সবাইকে ডেকে নিজেই আটকা পড়েন রহিমা

রাতের অন্ধকারে আগুনে পুড়ে মারা গেছে আটজন। পাশাপাশি ঘরসহ সবকিছু ছাই হয়ে গেছে। এমন শোকে কে কাকে সান্ত্বনা দেবে। নগরের বাকলিয়া থানার ভেড়ামার্কেট এলাকায় গতকাল সকাল সাতটায়।  সৌরভ দাশ
রাতের অন্ধকারে আগুনে পুড়ে মারা গেছে আটজন। পাশাপাশি ঘরসহ সবকিছু ছাই হয়ে গেছে। এমন শোকে কে কাকে সান্ত্বনা দেবে। নগরের বাকলিয়া থানার ভেড়ামার্কেট এলাকায় গতকাল সকাল সাতটায়। সৌরভ দাশ

আগুন আগুন বলে চিৎকার করতে করতে মেয়ে নার্গিসকে নিয়ে কোনোরকমে বের হয়ে পড়েছিলেন রহিমা আকতার (৫০)। তাঁর চিৎকারে জেগে উঠেছিল বস্তিবাসী। জেগে উঠে নিজ প্রাণ বাঁচাতে ছুটছিল সবাই। রহিমাও তাঁর অপর তিন সন্তানকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে আবার আগুন মাথায় ঢুকে পড়েন বস্তিতে। আর ফেরেননি। পরে মা এবং তিন ছেলেমেয়ের অঙ্গার হয়ে যাওয়া শরীর পাওয়া যায় একই স্থানে।

বাকলিয়া থানাধীন চাক্তাই বেড়া মার্কেট বস্তিতে গত শনিবার রাতের আগুনে আটজনের মৃত্যু হয়েছে। চোরের ভয়ে রাতের বেলায় ঘরের ভেতর থেকে তালা লাগিয়ে ঘুমাতেন তাঁরা। সেটিই কাল হয়েছে বাসিন্দাদের। রহিমার সঙ্গে পুড়ে মারা গেছে তাঁর মেয়ে নাজমা (১৪), ছেলে জাকির হোসেন (৯) এবং আরেক মেয়ে নাসরিন (৪)।

নিহত অপর চারজনের মধ্যে আয়েশা আকতার (৩৭), তাঁর বোনপো সোহাগ (১৮), হাসিনা আকতার (৩৫) এবং একজন অজ্ঞাত রয়েছে।

একই ঘরে থাকলেও রহিমার এক মেয়ে নার্গিস (১০) প্রাণে বেঁচে গেছে। তারা ছাত্তার কলোনিতে থাকত। নার্গিস বলে, ‘আগুন লাগার পর আমার মা চিৎকার করছিলেন আর দরজার তালা ভাঙার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু দরজা ভাঙতে পারেননি।’

সে বলে, ‘ভাই জাকির দোকানের পেছনের দরজা ভেঙে দিলে আমি সেদিকে লাফ দিয়ে বেরিয়ে আসি। আমার ভাই অন্যদের বের করার চেষ্টা করতে গিয়ে আর বেরোতে পারেনি। মা বের হয়ে আবার তাদের বের করতে গিয়ে আর আসতে পারেনি।’

বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চুরির ভয়ে বস্তির বেশির ভাগ লোক রাতে ভেতর থেকে ঘরে তালা লাগিয়ে ঘুমাতেন। আগুন লাগার পর তাড়াহুড়ো করে বেরোতে গিয়ে দরজায় লাগানো তালা খুলতে বেগ পেতে হয়। বস্তির বাসিন্দা সালমা বলেন, ‘এখানে প্রায় চুরি হয়। তাই ভেতর থেকে তালা দিয়ে ঘুমাতাম। আগুন লাগার পর তালার চাবি খুঁজে পাইনি। দরজা ভেঙে বের হয়ে পড়ি।’ সালমা বলেন, রহিমাদের ঘরেও তালা ছিল। রহিমা চিৎকার করে আবার ছেলেমেয়েদের বাঁচাতে পেছনের দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকেছিলেন। আর বেরোতে পারেননি।

মা, ভাইবোনকে হারিয়ে নির্বাক হয়ে পড়ে নার্গিস। তাঁর মামা মো. আকবরও একই বস্তিতে থাকেন। আগুন লাগার পর আকবরও পরিবারের অন্যদের নিয়ে বের হয়ে আসতে পেরেছিলেন। পরে বোনের খোঁজ করতে গিয়ে দেখেন সব শেষ।

আকবর বলেন, ‘এই আগুন ষড়যন্ত্রমূলক। কারণ উচ্ছেদের নোটিশ দেওয়ার পর কেন আগুন লাগবে? এখন আমার ভাগনি নিঃস্ব হয়ে গেল।’ দোকান কর্মচারী সামশু মিয়ার স্ত্রী হাসিনা আক্তারও (৩৭) দগ্ধ হয়েছে। সামশু মিয়া বলেন, ‘আমি কোনোরকমে বের হতে পারলেও সে বের হতে পারেনি।’

শনিবার রাত সাড়ে তিনটায় লাগা আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ হয় রোববার সকাল ৮টা ৫ মিনিটে। সবকিছু পুড়ে ছাই। কেউ স্বজন হারানোর কিংবা কেউ সব হারিয়ে কাঁদছিলেন। তারপরও প্রাণ হাতে বের হয়ে পড়া নারী-পুরুষ ধ্বংসস্তূপের ছাই সরিয়ে খুঁজে ফিরছিলেন দা, খুন্তি, পুড়ে বাঁকা হয়ে যাওয়া বাসন, মাটির ব্যাংকের দুটি পয়সা ইত্যাদি। নিঃস্ব হয়ে পড়া এই মানুষগুলোর কাছে যে সেগুলোও অতি মূল্যবান।