রাজধানীর হাইকোর্ট এলাকায় সুপ্রিম কোর্ট মাজার ও মসজিদ কমপ্লেক্সে আজ শনিবার সন্ধ্যায় দেখা গেলে সম্প্রীতির এমনই উদাহরণ। সামাজিক ও আর্থিক অবস্থান, শ্রেণি–পেশার ভেদাভেদ ভুলে এখানে প্রতিদিনই ইফতার করে থাকেন হাজারো মানুষ।

যুগের পর যুগ ধরে সম্প্রীতির বন্ধনে বাঁধা এমন ইফতারের আয়োজন প্রসঙ্গে কথা হয় মসজিদের ইমাম আহমেদ রেজা ফারুকীর সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মসজিদ শুধু প্রার্থনার জায়গা নয়। মসজিদে ইফতারের এমন উদ্যোগ মূলত ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের সেতু এবং সাম্য বজায় রাখার একটা উদাহরণ। এখান থেকে মানুষ ভ্রাতৃত্ব ও সাম্যের ভিত্তিতে গড়া ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা পায়।

মসজিদ কমিটি জানায়, এখানে ইফতারের প্রস্তুতি শুরু হয় বেলা তিনটার পর থেকে। আসরের নামাজ শেষে দোয়া হয়; কখনো থাকে সংক্ষিপ্ত জিকিরের আয়োজন। এসব শেষে সবাই ইফতারের জন্য বসে যান সুশৃঙ্খল ও সারিবদ্ধভাবে। প্রতিদিন ১ হাজার ২০০ মানুষের ইফতারের আয়োজন থাকে। স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন ৪০ জন। তবে শুক্রবার ও বৃহস্পতিবার মানুষের সংখ্যা দেড় হাজার ছাড়িয়ে যায়। দৈনিক খরচ পড়ে গড়ে ২৫ হাজার টাকা। তবে অনেক ভক্তও এখানে বিভিন্ন ইফতারসামগ্রী দিয়ে থাকেন।

তেমনই দুজন মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা জালাল উদ্দিন ও মুনির হাসান। এই দুই ভাই এসেছেন ৩ কেজি খেজুর ও ২০ কেজি মুড়ি দিতে এবং ইফতার করতে। এক ভাই ৪০ বছর বয়সী জালাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই রোজার মাসে আমরা তিন ভাই এখানে আসি ইফতার করতে। আরেক ভাই ঢাকার বাইরে। তাই এবার আসতে পারেনি। এখানে বসে সবার সঙ্গে ইফতার করতে অন্য রকম তৃপ্তি লাগে।’

হাইকোর্ট মাজার প্রাঙ্গণে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের জন্যও ইফতারের বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিদিন দুই থেকে তিন শ নারী ইফতারে অংশ নেন। মাজার কমিটির সদস্যরা জানান, ২০২০ সালে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের পর নারী-পুরুষের অংশগ্রহণ কমে আসে। গত বছরও কম ছিল। তবে এবারের ইফতারের আয়োজন আগের মতোই।
ইফতারে দেওয়া হয় ছোলা, বুট, মুড়িসহ ইফতারির নানা পদ। পাশাপাশি থাকে তরমুজ, বাঙ্গি, আনারসসহ বিভিন্ন ফল। থাকে খিচুড়ি, বিরিয়ানিসহ ভারী খাবারও।

এদিকে মসজিদের ভেতরের এ আয়োজনের পাশাপাশি মসজিদ–সংলগ্ন কড়ইগাছতলায় চলে আরেক দলের ইফতারি বিতরণ। মূলত মাজারের ভক্তদের দান ও স্বেচ্ছা উদ্যোগে হয় এ আয়োজন। এখানে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন ১৫ জন। এ উদ্যোগের প্রধান খাদেম মো. শফিক বলেন, প্রতিদিন এখানে ৪০০ থেকে ৫০০ মানুষের ইফতারের আয়োজন করা হয়। আজ ছিল ৩৭৫ জনের আয়োজন।

কড়াইতলার এই ইফতার আয়োজনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের একজন গুলশানের বাসিন্দা আবু হান্নান। পেশায় তৈরি পোশাকশিল্পের ব্যবসায়ী বলে জানালেন তিনি। ৩৬ বছর ধরে এই মাজারে আসেন। সবচেয়ে বেশি যাতায়াত করেন রোজার মাসে। প্রথম আলোকে বলেন, ‘বছরজুড়ে এখানে নানা অনুষ্ঠান থাকে। তখনো আসি। আর রোজায় প্রতি সপ্তাহে অন্তত দুই দিন আসি।’

হাইকোর্টের স্টাফ মো. শাহজাহান প্রায়ই ইফতার করতে মাজার মসজিদে আসেন। ইফতার করে নামাজ শেষে বাসায় ফেরেন। বলেন, ‘এখানে খাবারের কোনো অভাব নেই। প্রায়ই এখানে ইফতার করি সবার সঙ্গে। মন-দিল-আত্মায় শান্তি লাগে।’

ইফতার শেষে মসজিদের গেটে কথা হয় রংপুরের বদরগঞ্জের বাসিন্দা মো. বিজয়ের সঙ্গে। তিনি থাকেন রাজধানীর রামপুরায়। তিন বছর ধরে তিনি ঢাকায় রিকশা চালান।

ইফতারের আগমুহূর্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় রিকশায় যাত্রী নিয়ে এসেছিলেন। জানান, এখানে বিনা মূল্যে ইফতার দেওয়া হয়। বলেন, ‘রোজা ছিলাম। একই প্লেটে খিচুড়ি, বুট–মুড়ি খেয়েছি। পেট ভরেছে। আল্লাহর দুনিয়ায় কারও খাবারের অভাব হয় না।’

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন