default-image

পুরান ঢাকার নিমতলীতে ২০১০ সালে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর সেখান থেকে রাসায়নিকের গুদাম সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। নেওয়া হয় প্রকল্প। কিন্তু ১০ বছরেও সেই কাজ সম্পন্ন করা যায়নি। বর্ধিত মেয়াদেও (২০২২ সালের জুন) প্রকল্পটি শেষ হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। ফলে পুরান ঢাকায় রাসায়নিকের গুদাম থেকেই যাচ্ছে। সঙ্গে থাকছে আরও অগ্নিকাণ্ড আর মৃত্যুর ঝুঁকি।

এদিকে রাসায়নিকের গুদাম গত ১০ বছরে যেমন স্থানান্তর করা যায়নি, তেমনি পুরান ঢাকাকে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিমুক্ত রাখতে সরকার এই সময়ে তেমন কোনো উদ্যোগও নেয়নি। ফলে সরকারি বিভিন্ন সংস্থাও রাসায়নিক আমদানির অনুমোদন দিয়ে সেটা কোথায় রাখা হচ্ছে, তার খোঁজ রাখেনি। কোনো সংস্থা আবার লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ রাখলেও অবৈধ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে নেয়নি কোনো পদক্ষেপ। সংস্থাগুলোর এমন সমন্বয়হীনতার সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা ঢাকার বাইরের বিভিন্ন ঠিকানায় ব্যবসার অনুমতি নিয়ে পুরান ঢাকার ভেতরেই রাসায়নিকের মজুত ও ব্যবসা নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাচ্ছেন। এই অবহেলা আর দায়িত্বহীনতার সাম্প্রতিকতম পরিণতি আরমানিটোলার অগ্নিকাণ্ড।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা রাসায়নিক ব্যবসায়ীদের ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ রেখেছে। তবে অবৈধ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে তারা কঠোরভাবে অভিযান চালাতে পারছে না। কারণ, এতে রাসায়নিক দ্রব্যের ওপর নির্ভরশীল শিল্পকারখানায় প্রভাব পড়বে।

ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী বলেন, ‘সিটি করপোরেশন ট্রেড লাইসেন্স না দেওয়ার মাধ্যমে ব্যবসা বন্ধ করার চেষ্টা করছে। তবে আমরা ট্রেড লাইসেন্স না দিলেও বাকিরা কিন্তু চুপ নেই।’

বিজ্ঞাপন

বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, পুরান ঢাকায় অবৈধ রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর সামর্থ্য তাঁদের কম। এ ছাড়া ঢাকার বাইরের ঠিকানায় ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে কোনো ব্যবসায়ী পুরান ঢাকায় ব্যবসা করলেও কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না পেলে সেটা বের করার উপায় তাঁদের নেই।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া বলেন, ‘রাসায়নিকের একটি দুর্ঘটনায় পুরো এলাকা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তাই এখনই সচেতন না হলে সামনে আরও বড় বিপদ আছে। দুর্ঘটনা ঘটলেই বলা হয়, গুদাম অনুমোদনহীন। তাহলে এত এত কর্তৃপক্ষের কাজ কী?’

সুলতানা রাজিয়ার পরামর্শ হলো, সরকারকে প্রথমত রাসায়নিক গুদাম স্থানান্তরের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, দ্রুত চিহ্নিতকরণ করে কোথায়, কী ধরনের এবং কত পরিমাণে বিপজ্জনক রাসায়নিক মজুত আছে, তা জানতে হবে। তৃতীয়ত, বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দা কিংবা ভবনের ভাড়াটেদের সতর্ক করতে হবে।

এদিকে পুরান ঢাকার মতো ঘিঞ্জি এলাকা থেকে রাসায়নিকের ব্যবসায়ীরাও স্থানান্তরে রাজি আছেন। তবে স্থানান্তরের জন্য বিকল্প জায়গা এখনো অপ্রস্তুত।

বাংলাদেশ কেমিক্যাল অ্যান্ড পারফিউমারি মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা এনায়েত হোসেন বলেন, কেরানীগঞ্জে প্রথম জায়গা নির্ধারণ করা হলেও বিসিক (বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন) কর্তৃপক্ষ সেটা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়। পরবর্তীকালে অস্থায়ীভাবে টঙ্গী এবং নারায়ণগঞ্জের পাগলায় স্থানান্তরের পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন হয়নি। কয়েক বছর আগে মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে প্লট বরাদ্দের পরিকল্পনা করা হলেও আজ পর্যন্ত একটা প্রকল্প কার্যালয় ছাড়া কোনো কাজ হয়নি।

* আরমানিটোলার অগ্নিকাণ্ডে ভবনমালিক, রাসায়নিক গুদামের মালিকসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা। * অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ নবদম্পতি মুনা সরকার ও আশিকুজ্জামান খান লাইফ সাপোর্টে।

তবে বিসিক কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের (রাসায়নিক পল্লির) প্রকল্প পরিচালক সাইফুল আলম বলেন, জমি অধিগ্রহণের পর মাটি ভরাটের দরপত্রও হয়ে গেছে। প্রকল্পের মেয়াদের মধ্যেই অবকাঠামো নির্মাণ শেষ করা সম্ভব হবে।

পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক গুদাম ও প্রক্রিয়াজাতকরণ স্থাপনা স্থানান্তরে সমন্বিত পরিকল্পনা, সচেতনতা ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গাফিলতির বিষয়টি আরমানিটোলার মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রতীয়মান হয়েছে বলে এক বিবৃতিতে মন্তব্য করেছে হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ। পৃথক আরেকটি বিবৃতিতে পুরান ঢাকা থেকে অবিলম্বে রাসায়নিক গুদামগুলো সরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।

আরমানিটোলায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মামলা

বংশাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন ফকির বলেন, আরমানিটোলায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ভবনের মালিক, রাসায়নিক গুদামের মালিকসহ আটজনের বিরুদ্ধে অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে থানায় মামলা করেছে পুলিশ। এজাহারে অজ্ঞাতনামা আরও ১৫-২০ জনকে আসামি করা হয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে।

এদিকে অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ নবদম্পতি মুনা সরকার ও আশিকুজ্জামান খানের চেতনা গতকাল শেষ খবর পাওয়া পর্যন্তও ফেরেনি।

বিজ্ঞাপন
রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন