যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের কাছ থেকে পুরস্কার নিচ্ছেন প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি রোজিনা ইসলাম
ছবি: যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সৌজন্যে

সাংবাদিকতার মাধ্যমে দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ে ভূমিকা রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০২২ সালের অ্যান্টিকরাপশন চ্যাম্পিয়নস অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি রোজিনা ইসলাম। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর শুক্রবার রোজিনা ইসলামসহ বিশ্বের আট দেশের আটজনকে এ বছর এই পুরস্কার দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবসে যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় শুক্রবার সকালে (বাংলাদেশ সময় শুক্রবার রাতে) ওয়াশিংটনে এই আটজনের হাতে পুরস্কার তুলে দেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা নিজ নিজ দেশে দুর্নীতি প্রতিরোধ, দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ ও দুর্নীতি মোকাবিলায় নেতৃত্ব দিয়েছেন, সাহস দেখিয়েছেন এবং প্রভাব রাখতে সক্ষম হয়েছেন।

আরও পড়ুন

সাহসী সাংবাদিকতার জন্য 'ফ্রি প্রেস অ্যাওয়ার্ড' পেলেন রোজিনা ইসলাম

এক দশকের বেশি সময় ধরে প্রথম আলোতে কর্মরত রোজিনা ইসলাম বাংলাদেশে করোনাকালে স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম তুলে ধরতে গিয়ে নিগ্রহ, নির্যাতন ও মামলার শিকার হয়েছিলেন। সাহসী সাংবাদিকতার জন্য গত বছর তাঁকে সেরা অদম্য সাংবাদিক (মোস্ট রেজিলিয়েন্ট জার্নালিস্ট) শ্রেণিতে ‘ফ্রি প্রেস অ্যাওয়ার্ড’ দিয়েছিল নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামভিত্তিক সংস্থা ফ্রি প্রেস আনলিমিটেড।

রোজিনা ইসলাম ছাড়াও এ বছর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্টিকরাপশন চ্যাম্পিয়নস অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন মেক্সিকোর সংবাদমাধ্যম সেমিনারিও জেটার সাংবাদিক আন্টোনিও সারভেনটিস, সার্বিয়ার ক্রাইম অ্যান্ড করাপশন রিপোর্টিং নেটওয়ার্কের (কেআরআইকে) প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক স্টেফান দোকসিনোভিচ, কলম্বিয়ার সুপ্রিম কোর্ট অব জাস্টিসের ইনভেস্টিগেশন চেম্বারের সভাপতি মারকো আন্টোনিও রুদা সোতো, ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রণ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক কিসমাহ সালি আলী মেন্দেলি, মাদাগাস্কারের কোর্ট অব অ্যাকাউন্টসের প্রেসিডেন্ট জিন দে দিউ রাকোতোনদ্রামিহামিনা, মালয়েশিয়ার সেন্টার টু কমব্যাট করাপশন অ্যান্ড ক্রোনিজমের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক সিনথিয়া গ্যাব্রিয়েল এবং জিম্বাবুয়ের জিম্বাবুয়ে কোয়ালিশন অব ডেট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক জ্যানেট ঝোও।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরে এ বছর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্টিকরাপশন চ্যাম্পিয়নস অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্তরা
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সৌজন্যে

পুরস্কারের জন্য নাম ঘোষণার সময় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন করোনাকালে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার চিত্র প্রকাশে সাংবাদিক হিসেবে রোজিনা ইসলামের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। ব্লিঙ্কেন বলেন, আজকের চ্যাম্পিয়নদের প্রত্যেকের একটি জায়গায় মিল রয়েছে—তাঁরা যে যেখান থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কাজ করেছেন, সবাইকে সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। প্রত্যেকেই একটি বার্তা দিয়েছেন যে প্রতিষ্ঠান, সমাজ সবাই একসঙ্গে মিলে আমরা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও মানুষের জীবনমানে পরিবর্তন আনতে পারি। পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কাজ সাধারণ মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

রোজিনা ইসলামসহ বিভিন্ন দেশের এই আটজনকে এবার অ্যান্টি–করাপশন চ্যাম্পিয়ন অ্যাওয়ার্ড দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
ছবি: যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের টুইট থেকে নেওয়া

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক হিসেবে রোজিনা ইসলাম বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও দুর্নীতির খবর প্রকাশে সাহস এবং দৃঢ়তার পরিচয় দিয়ে চলেছেন। কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তারা কীভাবে জনগণের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন, তা তাঁর বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

হুমকি সত্ত্বেও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় রোজিনা ইসলাম তাঁর লড়াই অব্যাহত রেখেছেন।
এই পুরস্কারের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বাংলাদেশে দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনতে সাংবাদিকতা যে ভূমিকা রাখছে, তার স্বীকৃতি দিয়েছে বলে মনে করেন রোজিনা ইসলাম। পুরস্কারটি তিনি বাক্‌স্বাধীনতার অধিকার রক্ষায় দেশ-বিদেশে সোচ্চার ব্যক্তিরা এবং কঠোরতর আইন, ভয়ভীতি, গ্রেপ্তার, মামলা ও হয়রানির মধ্যেও যাঁরা সেরা সাংবাদিকতার জন্য সংগ্রাম করছেন, সেসব সাংবাদিকের প্রতি উৎসর্গ করেছেন।

রোজিনা ইসলামকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের টুইট

বাইডেন প্রশাসনের দুর্নীতিবিরোধী লড়াই

২০২০ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে জো বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দুর্নীতিবিরোধী লড়াইকে জোরদারের লক্ষ্যে এই পুরস্কার চালু করা হয়। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম এই পুরস্কার দেওয়া হয়। পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বাছাই করা হয় ছয় মহাদেশ থেকে। কোনো দেশের জাতীয় ও স্থানীয় প্রশাসনে নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তি, রাষ্ট্রীয় কোম্পানির কর্মকর্তা এবং বেসরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের কর্মী হিসেবে দুর্নীতি প্রতিরোধে ভূমিকা রাখছেন—এমন ব্যক্তিদের মনোনীত করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের মতে, দেশে দেশে দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তিরা গণতান্ত্রিক অধিকার ও স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করছেন, কর্তৃত্ববাদী শাসনকে শক্তিশালী করছেন, জনগণের ওপর নজরদারি বাড়াচ্ছেন এবং চরমপন্থা ও বিভাজনকে উসকে দিচ্ছেন। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা শুধু তাঁদের জনগোষ্ঠীর জন্য ক্ষতিকরই নন, গণতন্ত্রের জন্যও ক্ষতিকর।

বিভিন্ন দেশের দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার অংশ হিসেবে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে থাকে যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি দুর্নীতি নির্মূলের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বিশ্বজুড়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের সম্মাননা জানানোর এই উদ্যোগ নেওয়া হয়।

প্রথম দফায় পুরস্কার পাওয়া ১২ জনের মধ্যে গুয়াতেমালার হুয়ান ফ্রান্সিসকো সানদোভাল আলফারো ও ইকুয়েডরের ডিয়ানা সালাজার রয়েছেন। তাঁরা দুজনই প্রসিকিউটর হিসেবে সাহসের সঙ্গে নিজেদের দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বড় দুর্নীতির মামলায় আসামিদের সাজার মুখোমুখি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

সে সময় ভারতে জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের কর্মী অঞ্জলি ভরদ্বাজকেও এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল। এরপর গত বছরের ৯ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবসে ১২ জনকে পুরস্কৃত করে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

করোনা মহামারির মধ্যে গত বছর পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে। এবারই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরে মনোনীত ব্যক্তিদের হাতে পুরস্কারটি তুলে দেওয়া হলো।

রোজিনা ইসলামের লড়াই চলবে

সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম গত বছরের ১৭ মে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে গিয়ে আক্রমণের শিকার হন। তাঁকে প্রায় ছয় ঘণ্টা আটকে রাখা হয়। পরে তাঁকে শত বছরের পুরোনো ‘অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে’ গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

রোজিনা ইসলাম পাঁচ দিন পর জামিনে মুক্ত হন। দীর্ঘদিন তাঁর পাসপোর্ট, মুঠোফোন ও অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড (পেশাগত দায়িত্ব পালনে সচিবালয়ে প্রবেশের অনুমতিপত্র) আটকে রাখা হয়। রোজিনা ইসলামকে নির্যাতন ও মামলার প্রতিবাদে দেশে-বিদেশে কর্মসূচি পালিত হয়। বিভিন্ন দেশি ও বিদেশি সংস্থা প্রতিবাদ জানায়।

রোজিনা ইসলাম গত বছর ১৭ মে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের তথ্য সংগ্রহ করতে সচিবালয়ের স্বাস্থ্য বিভাগে গেলে সরকারি কর্মকর্তারা তাঁকে প্রায় ছয় ঘণ্টা আটকে রাখেন ও হেনস্তা করেন। পরে রাষ্ট্রীয় গোপন নথি সরানোর অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ছবি: সাজিদ হোসেন

এক বছরের বেশি সময় তদন্তের পর গত জুলাইয়ে রোজিনা ইসলামের মামলায় আদালতে প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। সেখানে রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ার কথা তুলে ধরে তাঁকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। বিষয়টি এখন ঢাকার আদালতে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

রোজিনা ইসলাম স্বাস্থ্য খাত ছাড়াও স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, অপরাধসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিবেদন করেছেন।

এর আগেও রোজিনা ইসলাম সাংবাদিকতায় বেশ কিছু পুরস্কার পেয়েছেন। গত বছর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) স্বাস্থ্য খাতে সেরা প্রতিবেদনের পুরস্কার পান তিনি। এই প্রতিবেদন ছিল স্বাস্থ্য খাতে নিয়োগে দুর্নীতিসংক্রান্ত। ২০১১, ২০১৪ ও ২০১৭ সালেও ডিআরইউ পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।

রোজিনা ইসলাম ইউনেসকো অ্যাওয়ার্ড (২০১১), কানাডিয়ান অ্যাওয়ার্ডস ফর এক্সিলেন্স ইন বাংলাদেশি জার্নালিজম (২০১১), লতিফুর রহমান পুরস্কার, প্রথম আলো সেরা প্রতিবেদক পুরস্কার (২০১৩ ও ২০১৪), ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সেরা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পুরস্কারসহ (২০১৫) বিভিন্ন পুরস্কার পেয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের এই পুরস্কার দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখতে প্রেরণা জোগাবে বলে উল্লেখ করেছেন রোজিনা ইসলাম। সাহসী সাংবাদিকতার প্রতি অবিচল থাকার প্রত্যয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি যখন জেল থেকে বেরিয়েছিলাম, তখন সাংবাদিকতার জন্য জীবন উৎসর্গ করার প্রতিজ্ঞা করেছিলাম। আজ এই পুরস্কার গ্রহণের মধ্য দিয়ে আমি সেই অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করছি যে বাক্‌স্বাধীনতা রক্ষায় লড়াই চলবে।’