বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বেবীর মা-বাবার দেওয়া নাম ছিল আসমা। তবে বেবী নামেই এলাকায় পরিচিত তিনি। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়েছে প্রায় নয় বছর। স্বামী আগেও বিয়ে করেছিলেন, তা জানতেন না বেবী। নেশা করার পাশাপাশি বেবী ও তাঁর ছেলেকে প্রচণ্ড মারধর করতেন। তাই বেশ কয়েক বছর মাটি কামড়ে ছিলেন স্বামীর সঙ্গে। পরে আর তা সম্ভব হয়নি।

মুন্সিগঞ্জে বেবীর বাবার বাড়ি ছিল। তাঁর বয়স যখন ৯ বা ১০ বছর, তখন পদ্মায় বাড়িঘর সব বিলীন হয়ে যায়। বাবা জয়দেবপুরে এক কোম্পানিতে কাজ করতেন। সেখান থেকে ছাঁটাই হয়ে ঢাকায় এসে রিকশা চালাতেন। এখন মা-বাবা কেউ বেঁচে নেই।

বাবার প্রসঙ্গে আসতেই বেবী আদুরে গলায় বলন, ‘আমি আব্বুর খুব আদরের একমাত্র মেয়ে ছিলাম। আব্বু যত দিন বেঁচে ছিলেন, আমাকে কোনো কাজ করতে দেন নাই। বলছেন, আব্বু মরলে আমি যাতে কাজ করি। আব্বু মারা যাওয়ার পর থেইক্যাই আমরা অবস্থা খারাপ হয়। ভাইয়েরাও এখন আর কেউ ঢাকায় থাকে না।’

default-image

বেবীর ভাইয়েরাও ঢাকায় রিকশা চালাতেন। সেখানেই বেবীর স্বামীর সঙ্গে পরিচয় ও পরে বিয়ে হয়েছিল। বাউনিয়া বাঁধ এলাকায় বেবীর কেটে গেছে জীবনের প্রায় ২৬টি বছর। ফলে, এলাকায় মোটামুটি পরিচিতি আছে। অটোরিকশা চালানোর আগে বেবী মানুষের বাড়ি ও পোশাক কারখানায় কাজ করেছেন। এ ছাড়া সড়কের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজসহ নানা কাজ করেছেন। তবে ছেলে ছোট ছিল, কাজ থেকে ফিরে দেখতেন ছেলেকে অন্য মানুষ মেরেছে। হারিয়েও গিয়েছিল একবার। অটোরিকশা চালাতে শুরু করার পর ভালোই ছিলেন। তবে একবার একটি মাইক্রোবাস পেছন থেকে অটোরিকশাকে ধাক্কা দিলে তিনি পড়ে যান। তার পর থেকে তাঁর শারীরিক অবস্থা খারাপ হয়ে যায়।

বেবীর দোতলা ঘরে ঢুকতে হলে লোহার মইয়ের মতো সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। কাঠ দিয়ে বানানো রেলিংটাও নড়বড়ে। বেবী জানান, বাথরুমে যাওয়া, রান্না করাসহ সব কাজই করতে হয় নিচে নেমে। এই সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে কয়েকবার নিচেও পড়ে গেছেন। এ ছাড়া একবেলা অটোরিকশা চালানো, ঘরে ফিরে মা-ছেলের রান্নাসহ অন্যান্য কাজ করতে করতে শরীরের অবস্থা এমনিতেই কাহিল। কিন্তু চিকিৎসা করানোর টাকা নেই।

default-image

বেবীর ঘরে ছোট ভাঙা একটি শোকেস। তাতে মা ও ছেলের কাপড় এলোমেলো করে রাখা। শোকেসের ওপর একজনের দেওয়া ছোট একটি টেলিভিশন। ঘরের মেঝেতে মা ও ছেলের বিছানা। ঘরের দেয়ালে ঝুলছে ময়লা একটি ক্যালেন্ডার ও কিছু কাপড়। আসবাব বলতে প্লাস্টিকের দুটি টুল। প্রায় অন্ধকার ঘরে ছোট একটি জানালা দিয়ে কিছুটা আকাশ দেখা যায়। আর পাশে আরেক ঘরে সংসারের হাঁড়িপাতিলসহ অন্যান্য জিনিস প্রায় স্তূপ করে রাখা।

বেবী ছেলেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়িয়েছেন। করোনায় স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেলে ছেলের পড়াও বন্ধ হয়ে যায়। বেবী বলেন, ছেলের পড়াশোনা গোল্লায় গেছে। আবার নতুন করে স্কুলে ভর্তি করতে গেলে অনেক খরচের ব্যাপার। ঘরে বসে আছে, তাই ছেলেকে কাজে দিয়েছেন। সেখানে কাজ শিখছে—এ অজুহাতে মালিক কোনো বেতন বা খাবার দেন না। মা ও ছেলে আশায় আছে, কাজ শেখা শেষ হলে নিশ্চয়ই কিছু বেতন পাওয়া যাবে।

ঘরে বসে কথা বলার একপর্যায়ে অসুস্থ শরীর নিয়েই বেবী তাঁর অটোরিকশা নিয়ে বের হলেন। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা সরকার অনুমোদিত না, তাই গলির বাইরে তেমন একটা যেতে পারেন না। আশপাশের সড়কে চালাতে গেলেও পুলিশি ঝামেলা পোহাতে হয়। অটোরিকশা চালিয়ে যা আয় করেন, তা থেকে টাকার ভাগ দিতে হয় পুলিশ ও এলাকার অন্যদের।

default-image

বেবী বলেন, ‘মেয়ে মানুষ, তাই রাত আটটার পর আর বাইরে থাকি না। একবেলা অটো চালাই। রোদে-মেঘে অবস্থা কাহিল হয়ে যায়। মহাজনের টাকা, পুলিশে ধরলে পুলিশরে ভাগ দেওয়ার চিন্তা তো আছেই। আর মেয়ে মানুষ বলে আমার অটোতে যাত্রীও তেমন উঠতে চায় না। ভাবে অ্যাকসিডেন্ট হইব। ভাড়া নিয়াও ঝামেলা করে। আর রাস্তার পুরুষ, অটো-রিকশাচালকেরাও তাদের কাজে ভাগ বসাইছি বইল্যা গালি দেয়। আমি নাকি পুরুষের মানসম্মান নষ্ট করছি। টিটকারি মারে। ছেলেও মাঝেমধ্যে অটো চালানো ছাইড়া দিতে কয়। তয় আমি মানুষের কথায় কান দিই না। কান দিলে তো পেট চলব না। কেউ তো আমারে বা আমার ছেলেরে খাওয়াইবো না।’
অটোরিকশা চালাতে চালাতে বেবী তাঁর লোহার মতো শক্ত হয়ে যাওয়া হাত দুটি দেখালেন। নারী হয়ে অটোরিকশা চালান বলে সাংবাদিকসহ অনেকেই ছবি ও ভিডিও করে নিয়ে যান। মানুষের মুখে শোনেন, তাঁকে নাকি ফেসবুক ও ইউটিউবে দেখা গেছে। বেশ খানিকটা ক্ষোভ প্রকাশ করেই বেবী বললেন, ‘সবাই আইস্যা ভালো ভালো কথা বইল্যা আমার ছবি নিয়া যায়। কেউ আমারে ২০০/৫০০ টাকা দিয়াও সাহায্য করে না। নারী হইয়া অটো চালাই, তাই অটোর যাত্রীরা আমারে হাজারটা প্রশ্ন কইরা বিরক্ত কইরা ফালায়। কিন্তু আমার তো আর কোনো লাভ হয় না।’

শারীরিক যন্ত্রণায় বেবী মাঝেমধ্যে ভাবেন, অটোরিকশা চালানো বাদ দেবেন। কিন্তু পোশাকশিল্প কারখানা বা মানুষের বাসায় কাজ করার শক্তিও তো নেই শরীরে। অটোরিকশা তবু নিজের ইচ্ছেমতো একবেলা চালাতে পারছেন।

বেবীর যখন মন বেশি খারাপ হয়, ঘরে বসে গুনগুন করে বাবার পছন্দের গান গাইতে থাকেন। ভাবেন, তাঁর নিজের যদি একটি অটোরিকশা থাকত, তাহলে আর মহাজনের গালি খেতে হতো না। দিনে যা আয় করতেন, তা দিয়ে মা–ছেলের ভালোই চলে যেত।
ছেলে এখন পর্যন্ত মায়ের কষ্টটা বুঝতে পারছে। কিন্তু ছেলে কত দিন এ কষ্ট বুঝবে, তাও জানেন না বেবী। চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন, ‘ছেলে বাইরে কাউরে আপেল-কমলা খাইতে দেইখ্যা আইস্যা বায়না করে তারেও আপেল কিইন্যা দিতে। গরুর গোশত খাইতে চায়। মালটা খাইতে চায়। পেটে ভাত জোটে না, আপেল কই পামু? তখন খুব কষ্ট পাই।’

বেবী নারী হয়ে অটোরিকশা চালান—বিষয়টি নিয়ে মাঝেমধ্যে তাঁর গর্বও হয়। বলেন, ‘অটো চালাইতে অনেক কষ্ট। সবাই অটো চালানোর সাহসও পাইবো না। আমি নিজেই সাহস কইরা পুরুষদের দেইখ্যা দেইখ্যা চালানো শিখছি। তারপর মহাজনরে গিয়া বলছি, অটো চালামু। মহাজন খালি বলছে, অ্যাকসিডেন্ট করলে বা লাভ-লস যা–ই হোক, তা নিয়া তার মাথাব্যথা নাই। খালি তার ভাগের টাকা নিয়ম কইরা পাইলেই হইল।’

বেবীর জীবনে যত আতঙ্ক বা কষ্টই থাকুক, তাঁর ছোট মুঠোফোনে কল দিলেই রিংটোনে বেজে চলে—

‘আমার মতো এত সুখী নয়তো কারও জীবন

কী আদর, স্নেহ, ভালোবাসায় ঝরাল মায়ার বাঁধন...।’

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন