default-image

খালাতো ভাই আবেদ আলীর আশ্রয়ে থাকেন সোনাবান বিবি (৬৪)। অন্যের আশ্রয়ে থাকলেও কাজ করে খেতে চান বলে এই বয়সেও মহিলা উন্নয়ন সমিতি করে হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর চিকিৎসাসেবার ওপর কয়েকটি প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন গ্রাম থেকে গ্রাম ঘুরে সেবাদান করছেন। নিজ এলাকায় ও আশপাশের গ্রামে, এমনকি উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগেও তাঁর পরিচয় এখন হয়ে গেছে হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর ডাক্তার আপা সোনাবান বিবি।
গতকাল শুক্রবার সকালে লঙ্গুর পাড় গ্রামে আবেদ আলীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, হাতে ছাতা ও কাঁধে কাপড়ের ব্যাগ ঝুলিয়ে বেরোচ্ছেন সোনাবান বিবি। পার্শ্ববর্তী ফুলবাড়ি চা-বাগানের শ্রমিক বস্তিতে এখন গবাদিপশুর তড়কা, বাদলা ও খোড়া রোগের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। সেখানে যাচ্ছেন তিনি। সোনাবানের মুখেই শোনা গেল তাঁর জীবনকথা।
মুক্তিযুদ্ধের পাঁচ বছর আগে মাত্র ১৫ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল টিলাগাঁও গ্রামের রোস্তম আলীর সঙ্গে। বিয়ের দুই বছর পর মেয়ে করিমুননেছার জন্ম। তার দেড় বছর পর জন্ম হয় ছেলে জমির আলীর। এর দুই বছর পর স্বামী অন্য এক নারীকে বিয়ে করে গ্রাম ছেড়ে চলে যান। আর সোনাবান বিবি মেয়ে ও ছেলেকে নিয়ে বাঁচার তাগিদে এবং মেয়ের বিয়ের খরচ জোগাতে স্বামীর কাছ থেকে পাওয়া ভিটেমাটি বিক্রি করে ফেলেন। সামাজিক চাপে মাত্র ১২ বছর বয়সে মেয়ের বিয়ে দেন। এরপর ছেলেকে নিয়ে ছিলেন। পরে ছেলে জমির আলীও মাকে ছেড়ে শ্রীমঙ্গল চলে গিয়ে স্ত্রীকে নিয়ে সেখানে বসবাস করছেন। এরপর থেকে খালাতো ভাই আবেদ আলীর আশ্রয়ে থাকেন সোনাবান। ১৯৮৪ সালে এনজিও হীড বাংলাদেশের মাধ্যমে একটি মহিলা সমিতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন তিনি। এ সমিতির মাধ্যমে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে হাঁস-মুরগির চিকিৎসার ওপর প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নিয়ে গ্রামে হাঁস-মুরগির সেবা দিতে শুরু করেন।
গ্রামে আস্তে আস্তে পরিচিতি বাড়তে থাকে সোনাবান বিবির। তিনি নতুন করে গবাদিপশুর চিকিৎসাসেবার প্রশিক্ষণ নিতে উদ্যোগী হন। অবশেষে হীড বাংলাদেশ ও ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট ইকোসিসটেমস অ্যান্ড লাইভলিহুড (ক্রেল)-এর মাধ্যমে হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর ওপর আরেকটি প্রশিক্ষণ নেন। এখন গ্রামে হাঁস, মুরগি, গরু ও ছাগলের রোগ প্রতিরোধে আগাম চিকিৎসাসেবা প্রদান এবং রোগবালাইয়ের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন। কোনো জটিল বিষয় হলে গ্রামবাসীর সঙ্গে তিনি উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে গিয়ে তাদের সাহায্য নেন।
সোনাবান বিবি বলেন, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর চিকিৎসাসেবায় কিছুটা দক্ষতা বাড়লে তিনি বাড়িতে ওষুধপত্র রেখে সেবা দেন। আর ক্রেল তাঁকে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র সরবরাহ করছে। প্রতিদিন গড়ে ২০০ টাকা আয় করেন। খরচ বাদে মাসে দেড় হাজার টাকা থাকে, যা তিনি সঞ্চয় করেন। সোনাবান বিবি বলেন, ‘বয়স যা-ই হোক, আমি কাজ করে হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর সেবা দিয়ে আয় করে জীবিকা নির্বাহ করছি। কারও ওপর আমি নির্ভরশীল নই।’ তবে খালাতো ভাই আশ্রয় না দিলে এ পর্যায়ে আসতে পারতেন না বলেও জানান তিনি।
প্রশিক্ষণ: ১৯৮৪ সালে হীড বাংলাদেশের মাধ্যমে কমলগঞ্জ উপজেলা যুব উন্নয়ন ও মৌলভীবাজার জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নেন সোনাবান বিবি। ১৯৯৮ সালে কমলগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তৎকালীন কর্মকর্তা নুরুল ইসলামের আন্তরিকতায় প্রতিষেধকের ওপর চার দিনের প্রশিক্ষণ নেন। ২০১৩ সালে ক্রেলের সহায়তায় উপজেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মাধ্যমে সিলেট শহরের টিলাগড়ে হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর চিকিৎসাসেবার ওপর ছয় দিনের প্রশিক্ষণ নেন। বিনা খরচে ছয় দিন থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা ও ১ হাজার ৪০০ টাকা ভাতা পেয়েছিলেন। এর আগে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে এলএফসির (স্থানীয় মহিলা উন্নয়ন কমিটি) তিন দিনের প্রশিক্ষণ নেন। মৌলভীবাজার জেলা সদরেও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে এক দিনের প্রশিক্ষণ নেন। সব কটি প্রশিক্ষণে সনদ পেয়েছেন।
গ্রামবাসীর কথা: লঙ্গুর পাড় গ্রামের বৃদ্ধ জব্বার মিয়া (৬০), ফয়সল মিয়া (২২), পিয়ারুন বেগম (৩৫) ও সাফিয়া বেগম (৩৪) গর্ববোধ করে বলেন, এই গ্রামে হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর একজন নারী ডাক্তার আছেন। সরকারিভাবে প্রতি ইউনিয়নে একজন করে প্রাণিসম্পদ বিভাগের সেবক থাকলেও তাঁকে সব সময় পাওয়া যায় না। তাঁকে পুরো ইউনিয়ন ঘুরে সেবা দিতে হয়। এ ক্ষেত্রে সোনাবান বিবি হাতের কাছে আছেন। তাঁর কাছে ওষুধ আছে, সেবাও পাওয়া যায়। নামমাত্র ব্যয় করতে হয়। সোনাবান বিবির সেবার কারণে লঙ্গুর পাড়, টিলাগাঁও গ্রামসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি গ্রামের হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর মৃত্যুর হার কমে গেছে। তাতেই গ্রামবাসী খুশি।
কমলগঞ্জ উপজেলা ভ্যাটেরিনারি সার্জন মো. হাবিব আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘সোনাবান বিবির কাজে আমরাও খুশি। একটি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি নিজের গ্রামসহ আশপাশের গ্রামে হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন। কোনো বিষয় তাঁর আয়ত্তের বাইরে হলে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে যোগাযোগ করে তিনি আমাদের পরামর্শ নেন এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেন। তিনি গবাদিপশুর মৃত্যুহার কমাতে অবদান রাখছেন।’
প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আরও বলেন, এ উপজেলার নয়টি ইউনিয়নে মাত্র তিনজন ভ্যাটেরিনারি সহকারী (মাঠকর্মী) দিয়ে সঠিকভাবে হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর চিকিৎসাসেবা প্রদান করা সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে সোনাবান বিবি অনেকটা সহায়তা করছেন।
ইউএসএআইডির সহায়তা প্রকল্প ক্রেলের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মাজহারুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, সোনাবান বিবিকে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের মহিলা উন্নয়ন সমিতির সদস্য করে নেতৃত্ব দেওয়া হয়েছিল। তাঁর বিচক্ষণতার জন্যই তাঁকে হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর চিকিৎসাসেবার প্রশিক্ষণে পাঠানো হয়। এখন প্রয়োজনীয় ওষুধপত্রও দেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন