ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে ৭ কৌশল

রাজধানী ঢাকা। ফাইল ছবি
রাজধানী ঢাকা। ফাইল ছবি

ঢাকাকে আরও বাসযোগ্য ও উন্নত শহর হিসেবে গড়ে তুলতে প্রক্রিয়াধীন বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) সাতটি নতুন কর্মকৌশল যুক্ত করা হচ্ছে। এগুলো যুক্ত হলে নগরে জলাভূমি সংরক্ষণ, উন্নত বাসস্থান, প্রশস্ত সড়ক, উন্মুক্ত স্থান, বিনোদনকেন্দ্রসহ অন্যান্য নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) উদ্যোগে প্রণয়ন করা হচ্ছে এই ড্যাপ। এতে নতুন উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে ভূমি পুনরুন্নয়ন, ভূমি পুনর্বিন্যাস, উন্নয়ন স্বত্ব প্রতিস্থাপন পন্থা (টিডিআর), ট্রানজিটভিত্তিক উন্নয়ন, উন্নতি সাধন ফি, স্কুল জোনিং ও ডেনসিটি জোনিং। ইতিমধ্যেই তিনটি কর্মকৌশলের খসড়া নীতিমালা তৈরি হয়েছে। এগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী ও বিশেষজ্ঞদের মতামতও নেওয়া হচ্ছে। এরপর নীতিমালাগুলো চূড়ান্ত করা হবে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এ কর্মপন্থাগুলো দেরিতে হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে ড্যাপে যুক্ত হচ্ছে। তবে সুফল পেতে এগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।’ তিনি বলেন, রাজউক বিআইপির কাছ থেকে ভূমি পুনরুন্নয়ন, পুনর্বিন্যাস ও টিডিআরের খসড়া নীতিমালার ওপর মতামত চেয়েছে। তাঁরা এগুলো পর্যবেক্ষণ করে চূড়ান্ত মতামত দেবেন।

রাজউকের আওতাধীন এলাকা ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার। এর জন্য বর্তমান ড্যাপের গেজেট হয় ২০১০ সালে। মেয়াদ ছিল ৫ বছর। এরপর সংশোধিত আরেকটি ড্যাপ করার উদ্যোগ নেয় রাজউক। নতুন ড্যাপের কাজ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে।

নতুন কর্মকৌশলে বদলাবে আবাসন ব্যবস্থাপনা
প্রক্রিয়াধীন ড্যাপের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ভূমি পুনরুন্নয়ন ধারণা ইতিমধ্যেই বেশ আলোচিত হয়েছে। সম্প্রতি পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের পর ওই এলাকায় ছয়টি স্থানসহ মোট সাতটি স্থানে এই পদ্ধতি প্রয়োগের জন্য প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজউক। এখন এটি প্রকল্প আকারে রূপ দেওয়া হবে। এই পদ্ধতিতে ছোট প্লটগুলো একত্র করে বড় আবাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। জমির মালিকেরা হিস্যা অনুযায়ী ফ্ল্যাট বা ভবনের অংশ পাবেন। এতে ওই এলাকায় উন্নত বাসস্থান, প্রশস্ত সড়ক, উন্মুক্ত স্থান, বিনোদনকেন্দ্রসহ অন্যান্য নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

আর ভূমি পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে নির্দিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের একত্র করে সড়ক, উন্মুক্ত স্থান, পার্ক, জলাশয়সহ কমিউনিটি-ভিত্তিক সুযোগ-সুবিধা তৈরি করা হবে।

জলাভূমি ও কৃষিজমি রক্ষা
নতুন ড্যাপে আরেকটি আলোচিত বিষয় হচ্ছে উন্নয়ন স্বত্ব প্রতিস্থাপন পন্থা বা ট্রান্সফার অব ডেভেলপমেন্ট রাইটস (টিডিআর)। মূলত ব্যক্তিমালিকানাধীন কৃষিজমি ও জলাভূমি রক্ষায় এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে। ড্যাপ-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও সুন্দর নগরের স্বার্থে কৃষিজমি ও জলাভূমি রক্ষা করা প্রয়োজন। মহাপরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত এসব জমির অন্য কোনো ধরনের ব্যবহারেরও সুযোগ নেই। কিন্তু ব্যক্তিমালিকানাধীন হওয়ায় এমন জমি রক্ষা করাও কঠিন। কারণ জলাভূমি ভরাট করে বাড়ি করতে রাজউক থেকে অনুমোদন দেওয়া হয় না। তখন ওই জমির মালিক ধীরে ধীরে জলাশয়টি ভরাট করেন অথবা কম দামে প্রভাবশালী কারও কাছে বিক্রি করে দেন। এভাবে একপর্যায়ে জলাভূমিটি হারিয়ে যায়।

এ অবস্থার পরিবর্তন করতে পারে টিডিআর। এই পদ্ধতিতে কৃষি বা জলাভূমির মালিককে একটি সনদ দেওয়া হবে। এই সনদ তিনি অন্য ব্যক্তির কাছে বিক্রি করতে পারবেন। যে ব্যক্তি এই সনদ কিনবেন তিনি অন্য জায়গায় ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সুবিধা পাবেন। এতে জমির মালিকানা বহাল রেখেই জলাভূমি বা কৃষিজমির মালিক অতিরিক্ত অর্থ পাবেন। এতে সনদধারী ও সনদের ক্রেতা উভয়ই লাভবান হবেন, কৃষি বা জলাভূমিও রক্ষা করা সম্ভব হবে।

মেট্রোরেল
ট্রানজিটভিত্তিক উন্নয়ন নামের কর্মপন্থাটি নেওয়া হয়েছে মেট্রোরেলের কথা চিন্তা করে। এর মাধ্যমে মেট্রোরেল স্টেশন থেকে ২৫০-১০০০ মিটারের মধ্যে উচ্চ সুউচ্চ ভবন নির্মাণে উৎসাহিত করা হবে। স্টেশনগুলো আবাসিক এলাকার পাশে হলে সেখানে ভূমির মিশ্র ব্যবহারের (আবাসিক ও বাণিজ্যিক) অনুমোদন দেওয়া হবে। যাতে স্টেশনে নেমে কোনো যাত্রী হেঁটে কেনাকাটা করতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে হাঁটার জন্য জায়গা রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।

উন্নতি সাধন ফি (বেটারমেন্ট ফি) সম্পর্কে জানতে চাইলে নগর পরিকল্পনাবিদ ও রাজউকের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কোনো বড় প্রকল্প বা রাস্তার কারণে আশপাশের জমির মালিকেরা যে অতিরিক্ত সুবিধা পান, বাজারদর অনুযায়ী তার একটি অংশ নেবে রাজউক। এতে অন্য এলাকায়ও উন্নয়ন করা সম্ভব হবে।

স্কুল জোনিং ও ডেনসিটি জোনিং—এ দুটি বিষয়ও নতুন। রাজউকের অন্তর্ভুক্ত কিছু এলাকায় জনঘনত্ব বৃদ্ধি ও অপরিকল্পিতভাবে এলাকাভিত্তিক স্কুল গড়ে ওঠার কারণে রাজউক এই উদ্যোগ নিচ্ছে। রাজউক সূত্র বলছে, এখন ঢাকার অধিকাংশ ভালো স্কুল গুলশান, বনানী, ধানমন্ডিকেন্দ্রিক। এতে একটি এলাকায় প্রচুর চাপ পড়ে। আবার অনেক এলাকায় ভালো কোনো স্কুল নেই। স্কুল জোনিংয়ের মাধ্যমে জনঘনত্ব অনুযায়ী কোনো এলাকার জন্য কতটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করা হবে। কোনো এলাকায় নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলে নতুন প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দেওয়া হবে না। নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুমোদন দেওয়া হবে এমন এলাকায় যেখানে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কম বা নেই। এ ছাড়া ডেনসিটি জোনিংয়ের মাধ্যমে জনঘনত্ব অনুযায়ী ভবনের উচ্চতা নির্ধারণ করা হবে।

জানতে চাইলে রাজউকের প্রক্রিয়াধীন ড্যাপের প্রকল্প পরিচালক ও নগর পরিকল্পনাবিদ আশরাফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০৪১ সালের মধ্যে আমরা উন্নত দেশের স্বপ্ন দেখছি। সে অনুযায়ী উন্নত দেশের রাজধানীকে সাজাতে কর্মপন্থাগুলো হবে যুগোপযোগী। এগুলো বাস্তবায়িত হলে উন্নত দেশের রাজধানীর কাঙ্ক্ষিত রূপ পাবে ঢাকা।’