default-image

‘সকাল ১০টা ৪০ মিনিটের দিকে আমিনুর আমাকে ফোন করে। দুজনে ৩৬ তম বিসিএস প্রিলিমিনারির আবেদনের বিষয়ে কথা বলছিলাম। ও বলছিল, “গাড়িতে আছি। এক জায়গায় যাচ্ছি। ৩০ হাজার পেরুলে বিসিএসের আবেদন করব। ” এর মধ্যেই ধুপ করে একটা শব্দ পেলাম। হঠাৎ ফোনটা কেটে গেল। চেষ্টা করেও আর ফোন যায়নি। ভেবেছিলাম নেটওয়ার্ক সমস্যা। এরপর বেলা সাড়ে ১১টার সময় আরেক বন্ধু ফোনে জানাল, আমিনুর মারা গেছে। আর তখন আমিও বুঝলাম, ধুপ শব্দের মানে কি! ’ 

আজ শনিবার সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত আমিনুর রহমানের সম্পর্কে এভাবেই বলছিলেন তাঁর বন্ধু জ্যোতি বিশ্বাস।
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে উপজেলার শিবনগরে একটি মাহেন্দ্রতে করে সকালে বালিয়াডাঙ্গা গ্রামে যাচ্ছিলেন আমিনুর। এ সময় মাহেন্দ্রটি উপজেলার শিবনগরের গুলশান মোড়ে শ্যালো ইঞ্জিনচালিত একটি নসিমনকে জায়গা ছেড়ে দিতে গেলে চালক নিয়ন্ত্রণ হারান। এতে মাহেন্দ্রটি সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ট্রাকের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা খায়। এতে তিনি ও আমিনুরসহ পাঁচ যাত্রী আহত হন। তাঁদের উদ্ধার করে কালীগঞ্জ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে আমিনুর মারা যান।
আমিনুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন থেকে ২০১৪ সালে স্নাতকোত্তর শেষ করেন। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর উভয় পরীক্ষার ফলাফলেই কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন আমিনুর। যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি এলাকার বাগডাঙ্গা গ্রামে তাঁর বাড়ি। তাঁর বাবার নাম জয়নাল আবেদিন। তিনি তিন বছর আগে মারা গেছেন। আট ভাই বোনের মধ্যে আমিনুর ছিলেন সবার ছোট। সন্তানের এমন মৃত্যুর খবরে মা সখিনা বেগমও পাগলপ্রায়।
জ্যোতি বিশ্বাস বলেন, ‘সেই কলেজ থেকেই আমরা এক সঙ্গে পড়তাম। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়েও একই বিভাগে। পুরো সময়টাই এক সঙ্গে থাকতাম। ওই হাতের লেখাটা ছিল খুবই সুন্দর। ফোনে বলছিল, “তুই ঈদে এলে আমি খুলনায় তোদের বাড়িতে যাব। ” কিন্তু সব শেষ! ’
আমিনুরের আরেক বন্ধু মুজাহিদ বলেন, ‘আমরা সব সময় এক সঙ্গেই থাকতাম। ও সব কিছুকে খুবই সহজ করে নিতে পারত। মাস্টার্স শেষ করার পর চাকরি হয়নি। আমরা কত দুশ্চিন্তা করি কিন্তু কখনো দুশ্চিন্তা করত না। ৩৫ তম বিসিএসের প্রিলিমিনারিতে টিকেছে। সামনে লিখিত পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ইচ্ছে ছিল বিসিএস পুলিশ ক্যাডারে টিকে সহকারি পুলিশ সুপার হবে।’
কান্না জড়িত কণ্ঠে মুজাহিদ বলছিলেন, ‘জানেন, ও আমার চেয়েও অনেক ভালো ছাত্র ছিল। অনার্সে চারের মধ্যে ও সিজিপিএ ৩ দশমিক ৬২ ও মাস্টার্সে ৩ দশমিক ৬৬ পেয়েছিল। ওর মধ্যে ছিল না কোনো রাগ বা হিংসা। সারা দিন শুধু হলে বসে পড়ত। অনেক মজা করতাম। ছবি তুলতে অনেক পছন্দ করত। এ জন্য অনেক খেপাতাম। এখনো মনে হয়, ও যেন আমার রুমে এসে বলবে, “কিরে আমাকে নিয়ে মজা করস! ”’
আমিনুরের আরেক বন্ধু আবদুল্লাহ আল কাওসার বলেন, ‘বিভাগীয় বনভোজনে যখন সেন্টমার্টিনে গিয়েছিলাম। রাতে হ‌ুমায়ূন আহমেদের সমুদ্র বিলাসে ছিলাম। রাতে সবাই মিলে ডাব পেড়ে খেয়েছিলাম। সমাবর্তনে কথা মজা করেছিলাম। দুই দিন আগে যখন বাড়িতে যায়, তখনো কত মজা করেছিলাম। কিন্তু সবই এখন কেবলই স্মৃতি।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0