default-image

বিভাগীর শহর, জেলা শহর ও উপজেলা সদর মিলে সারা দেশে পাঁচ শর বেশি নগরকেন্দ্র রয়েছে। দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৩৭ শতাংশ মানুষের বাস এসব নগরকেন্দ্রে। সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা শুধু ঢাকা, চট্টগ্রাম বা বড় শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা ঠিক হবে না। নগরকেন্দ্রগুলোকে নিয়ে সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, উন্নয়ন পরিকল্পনায় আঞ্চলিক বৈষম্য করা যাবে না। এভাবে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে নিরাপদ ও টেকসই নগরব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

‘নিরাপদ ও টেকসই নগর: অগ্রগতি এবং বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকের আলোচনায় এই পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। গতকাল শনিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারের প্রথম আলো কার্যালয়ে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম আলো ও সেভ দ্য চিলড্রেন যৌথভাবে এই বৈঠকের আয়োজন করে। বৈঠক সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম।

বৈঠকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, সবার জন্য নিরাপদ ঢাকা গড়তে প্রত্যেককে আলাদাভাবে দায়িত্ব নিতে হবে। এই শহরে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৪৯ হাজার মানুষ বাস করে। তাই এখানে চ্যালেঞ্জ অনেক, সমস্যারও শেষ নেই। এটাই বাস্তবতা।

বিজিএমইএর সাবেক সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসা ডিএনসিসির মেয়র বলেন, বিজিএমইএর ভবনের জায়গা যদি উদ্ধার করা সম্ভব হয়, তাহলে অন্যান্য উন্মুক্ত জায়গাও উদ্ধার করা সম্ভব। শহরে ১৪৪টি প্রাতিষ্ঠানিক মাঠ আছে। এগুলোতে বাচ্চাদের খেলাধুলার ব্যবস্থা করতে হবে।

ঢাকার মূল সমস্যা তিনটি

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) এম খালিদ মাহমুদ বলেন, ঢাকার সমস্যা মূলত তিনটি—ভূমিকম্প, জলাবদ্ধতা ও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি। অনেক আগে ৭২ হাজার ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের একটা তালিকা করা হয়েছিল। এগুলোর মধ্যে ৩২৬টি ভবন মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু এগুলোর কোনোটিই এখন পর্যন্ত ভাঙা হয়নি।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) ভাইস প্রেসিডেন্ট আক্তার মাহমুদ বলেন, একটি শহর কতখানি নিরাপদ, তা বোঝা যায় সেই শহর কতটা নারী-শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীবান্ধব। ঢাকাকে এখনো সেই জায়গায় নেওয়া যায়নি।

উন্নয়ন পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাবে ‘জনসংখ্যা’

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের যুগ্ম প্রধান মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ঢাকায় বর্তমানে ২ কোটির বেশি মানুষের বাস। ২০২৫ সাল নাগাদ এই সংখ্যা ২ কোটি ৪০ লাখে দাঁড়াবে। আর ২০৩৫ সালে এই সংখ্যা হবে ৩ কোটি ১০ লাখ। তাই যেকোনো ধরনের পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। সেভ দ্য চিলড্রেনের উপপরিচালক সৈয়দ মতিউল আহসান বলেন, দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৪৫ শতাংশ শিশু। তাই যখন টেকসই উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে, তখন শিশুদের ব্যাপারে কী ভাবনা, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।

নানা অজুহাতে উন্মুক্ত স্থান, পার্ক-মাঠ দখল করা হয় বলে মন্তব্য করেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সাবেক চেয়ারম্যান মো. শহীদ আলম।

‘সকলের নয়, সবলের’

পরিবেশ আন্দোলনের কর্মী ও স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, ঢাকা সকলের জন্য নয়। সবলের জন্য। এই নগরে দুর্বলের কোনো জায়গাই নেই। বিভিন্ন জরিপে তথ্যবিভ্রাটের মাধ্যমে দুর্বলদের (বস্তিবাসী) বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। সমতার ভিত্তিতে এই শহর পুনর্গঠন করা না হলে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জিত হবে না।

টেকসই উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম। এক জরিপের তথ্য উল্লেখ করে ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (ড্যাপ) প্রকল্প পরিচালক আশরাফুল ইসলাম বলেন, ঢাকার ৮৪ শতাংশ মানুষের আয় ২০ হাজার টাকার নিচে। এঁরা গাড়িতে নয়, বেশির ভাগ সময় হেঁটে চলাচল করেন। তাঁদের হাঁটার ভালো ব্যবস্থা নগরে নেই। ঢাকার ওপর চাপ কমাতে ঢাকার চারপাশের ১৮টি শহরের সঙ্গে যুক্ততা তৈরি করার বিষয়ে পরামর্শ দেন নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিচালক খুরশীদ জাবিন হোসেন তৌফিক।

বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন ইউএনডিপির পভার্টি অ্যান্ড অর্গানাইজেশন বিভাগের প্রধান আশেকুর রহমান, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের ডিরেক্টর (প্রোগ্রাম, পলিসি অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি) মোহাম্মদ নূরুল আলম, সেভ দ্য চিলড্রেনের হিউম্যানিটারিয়ান ডিরেক্টর মো. মোস্তাক হোসেন, ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রকল্প বিশেষজ্ঞ (শহর) শামীমা সিদ্দিকী, অক্সফাম ইন বাংলাদেশের ব্যবস্থাপক (ইকোনমিক জাস্টিস অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স) খালিদ হোসেন ও ডিএনসিসির আরবান রেজিলিয়েন্স প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক তারিক বিন ইউসুফ। 

পরিকল্পিত নগরায়ণের জন্য ইউএনডিপির পভার্টি অ্যান্ড অর্গানাইজেশন বিভাগের প্রধান আশেকুর রহমান স্থানীয় সরকারের আর্থিক ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন। ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের ডিরেক্টর (প্রোগ্রাম, পলিসি অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি) মোহাম্মদ নূরুল আলম পরিবেশবান্ধব নির্মাণ উপকরণ তৈরি ও তার ব্যবহার বাড়াতে সরকারের পক্ষ থেকে ভর্তুকি দেওয়ার পরামর্শ দেন। সেভ দ্য চিলড্রেনের হিউম্যানিটারিয়ান ডিরেক্টর মো. মোস্তাক হোসেনের বক্তব্যে নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার প্রসঙ্গ উঠে আসে। ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রকল্প বিশেষজ্ঞ (শহর) শামীমা সিদ্দিকী মনে করেন, এই সমন্বয়হীনতার কারণেই সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নগরের মা ও শিশুদের জন্য নানা ধরনের কাজ করা হলেও তার ফলাফল টেকসই হচ্ছে না। অক্সফাম ইন বাংলাদেশের ব্যবস্থাপক (ইকোনমিক জাস্টিস অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স) খালিদ হোসেন বলেন, নগর ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক পরিবর্তনের জন্য নাগরিকের আচরণগত পরিবর্তন আনাটা জরুরি। ডিএনসিসির আরবান রেজিলিয়েন্স প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক তারিক বিন ইউসুফ নতুন নকশায় ঢেলে সাজানো পার্ক ও মাঠগুলোর ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ডিএনসিসির পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের সংযুক্ত করার পরামর্শ দেন। 

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন