জেলা প্রশাসনের নির্মম নির্যাতনের বর্ণনা দিলেন সাংবাদিক আরিফ

আরিফুল ইসলাম
আরিফুল ইসলাম

মধ্যরাতে বাড়ির দরজায় আঘাত। পুলিশের কথা বলে দরজা খোলার আহ্বান। না খুলতে চাইলে দরজা ভেঙেই প্রবেশ। এরপর সন্ত্রাসী কায়দায় হাত-পা বেঁধে মারধর। চোখ বেঁধে জোর করে গাড়িতে তুলে নিয়ে গুলি করে হত্যার হুমকি। অনেক অনুনয়-বিনয়েও উপেক্ষা—যে বর্ণনা দেওয়া হলো, তার সঙ্গে কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের মিল খুঁজে পাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু কুড়িগ্রামের সাংবাদিক আরিফুল ইসলামের ওপর এ নিগ্রহ চালিয়েছে কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসনের একটি দল। আরিফুলের অভিযোগ, খোদ জেলা প্রশাসনের আরডিসি (সিনিয়র সহকারী কমিশনার) নাজিম উদ্দীন এ হামলার নেতৃত্ব দেন। নিজ হাতে পেটান। আর এনকাউন্টারে দেওয়ারও হুমকি দেন।

আজ রোববার কুড়িগ্রামের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেন কুড়িগ্রামের বাংলা ট্রিবিউনের জেলা প্রতিনিধি আরিফুল ইসলাম। বর্ণনা দেন শুক্রবার রাতে তাঁকে তুলে নেওয়ার ঘটনার, তাঁর ওপর চালানো ভয়ানক নিগ্রহের। আর নিজের নিরাপত্তার দাবি করেন রাষ্ট্রের কাছে।

গত শুক্রবার মধ্যরাতে আরিফুল ইসলামকে বাড়ি থেকে তুলে এনে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, মাদকবিরোধী অভিযানে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর কাছ থেকে ৪৫০ গ্রাম দেশি মদ ও ১০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবি টাস্কফোর্সের। তবে এ ঘটনার পর আরিফুলের স্ত্রী দাবি করেন, পুরো ঘটনাই সাজানো।

জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনের অনিয়মের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করাই আরিফের কাল ছিল। আরিফকে তুলে নেওয়া ও সাজা দেওয়ার ঘটনায় দেশব্যাপী সমালোচনার ঝড় ওঠে। গতকাল শনিবার রংপুরের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারকে পাঠানো হয় এর তদন্তে। প্রশাসনমন্ত্রী কালই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের প্রতিশ্রুতি দেন। আজ সকালে আরিফের জামিন হয়। শুধু তা–ই নয়, প্রতিবাদের মুখে আজ কুড়িগ্রামের ডিসিকে প্রত্যাহার করা হতে পারে বলে ঘোষণা দেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন। তিনি ডিসির বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও কথা জানান ।

আজ আরিফুল বলেন, শুক্রবার রাত ১২টার দিকে খেয়ে শুয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এ সময় দরজায় ধাক্কার শব্দ পান। পরিচয় জানতে চাইলে, ওপাশ থেকে বলা হয়, ‘থানা থেকে আসছি।’ আরিফুল বলেন, ‘এ সময় আমি সদর থানার ওসিকে ফোন দিই। ওসি বলেন, থানা থেকে কাউকে পাঠানো হয়নি। ফোন দেওয়ার কথা শুনে বাইরে থাকা আরডিসি (সিনিয়র সহকারী কমিশনার, রাজস্ব) নাজিম উদ্দিনের নেতৃত্বে একদল লোক দরজা ভেঙে বাসায় ঢোকে। এ সময় কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার রিন্টু বিকাশ চাকমাও ছিলেন। তবে রিন্টু চাকমা কোনো আঘাত করেননি। ঘরে ঢুকেই আরডিসি নাজিম উদ্দিন আমার মাথায় কিল-ঘুষি মারতে শুরু করেন। মারতে মারতে আমাকে টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে তুলে চোখ-হাত-পা বেঁধে ফেলা হয়। এরপর আমাকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে এনকাউন্টার দিতে চায়। আমাকে বারবার বলেন, আজ তোর জীবন শেষ। তুই কলেমা পড়ে ফেল, তোকে এনকাউন্টার দেওয়া হবে।’


সেই রাতের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে আরিফুল বলেন, ‘আমি কান্নাকাটি শুরু করি। অনেক অনুনয়-বিনয় করি। আমি প্রাণ ভিক্ষা চাই। বলি, আমার বাবা-মা নেই, আমার দুটি সন্তান আছে। আমাকে যেন না মেরে ফেলা হয়। তাহলে আমার বাচ্চা দুটি এতিম হয়ে যাবে। পরে তারা আমাকে গাড়িতে করে একটি ভবনে নিয়ে যায়। আমি চোখের কাপড় একটু খুলে বুঝতে পারি এটা ডিসির কার্যালয়। এবার আমি একটু আশ্বস্ত হয়, অন্তত আমাকে এনকাউন্টারে দেওয়া হবে না।’

আরিফ বলেন, ‘নাজিম উদ্দিনের নেতৃত্বে আমাকে একটি কক্ষে নিয়ে বিবস্ত্র করে বেধড়ক মারধর করা হয়। নাজিম উদ্দিন বলেন, তোর ভিডিও করে রাখছি। এ সময় অকথ্য ভাষায় গালাগালি করা হয়। একপর্যায়ে নাজিম উদ্দিন বলেন, তোর বাবার নাম কী। আমি বলি, স্যার, আমার বাবা তো মারা গেছেন। তখন নাজিম উদ্দিন আবার পেটাতে পেটাতে বলেন, বল, ডিসি আমার বাবা, ডিসি আমার বাবা। আরডিসি বারবার আরেকজনকে বলছিলেন, ডিসি স্যারকে ফোন দাও, মেসেজ দাও। কী করব, সেটা বলতে বলো?’

আরিফ বলেন, ‘মারধরের সময় আমি বারবার জানতে চেয়েছি, আমার অপরাধ কী? তখন নাজিম উদ্দিন বলেন, তুই আমাদের অনেক জ্বালাচ্ছিস। ডিসির বিরুদ্ধে লিখিস। তুই বড় সাংবাদিক হয়ে গেছিস। আজ তোর সাংবাদিকতা ছোটাব।’

শুক্রবার রাতেই চোখ বাঁধা অবস্থায় চারটি কাগজে আরিফুলের স্বাক্ষর নেওয়া হয়। ভোরের দিকে একটু তড়িঘড়ি করে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়। নাজিম উদ্দিন একবার জিজ্ঞেস করেন, ‘তুই ওসিকে ফোনে করছিলি কেন?’

আরিফুলের এসব অভিযোগ নিয়ে আরডিসি নাজিম উদ্দিনের মুঠোফোনে কয়েকবার ফোন করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।