শেকৃবিতে 'মিটিংরুম' আতঙ্কে হলের শিক্ষার্থীরা

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি: ওয়েবপেজ থেকে
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি: ওয়েবপেজ থেকে

২৪ জুন ২০১৯। রাত ১২টা ৫৬ মিনিট। আবাসিক হলের ডাইনিংরুমে চলছে ‘মিটিং’। সেখানে প্রথম বর্ষের পাঁচ শিক্ষার্থী অনবরত কান ধরে ওঠবস করছেন। সামনে বসে আছেন দ্বিতীয় বর্ষের প্রায় ২০ শিক্ষার্থী। তাঁরা ওই পাঁচ শিক্ষার্থীকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করছেন, ধমক দিচ্ছেন। কখনো তাঁদের গায়ে হাত তোলা হচ্ছে। রাত সাড়ে তিনটা পর্যন্ত চলে এই মিটিং।

এটি রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) কাজী নজরুল ইসলাম হলের ঘটনা। ওই মিটিংয়ে থাকা প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, সেই রাতে ডাইনিংয়ে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ডেকে নেন হলের বড় ভাইরা। তাঁদের ‘অপরাধ’, কেউ হলে লুঙ্গি পরে ঘুরছিলেন, কেউবা সালাম দিতে দেরি করেছেন। এ জন্য কনিষ্ঠ শিক্ষার্থীদের ‘ভালো আচরণ’ (ম্যানার) শেখানোর নামে তাঁদের ওপর চলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। ওই ঘটনার একটি ভিডিও প্রথম আলোর কাছে এসেছে।

প্রথম বর্ষের ওই শিক্ষার্থী জানান, সেদিনের র‌্যাগিংয়ে ছিলেন ১৮ ব্যাচের প্রদীপ্ত রায়, শাহরিয়ার সাগর, স্মরণ রহমানসহ প্রায় ২০ শিক্ষার্থী। এঁরা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তরবঙ্গ দলের সদস্য ও ছাত্রলীগের কর্মী।

ওই রাতের মিটিংয়ে থাকা প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘এই বছরের ২ জানুয়ারি আমি হলে উঠি। এর দুই দিন পর রাত সাড়ে ১০টার দিকে বড় ভাইয়েরা এসে হলের ডাইনিংয়ে নিয়ে যান। তারপর পরিচয় করিয়ে দেন ইমিডিয়েট সিনিয়র ১৮ ব্যাচের সঙ্গে। তারপর থেকে চলছে আমাদের ওপর র‌্যাগিংয়ের নামে নির্যাতন। গত ৯ মাসে আমি নিজে অন্তত ৬০ বার র‌্যাগিংয়ের শিকার হয়েছি। এসব নিয়ে হল বা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করলে আমাদের অপমানিত হতে হয়।’

একসময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আনন্দ–উৎসবের মাধ্যমে প্রবীণ–নবীন শিক্ষার্থীদের পরিচয়পর্বকে র‌্যাগ বলা হতো। কিন্তু বর্তমানে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে কনিষ্ঠ বা নতুন শিক্ষার্থীদের অবমাননা ও হয়রানির শিকার হওয়ার ঘটনা র‌্যাগিং নামে পরিচিত। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা অনেক সময় শারীরিক নির্যাতনেরও শিকার হন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শেকৃবিতে শুধু র‌্যাগিং নয়, আবাসিক হলে দুটি নির্যাতনকক্ষও আছে। সেখানে নবীন শিক্ষার্থীদের ডেকে এনে ছাত্রলীগের নেতা–কর্মীরা নির্যাতন করেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ছাত্রীদের জোরপূর্বক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নিয়ে যাওয়া, আচরণ শেখানোর নামে নির্যাতন ও ভিন্নমত দমনের ঘটনাও রয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে।

ক্যাম্পাস চালায় ‘বঙ্গ’ রাজনীতি
শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বেঙ্গল অ্যাগ্রিকালচার ইনস্টিটিউট। স্বাধীনতার পর এর নাম পাল্টে হয় বাংলাদেশ অ্যাগ্রিকালচার ইনস্টিটিউট। যা ২০০১ সালে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শেকৃবি) রূপান্তরিত হয়। বর্তমানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় আড়াই হাজার শিক্ষার্থী রয়েছেন।

আগারগাঁওয়ে ৮৬ দশমিক ৯২ একরের এই শেকৃবি চালায় মূলত ‘বঙ্গ’ রাজনীতি। হলের আবাসিক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পুরো ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণ করে ছয়টি বঙ্গ (আঞ্চলিক) দল। এলাকাভিত্তিক এসব বঙ্গের নেতৃত্ব দেন ছাত্রলীগের নেতা–কর্মীরা। দক্ষিণবঙ্গ দল চালান বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি এস এম মাসুদুর রহমান, ময়মনসিংহ বঙ্গ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান, কুমিল্লা বঙ্গ ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রুদ্র নাথ ওরফে টুটন চালান। উত্তরবঙ্গ, পাবনা-সিরাজগঞ্জ বঙ্গ ও ঢাকা বঙ্গ চালান ১৮ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। এঁরা ছাত্রলীগের কর্মী।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, আবাসিক হলে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের গণরুমে স্থান করে দেওয়া, ম্যানার শেখানো, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নিয়ে যাওয়াসহ র‌্যাগিংয়ের ঘটনায় যুক্ত থাকেন বঙ্গের বড়ভাইয়েরা। বঙ্গের যে দলটি যত বড় হয়, সেই বঙ্গ তত হলের কক্ষ ও আসন দখলে পায়। হলে দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের আসনবণ্টনও নিয়ন্ত্রণে।

জানতে চাইলে শেকৃবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সুবিধার জন্য অঞ্চলভিত্তিক বঙ্গ গ্রুপগুলো চালানো হয়। ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে ক্যাম্পাসে নবীন শিক্ষার্থীদের সুবিধা দেখা হয়। ক্যাম্পাসের নিয়ম–কানুন জানানোর জন্য মিটিংরুমে নেওয়া হয়। তবে আমরা জোর করে মিটিংরুম বা মিছিল করাই না, পড়াশোনার ক্ষতি হয়, এমন কিছুই আমরা করি না।’

>

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের ‘বঙ্গ’ রাজনীতির আধিপত্য
আছে দুটি নির্যাতনকক্ষ
র‌্যাগিং ও নির্যাতনে চুপ থাকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন

শেরেবাংলা হলের তৃতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, বঙ্গের বড়ভাইয়েরা ডাকামাত্র শার্ট–প্যান্ট ইন করে, জুতা–মোজা পরে মিটিংরুমে দুই মিনিটের মধ্যে যেতে হয়। বিকেলে শোডাউনেও যেতে হয়। এসব নিয়মের ব্যত্যয় হলেই মিটিংয়ে মার খেতে হয়। মিটিংয়ে যাঁদের নিয়ন্ত্রণ করা যায় না বা যাঁরা প্রতিবাদ করেন, তাঁদের টর্চার সেলে (নির্যাতনকক্ষ) নেওয়া হয়।

প্রথম বর্ষের অন্তত ১২ জন শিক্ষার্থী জানান, মিটিংয়ের নামে র‌্যাগিং শুরু হয় জানুয়ারিতে হলে ওঠার সময় থেকে। সেপ্টেম্বর মাসেও হলগুলোতে মিটিংয়ের নামে শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করা হয়েছে। এখন তা বন্ধ আছে। নভেম্বর থেকে ডিসেম্বরের দিকে এই মিটিং আবার শুরু হবে। তখন পরবর্তী নবীন ব্যাচদের কীভাবে র‌্যাগ দিতে হবে, সেসব শেখাতে মিটিং চলবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বঙ্গ রাজনীতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে শিক্ষার্থীরা বলেন, এই রাজনীতি একেবারে বন্ধ করা উচিত। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক কামাল উদ্দিন আহমেদ বর্তমানে দেশের বাইরে আছেন। ক্যাম্পাসে বঙ্গ রাজনীতি আছে স্বীকার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মো. ফরহাদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, এটা খুব খারাপ একটা রাজনীতি। বঙ্গের সিনিয়ররা জুনিয়রদের র‌্যাগ দেন। কয়েক বছর ধরে হলগুলোতে বঙ্গ রাজনীতি দেখা যাচ্ছে। এক বঙ্গের সঙ্গে আরেক বঙ্গের দ্বন্দ্ব লাগে, মন–কষাকষি হয়। আগে এলাকাভিত্তিক শিক্ষার্থীরা একে অপরকে খুব সাহায্য করতেন। এখন তা বঙ্গ রাজনীতিতে পরিণত হয়েছে।

শেকৃবিতে দুটি ‘টর্চার সেল’
শিক্ষার্থীরা জানান, শেকৃবিতে ছেলেদের তিনটি হলের মধ্যে নবাব সিরাজ উদদৌলা হলের ডাইনিংরুম, শেরেবাংলা হলের ডাইনিং ও গেস্টরুম, কাজী নজরুল ইসলাম হলের ডাইনিং ও গেস্টরুমে বড়ভাইদের মিটিংগুলোতে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের নিয়মিত অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক। প্রথম বর্ষের যেসব শিক্ষার্থী মিটিংরুমের ম্যানার মানেন না, মিছিলে যান না, প্রতিবাদ করেন কিংবা হল প্রশাসনের কাছে অভিযোগ নিয়ে যান, তাঁদের নির্যাতনকক্ষে নিয়ে নির্যাতন করা হয়।

প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ক্যাম্পাসে দুটি নির্যাতনকক্ষ আছে। একটি শেরেবাংলা হলের ১০১ নম্বর কক্ষ ও আরেকটি ১২৩ নম্বর কক্ষ। নির্যাতনকক্ষে নিয়ে শিক্ষার্থীদের চড়–থাপ্পড় দেওয়া হয়। এরপর বাতি নিভিয়ে রড, স্টাম্প, চেয়ার বা বেঞ্চের হাতল–পায়া দিয়ে পেটানো হয়। ১২৩ নম্বর কক্ষটি চালায় দক্ষিণবঙ্গ দল। এর নেতৃত্ব দেন শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি এস এম মাসুদুর রহমান। ১০১ নম্বর কক্ষটি চালায় উত্তরবঙ্গ দল। এই দলের নেতৃত্ব দেন ছাত্রলীগের কর্মী প্রদীপ্ত রায়, শাহরিয়ার সাগর, বাপ্পি, আসিফ। এঁরা সবাই ১৮ ব্যাচের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরীর অনুসারী। এই দুটি কক্ষ এখনো ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

১০১ নম্বর নির্যাতনকক্ষে অন্তত দুবার যেতে হয়েছে শেরেবাংলা হলের প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থীকে। নির্যাতনকক্ষে কী হয়, জিজ্ঞেস করতেই তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলেন। বললেন, ‘বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরারের সঙ্গে যা যা হয়েছে, সেসবই আমার সঙ্গে হয়েছে। আবরার হয়তো বাঁচতে পারেনি। আমি বেঁচে আছি। গত ২৪ আগস্ট রাতে টর্চার সেলের এক বড়ভাই আমাকে অনবরত মারছিলেন। একপর্যায়ে হাঁপিয়ে ওঠেন। মার থামিয়ে তিনি আমাকে বলেন, তুই এত সহ্য করতে পারিস কীভাবে! আমি চুপ করে ছিলাম। আমার অপরাধ, তাঁদের কথার পিঠে আমি কথা বলি।’

শেকৃবিতে ছাত্রদলের একটি কমিটি আছে। তবে তাদের দৃশ্যত কোনো কার্যক্রম নেই। ক্যাম্পাসে নেই বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলোর কোনো কমিটি বা কার্যক্রম। তাই সাধারণ শিক্ষার্থীদের হয়ে প্রতিবাদ করা বা ভিন্নমতের রাজনীতি করার সুযোগ এখানে নেই।

প্রক্টর মো. ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘এ বছর শুরুর দিকে নতুন ব্যাচ ক্যাম্পাসে এলে মিটিংরুমে নির্যাতনের খবর আমাদের কাছে এসেছিল। আমরা পরে হলে গিয়ে ছাত্রলীগের ছেলেদের সতর্ক করে দিয়েছিলাম। তারপর আর অভিযোগ শুনিনি। হলগুলোতে টর্চার সেলের খবর আমার জানা নেই। বুয়েটের আবরার হত্যার পর আমরা আরও খোঁজখবর নিচ্ছি।’

ছাত্রী হলে ‘প্রোগ্রাম’ আতঙ্ক
শেকৃবিতে দুটি ছাত্রী হল আছে—বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল ও কৃষকরত্ন শেখ হাসিনা হল। এই দুই হলের ছাত্রীদের পড়াশোনা ও পত্রিকা পড়ার জন্য অভিন্ন কক্ষ আছে, যা কমন স্পেস নামে পরিচিত। শিক্ষার্থীরা জানান, এই কমন স্পেসে প্রথম বর্ষের ছাত্রীদের ওপর চলে র‌্যাগিংয়ের নামে মানসিক নির্যাতন। এর নেতৃত্ব দেন দ্বিতীয় বর্ষের (১৮ ব্যাচের) ছাত্রীরা।

এই বছরের মে মাসের শুরুর দিকে জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থীদের র‌্যাগে অসুস্থ হয়ে পড়েন শেখ হাসিনা হলের পাঁচ শিক্ষার্থী। অসুস্থ হওয়া প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘হলে ওঠার পরদিন রাতে সবাইকে ডাকা হয়। সেদিন থেকেই ছাত্রীদের সব “নিয়ম” বলে দেন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রীরা। কেউ সেসব অমান্য করলে কমন স্পেসে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করা হতো। ওই টানা র‌্যাগে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। সিনিয়ররা আমাদের অকথ্য ভাষায় গালাগাল করত, গভীর রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখত। তারপরও নির্যাতন থামাত না। ১৮ ব্যাচের তানজিলা, ইতি, মিতা ওই মিটিংয়ের নেতৃত্ব দেন। সেখানে ১৭ ব্যাচের শিক্ষার্থীরাও ছিলেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমাদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যেতে হয়। অসুস্থ থাকলেও পার পাওয়া যায় না। প্রায় প্রতি রাতে ম্যানার শেখানোর নামে চলছে মানসিক নির্যাতন। ছয় মাস পর্যন্ত চলে এভাবে নির্যাতন। এখন কিছুটা কমেছে।’

চতুর্থ বর্ষে পড়ুয়া শেখ হাসিনা হলের এক ছাত্রী বলেন, ‘আমরা যখন হলে উঠি তখন গণরুমে মিটিং হতো। এখন এই মিটিং চলে কমন স্পেসে। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার, জোর করে ছাত্রীদের রাজনৈতিক প্রোগ্রামে (কর্মসূচি) যেতে বাধ্য করা হয়। আমি দুই বছর গণরুমে ছিলাম, দুই বছরই প্রোগ্রামে গিয়েছি। প্রোগ্রামে না গেলে হলে সিট থাকবে না বলে হুমকি দেওয়া হতো।’

এ বিষয়ে জানতে দুই হলের প্রাধ্যক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাঁদের পাওয়া যায়নি।

ক্যাম্পাসে ভিন্নমত দমন
গত বছরের ১০ এপ্রিল সকালে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় শেকৃবির শিক্ষার্থীরা তাঁদের ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেন। ওই আন্দোলনে কৃষি অনুষদের এক ছাত্রীকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ ওঠে শেকৃবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান, সহসভাপতি আবির আহমেদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে। আবির আহমেদ বর্তমানে শেকৃবির রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে সেকশন কর্মকর্তা ও মাহমুদুল হাসান পতঙ্গবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত।

ওই ছাত্রী প্রথম আলোকে বলেন, ‘সেদিনের আন্দোলনে ছাত্রলীগের নেতা–কর্মীরা প্রথমে আমাদের বাধা দেয়। তারপর ওরা আমার ভিডিও ও ছবি তুলছিল। আমি প্রতিবাদ করায়, আমাকে মারতে আসে তারা। লিখিত অভিযোগের পরও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো তদন্ত বা ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো তারা এ বিশ্ববিদ্যালয়েই চাকরি পেয়েছে। ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের ওপরে কোনো কথাই বলা যায় না।’

আন্দোলনে বাধা দেওয়ার কথা স্বীকার করে শেকৃবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বলেন, ছাত্রীলাঞ্ছনার কোনো ঘটনাই সেদিন ঘটেনি।
ওই লাঞ্ছনার অভিযোগ প্রসঙ্গে সহকারী প্রক্টর রুহুল আমিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওই অভিযোগটি আমলে নেওয়ার মতো ছিল। একটি উচ্চতর পর্যায়ে কমিটি গঠন করাও হয়েছিল। কিন্তু এখনো প্রতিবেদন দেওয়া হয়নি। শিক্ষার্থীদের বসে সমঝোতা করার কথা ছিল। তা হয়েছে কি না, জানি না। অভিযুক্তদের দুজন বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করছেন।’

জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, এর আগে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে র‍্যাগিংয়ের নামে নির্যাতনের ঘটনা শোনা গেছে। এখন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা শোনা গেল। এটা খুবই দুঃখজনক। এসব ঘটনার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় বিরাট ঘাটতির বিষয়টিই সামনে আসে। বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার পর এখন জানা যাচ্ছে, এ ধরনের ঘটনা আগেও ঘটত। আববার ফাহাদের হত্যাকাণ্ডটি খুবই মর্মান্তিক ও দুঃখজনক। এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচিত এসব নির্যাতন বন্ধ করে আবাসিক হলসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।