• গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর ইয়াবা ব্যবসায়ী আখ্যা দিয়ে আলমগীর হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

  • ১৫ জানুয়ারি উত্তরা পশ্চিম থানার ওসিসহ চারজনের বিরুদ্ধে হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে মামলা করেন আলো বেগম।

default-image

ঢাকার উত্তরা পশ্চিম থানা হেফাজত থেকে কারাগারে যাওয়ার এক দিন পরেই (গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর) ভাসমান ব্যবসায়ী আলমগীর হোসেনের (৪০) মৃত্যু হয়। পুলিশের করা সুরতহাল প্রতিবেদনে নির্যাতনের চিহ্ন থাকার কথা বলা হয়েছিল। সেই প্রতিবেদনের সূত্র ধরে চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি উত্তরা পশ্চিম থানার ওসিসহ চারজনের বিরুদ্ধে হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে আদালতে মামলা করেন আলমগীরের স্ত্রী আলো বেগম। পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে করা মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব আবার পুলিশকেই দেওয়া হয়। এর মধ্যেই ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনও চলে আসে। সেখানে অবশ্য নির্যাতনের কোনো চিহ্নের উল্লেখ নেই। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে মৃত্যুর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে ‘হার্ট অ্যাটাক’।

সম্প্রতি অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের অব্যাহতি দিয়ে মহানগর দায়রা জজ আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পুলিশের সেই কমিটি। পুলিশের পেশ করা প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন আলো বেগম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গ্রেপ্তারের পরদিন গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর সকালে উত্তরা পশ্চিম থানায় যান আলো বেগম। অনেক চেষ্টার পর স্বামী আলমগীরের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পান। নির্যাতনে তখন আলমগীরের এমন অবস্থা যে গারদের লোহার শিক ধরেও দাঁড়াতে পারেননি। রাতভর তাঁর ওপর নির্যাতন চালানো হয় বলে তিনি স্ত্রীকে জানান।

পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইনে ২১টি মামলা হয়েছে। তার মধ্যে একটিমাত্র মামলায় অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যের সাজা হয়েছে। এ মামলায় আলো বেগমকে আইনি সহযোগিতা দিচ্ছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। আসকের জ্যেষ্ঠ উপপরিচালক নীনা গোস্বামী বলেন, তাঁরা আদালতে পুলিশের প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দিয়েছেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইনে ২১টি মামলা হয়েছে। তার মধ্যে একটিমাত্র মামলায় অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যের সাজা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন

আঁধারে ঢাকছে আলোর জীবন

এক বছর আগেও স্বামী আলমগীর ও দুই মেয়েকে নিয়ে ঢাকার উত্তরায় আলো বেগমের সংসার ভালোই চলছিল। স্বামী বায়িং হাউসের গাড়ি চালানোর পাশাপাশি ভ্যানে করে গার্মেন্টসের টি-শার্ট ও প্যান্ট বিক্রির ব্যবসা শুরু করছিলেন। একে একে চারটি ভ্যানে ব্যবসা বাড়িয়েছিলেন আলমগীর। ভ্যানগুলো উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরে বসত। গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর রাতে ‘শান্ত’ নামে এক ব্যক্তির উপর্যুপরি ফোনে বাসা থেকে বেরিয়ে যান তিনি। আর ফেরেননি।

স্বামীর মৃত্যুর পর আর ঢাকায় থাকতে পারেননি আলো বেগম। দুই মেয়েকে নিয়ে কীভাবে চলবেন, স্বামীর মৃত্যুর বিচার চেয়ে করা মামলাটিই-বা চালাবেন কী করে, তা নিয়ে নানা শঙ্কায় ডুবে থাকেন তিনি।

মহানগর দায়রা জজ আদালতে নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইনে দায়ের হওয়া মামলায় আলো বেগম বলেছেন, উত্তরা পশ্চিম থানার পুলিশ তাঁর স্বামীর কাছে ৫ লাখ টাকা দাবি করেছিলেন। ওই টাকা দিতে না পারায় ১৬ ডিসেম্বর রাতে পুলিশ ইয়াবা ব্যবসায়ী আখ্যা দিয়ে আলমগীর হোসেনকে গ্রেপ্তার করে। থানাহাজতের মারধরে একরকম পঙ্গু হয়ে গিয়েছিলেন আলমগীর। ১৯ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়।

স্বামীর মৃত্যুর পর আর ঢাকায় থাকতে পারেননি আলো বেগম। দুই মেয়েকে নিয়ে কীভাবে চলবেন, স্বামীর মৃত্যুর বিচার চেয়ে করা মামলাটিই-বা চালাবেন কী করে, তা নিয়ে নানা শঙ্কায় ডুবে থাকেন তিনি।

সুরতহালের নির্যাতনের দাগ নেই ময়নাতদন্তে

আলমগীরের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক মো. কামাল উদ্দিন ও মো. রিয়েল হোসেন। গত বছরের ২০ ডিসেম্বর তাঁরা যখন সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন, তখন উপস্থিত ছিলেন ম্যাজিস্ট্রেট কোহিনূর আক্তার। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে আলমগীর হোসেনের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, আলমগীরের বাঁ হাতের কনুই ও পিঠে লাল দাগ, পায়ে ফোসকা, শরীরের পেছনের দিকে সাড়ে ৫ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের আঘাতের কালো দাগ ছিল।

সুরতহাল প্রতিবেদনে নির্যাতনের চিহ্ন দেখে আলো বেগম মামলায় উত্তরা পশ্চিম থানার এসআই মো. মিজানুর রহমান, এএসআই নাজমুল হোসেন, এএসআই সোহাগ মিয়া ও উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি তপন চন্দ্র সাহাকে আসামি করে মামলা করেন।

তবে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান সোহেল মাহমুদ ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে আলমগীরের মৃত্যু হয় বলে উল্লেখ করেন।

বিজ্ঞাপন

আলো বেগমের মামলার পর আদালতের নির্দেশে চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি ঘটনার তদন্ত শুরু করেন ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা উত্তর বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) বদরুজ্জামান। তিনি গত ২১ নভেম্বর প্রথম আলোকে বলেন, উত্তরা পশ্চিম থানার পুলিশ সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় আলমগীর হোসেনকে প্রিজন ভ্যানে তুলে দেয়। স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষ আলমগীরকে ভেতরে ঢোকায়। সাক্ষ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করে তাঁরা নিশ্চিত হয়েছেন আলমগীরের ওপর কোনো নির্যাতন হয়নি।

ফেসবুক মেসেঞ্জারে আলমগীরের ভায়রা সোহেল রেজার সঙ্গে আলমগীরের সহবন্দী সিরাজুলের কথোপকথন হয় গত ২৪ ডিসেম্বর। মেসেঞ্জার কথোপকথনে সিরাজুল জানান, আলমগীরকে বেঁধে দোতলা থেকে চারতলায় চারবার তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। তারপর মিজান, নাজমুল ও সোহাগ মিলে নির্যাতন করেন।

তবে পুলিশ সিরাজুলের বিষয়টি খতিয়ে দেখেনি। এডিসি বদরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, মেসেঞ্জারের কথোপকথন খতিয়ে দেখেননি তিনি। তিনি কাগজপত্রের ভিত্তিতে প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেছেন। তার ভিত্তিতেই তিনি চার পুলিশ সদস্যকে অব্যাহতি দিয়েছেন। কারাগারে আলমগীরের ওপর নির্যাতন হয়েছিল কি না, তিনি জানেন না।

সে সময় কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ডেপুটি জেলার হিসেবে কর্মরত ছিলেন আল মামুন খান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কারাগারে বন্দী নির্যাতনের কোনো সুযোগই নেই।

মন্তব্য করুন