আজ বিকেলে মুঠোফোনে মহিউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুর্ঘটনার সময়ও আমি আমার এই পা হারাতে পারতাম। এখানে ভর্তি না হলে এ সেন্টারের বেহাল অবস্থাটা বুঝতে পারতাম না। তাই এ সেন্টারের সেবার মান উন্নয়ন না হলে আমি আমার পা–টাকে স্যাক্রিফাইস করার জন্য প্রস্তুত আছি। সেন্টারে বসে আন্দোলন করছি, প্রশাসন খেপে গেলে খুব বেশি হলে ইনজেকশন দিয়ে আমাকে মেরে ফেলতে পারে। কিন্তু আমি আমার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।’

মেডিকেল সেন্টারের যে শয্যায় মহিউদ্দিন এখন থাকছেন, সেই শয্যাতেই মহিউদ্দিনের বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বড় ভাই ভর্তি ছিলেন। তাঁকে দেখে ফেরার পথে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোডে দুর্ঘটনার শিকার হন। প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়, সেখান থেকে মহিউদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টারে এখন। তিনি বলেন, ‘আমার বাবার এত পয়সা নেই যে অন্য হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেব। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার মতো আরও অনেক শিক্ষার্থী আছে, যাদের টাকাপয়সার অভাব আছে। আর মেডিকেল সেন্টারটি আমাদের চিকিৎসার জন্যই করা হয়েছে, তাহলে এ সেন্টারের এত বেহাল অবস্থা কেন থাকবে?’
মহিউদ্দিনের বাড়ি বরিশালে। বাবা কৃষিকাজ করেন। মহিউদ্দিনের এক বোন আছে।

default-image

মহিউদ্দিন বললেন, তাঁর বাবা, মা, বোন তাঁরা জানেন, তিনি পায়ে সামান্য চোট পেয়েছেন। চিন্তা করবেন বলে পায়ের অবস্থা খারাপ, তা তাঁদের জানানো হয়নি।

মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসা না পেয়ে বৃহস্পতিবার শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি, অনিয়ম এবং অব্যবস্থাপনা নিয়ে ২ মিনিট ৫৪ সেকেন্ডের একটি ভিডিও বার্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন মহিউদ্দিন। ভিডিওতে তিনি বলেন, সেন্টারে আসার পর থেকে কোনো চিকিৎসক বা পরিচর্যাকারীর দেখা মিলছে না। স্ট্রেচার, হুইলচেয়ার নেই। স্যালাইন স্ট্যান্ডই ভরসা। এখানে টয়লেটে কোনো হাই কমোড নেই। মশারির কোনো ব্যবস্থা নেই। কাঁদলে বা কাতরালেও ওয়ার্ডবয়ের দেখা মেলে না। এখানে সবাই নবাব হয়ে গেছে। এত দিন তিনি শুনেছেন, নিজে ভুক্তভোগী না হলে বুঝতে পারতেন না। এখানে প্রায় ২১ দিনের মতো থাকতে হতে পারে, তিনি সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান চেয়েছেন।

ভিডিওটি ভাইরাল হলে মেডিকেল সেন্টারের ভারপ্রাপ্ত চিফ মেডিকেল অফিসার ডা. হাফেজা জামান মহিউদ্দিনকে দেখতে গিয়েছিলেন। মহিউদ্দিনের কোন কোন জিনিস লাগবে, তা জানতে চেয়েছেন এবং বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানালেন মহিউদ্দিন। এ ছাড়া হলের প্রভোস্ট, সাধারণ শিক্ষার্থীসহ অনেকেই দেখতে আসছেন।

আজ বিকেলে হাফেজা জামান মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি ছেলেটাকে কথা দিয়েছি তার বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করব। রোববার পর্যন্ত সময় চেয়েছিলাম।

এর মধ্যে লিখিত দিতে বলেছিলাম, যাতে আমি প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলতে পারি। তবে তার আগেই সাংবাদিকদের কাছ থেকে শুনছি ছেলেটা নাকি অনশন শুরু করে দিয়েছে। আমাকে তো সময় দিতে হবে। ও যে দাবি জানিয়েছে, তা পূরণ করার ক্ষমতা তো আমার নেই, তা করবে প্রশাসন।’

মহিউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘হাফেজা জামান আপা তাঁর দিক থেকে যতটুকু করার, তা আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি ছাড়াও আমার দাবিগুলো প্রশাসনের বিভিন্নজনের কাছে।’

মহিউদ্দিনের ছয় দফা দাবির মধ্যে আছে মেডিকেল সেন্টারের এন্ট্রি পয়েন্ট বা ঢোকার মুখে ইনফরমেশন বা তথ্য ডেস্ক স্থাপন, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক লিফট, র‍্যাম্প, হুইলচেয়ার ও অন্যান্য সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা, মেয়েশিক্ষার্থীদের অন্তর্বর্তীকালীন শারীরিক সমস্যার সব চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় টিকা প্রদান করা।

প্রয়োজনীয় আধুনিক চিকিৎসাসামগ্রী ও ওষুধ প্রদান এবং প্রয়োজনীয় ইকুইপমেন্ট বা মেশিন স্থাপন, মেডিকেল সেন্টারে নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার দেওয়া ও ক্যানটিন স্থাপন নিশ্চিত করার পাশাপাশি হাই কমোড, তথা হাইলি ডেকোরেটেড স্যানিটেশন সিস্টেমে টয়লেট, বাথরুম তৈরি করতে হবে বলেও দাবিতে উল্লেখ করেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের জন্য সপ্তাহে ৭ দিন ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে মেডিকেল সেন্টারটি। মহিউদ্দিন তাঁর ফেসবুকে লিখেছেন—এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স ১০০ বছর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মেডিকেল ফি জমা না দিয়ে পরীক্ষার হলে বসতে পারে না, পরীক্ষা দিতে পারে না।... ১০০ বছর পরেও কিছুই নেই, আমাদের কিছু করার নেই, এই কথাগুলো কেন শুনব আমরা?

মেডিকেল সেন্টারের চিফ মেডিকেল অফিসার ডা. হাফেজা জামান বলেন,‘সেন্টারটির আধুনিকায়ন হলে তো আমাদেরই ভালো। এখানে চিকিৎসকেরা বসার জায়গা পান না।

পুরোনো ভবন, ঝুরঝুর করে বিভিন্ন জায়গার আস্তরণ খসে পড়ছে। বাউন্ডারি দেয়াল নেই। নিরাপত্তা নেই বলে ওয়ার্ডে হুইলচেয়ারসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম রাখলে চুরি হয়ে যায়। মেডিকেল সেন্টারটিতে মূলত আউটডোরে রোগী দেখে রোগীকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

কোনো শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসকেরা সেখানে গিয়ে সেবা দিয়ে আসেন। জলবসন্ত, করোনা, ডেঙ্গু এ ধরনের অসুখে আইসোলেশনে থাকার জন্য শিক্ষার্থীরা এখানে আসেন। তাঁরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধীনে ভর্তি হলেও এখানে থাকেন।’

মেডিকেল সেন্টারটিতে কর্মরতরা জানালেন, এখানে রোগীদের জন্য ২২টি শয্যা আছে, এর মধ্যে ৪টি মেয়েদের। আগে শুধু জলবসন্তের জন্য শিক্ষার্থীরা আইসোলেশনে থাকার জন্য আসতেন। তবে এবার করোনা, ডেঙ্গুর সময়ও শিক্ষার্থীদের এখানে রাখা হয়েছে। বর্তমানে দুর্ঘটনায় আহতসহ বিভিন্ন অসুখেও শিক্ষার্থীরা সেন্টারে আসছেন।

গত ডিসেম্বর মাস থেকে দায়িত্ব পালন করা চিফ মেডিকেল অফিসার ডা. হাফেজা জামান বললেন, ‘মেডিকেল সেন্টারের সীমাবদ্ধতা তো আছেই। প্রশাসনকে সমস্যার কথা জানানোও হচ্ছে। জনবল বা বাজেট যা আছে, তাই দিয়ে চালিয়ে নিতে হচ্ছে। কেউ সেন্টারে থাকার জন্য এলে তার চাহিদামতো হুইলচেয়ার বা অন্যান্য জিনিস পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ওই শিক্ষার্থী যাওয়ার সময় ওই সব জিনিস বুঝিয়ে দিয়ে যায়।

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন