মেয়ে দুটো কথা বলছিল বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আজ রোববার বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে। রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘অভিভাবকই পারে বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে’ শিরোনামের সেমিনারে মেয়ে দুটোর পাশাপাশি অভিভাবকেরাও তুলে ধরেছেন তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা।

অনুষ্ঠানে মিরপুরের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এক বাবা আফসোস করে বললেন, অভাব কিছুটা কমাতে ছোট্ট মেয়েটাকে বিয়ে দিলেন। জামাতার বারবার যৌতুকের দাবি মেটাতে না পেরে এখন মেয়েকে ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছেন। মেয়েটি ফিরে এসেছে দুটো নাতি-নাতনি নিয়ে। তাঁর অসচেতনতায় সংসারের অভাব তো কমলই না, উল্টো বাড়ল।কুষ্টিয়ার এক সচেতন অভিভাবক বললেন, ‘আমার মেয়ের জন্য অনেক বিয়ের প্রস্তাব আসে। মানা করে দিলেও অনেকে শোনে না। এখন রেগে গিয়ে বলি, যে বিয়ের প্রস্তাব আনবে তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেব। আমি মেয়েকে বিয়ে দেব না, চিকিৎসক বানাব। মেয়েও চিকিৎসক হতে চায়।’

সেমিনারে মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুারো (বিবিএস) ও জাতিসংঘের শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাসটার সার্ভে ২০১৯ অনুসারে, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী মেয়েদের ৫১ দশমিক ৪ শতাংশের ১৮ বছর বয়সের আগে বিয়ে হয়। ১৫ বছর বয়স হওয়ার আগে বিয়ে হয় ১৫ শতাংশের। করোনাকালে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন বাল্যবিবাহের ওপর ২১ জেলায় গবেষণা করে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী ১৩ হাজার ৮৮৬ মেয়ের বাল্যবিবাহের তথ্য পেয়েছে। এর মধ্যে ৭৮ শতাংশের বাল্যবিবাহ হয়েছে অভিভাবকের ইচ্ছায়।

সেমিনারে বক্তারা বলেন, দারিদ্র্য, নিরাপত্তাহীনতার অজুহাত দিয়ে মেয়েদের বোঝা মনে করেন অভিভাবক। অথচ তাঁদের সামান্য মনোযোগে মেয়েটি পরিবারের জন্য ভরসা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই বাল্যবিবাহ না দিয়ে মেয়েসন্তানের পড়াশোনা এগিয়ে নেওয়ার জন্য অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। অভিভাবকের ইচ্ছেতেই বাল্যবিবাহ বেশি হয়। তাই অভিভাবক চাইলেই বাল্যবিবাহ বন্ধ হবে।

সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি বলেন, অনেক অভিভাবক বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর দিক নিয়ে জানেন না। শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতির আগেই বাল্যবিবাহের মাধ্যমে মেয়েটির ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে মেয়েটির সম্ভাবনা নষ্ট হয়। এমনকি অল্প বয়সে মা হয়ে মাতৃমৃত্যু ও নবজাতক মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি হয়। যার যার জায়গা থেকে সম্মিলিত ভূমিকা পালনের মধ্য দিয়ে সামাজিক এ সমস্যা থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। তিনি বলেন, বিয়ে হয়ে গেলেও মেয়েটি যেন পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে সে লক্ষ্যে সরকার পদক্ষেপ নেবে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাছিমা বেগম বলেন, যে পরিবারে মূল্যবোধ আছে, সেই পরিবার বাল্যবিবাহ দেয় না। মেয়েসন্তানকে ঘিরে মা–বাবাকে স্বপ্ন দেখতে হবে। মেয়েটিকেও স্বপ্ন দেখাতে হবে, যেন সে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। তিনি মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সেলাই মেশিন বিতরণ কর্মসূচির শর্ত হিসেবে ১৮ বছরের আগে মেয়েকে বিয়ে দেয়নি, এমন পরিবারগুলোকে বেছে নেওয়ার আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম। তিনি বলেন, বাল্যবিবাহের মতো মানবাধিকারের বড় লঙ্ঘনের ঘটনা বন্ধ করতে সবাইকে সক্রিয় হতে হবে। বাল্যবিবাহ না দিতে মা–বাবাকে কীভাবে উদ্বুদ্ধ করা যায়, কীভাবে সহায়তা দেওয়া যায়, সেটা নিয়ে আরও পরিকল্পনা নিতে হবে ও তার বাস্তবায়ন করতে হবে।

বাল্যবিবাহ পরিস্থিতি নিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের কর্মসূচি সমন্বয়ক অর্পিতা দাস। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসলিমা ইয়াসমীন, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ফারজানা রহমান, বাংলাদেশে হাইকমিশন অব কানাডার উন্নয়ন উপদেষ্টা সিলভিয়া ইসলাম, ইউনিসেফ বাংলাদেশের কর্মসূচি কর্মকর্তা তাহমিনা হক, কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ, কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা সখিনা খাতুন এবং অনলাইনে যুক্ত হন সুইডেন দূতাবাসের মানবাধিকার ও গণতন্ত্র উন্নয়ন সহায়তা বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মসূচি কর্মকর্তা (জেন্ডার সমতা) রেহানা খান।

এ ছাড়া কয়েকজন অভিভাবক বিভিন্ন জেলা থেকে অনলাইনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানে যুক্ত হন। সেমিনারে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েদের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনা, স্কুলপর্যায়ে বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া, দরিদ্র অভিভাবকদের কাজের সুযোগ সৃষ্টি ও ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া ইত্যাদির সুপারিশ করা হয়।

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন