিলেন ইনস্টিটিউশন ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইইডি) নির্বাহী পরিচালক নুমান আহমেদ খান, পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির সদস্য সোনা রানী চাকমা, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের তথ্য ও প্রচার সম্পাদক দীপায়ন খীসা প্রমুখ।
কারিতাস বরিশাল অঞ্চলের পরিচালক ফ্রান্সিস ব্যাপারী সভায় সভাপতিত্ব করেন। সভা সঞ্চালনা করেন কারিতাসের সমন্বিত সমাজ উন্নয়ন প্রকল্পের (আইসিডিপি) সমন্বয়কারী মেইন থিন প্রমীলা।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন