অংশীজনদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে চালক–মালিকেরা মিটারে অটোরিকশা চালানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও তা কার্যকর হয়নি বলে জানিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। অনিয়ম ঠেকাতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) নিয়মিত সাতটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে থাকে বলে দাবি করছে। এরপরও অটোরিকশার ৯৮ শতাংশই চুক্তিতে চলে বলে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির তথ্যে উঠে এসেছে।

রাজধানীর কলেজগেটে জাতীয় হৃদ্‌রোগ হাসপাতালে রোগী দেখতে এসেছিলেন আশরাফুজ্জামান। সেখানে থেকে মিরপুর ১০ নম্বর যাওয়ার জন্য অটোরিকশাচালক ভাড়া চান ২৫০ টাকা। শেষে ২০০ টাকায় যেতে রাজি হন চালক। অথচ সরকারনির্ধারিত হিসাবে ২৫ মিনিট যানজটসহ এই দূরত্বের ভাড়া আসে ১২০ টাকা।

আশরাফুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, একসময় অটোরিকশাচালকেরা মিটারে যা ভাড়া আসত, তার চেয়ে ২০ টাকা বেশি চাইতেন। কিন্তু এখন আর কেউ মিটারের কথা বলেন না। নিজেদের মতো একটা ভাড়া চান। মিটারে গেলে হয়তো এর অর্ধেকের কাছাকাছি খরচ হতো। এখন আর এসব নিয়ে কেউ কথা বলে না।

রাজধানী ঢাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার বর্তমান ভাড়ার হার ২০১৫ সালের ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর হয়। বর্তমান ভাড়া অনুযায়ী অটোরিকশার প্রথম ২ কিলোমিটারের ভাড়া ৪০ টাকা। পরবর্তী প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ১২ টাকা করে। প্রতি এক মিনিট অপেক্ষার (যাত্রাবিরতি, যানজট ও সিগন্যাল) জন্য ২ টাকা। আর মালিকের জমা ৯০০ টাকা।

কয়েকজন চালক অভিযোগ করেন, সরকারনির্ধারিত অটোরিকশার জমা ৯০০ টাকা। কিন্তু মালিক ১ হাজার টাকা আবার অনেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত জমা নেন। সকাল নয়টায় একটি অটোরিকশা নিয়ে বের হলে জমা তুলতে বিকেল চারটা থেকে পাঁচটা বেজে যায়। তার ওপর গ্যাস ও দিনের খাবার খরচ আছে। এসবের পর একজন চালকের নিজের জন্য টাকা থাকে খুব সামান্য।

অটোরিকশাচালক শরিফুদ্দিন বলেন, দিনের একটা বড় সময় চলে যায় যানজটে। জিনিসপত্রের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। গ্যাস খরচ আছে। মিটারে চালালে দিন শেষে ২০০ থেকে ৩০০ টাকার বেশি থাকে না। বাধ্য হয়েই চুক্তিতে চালাতে হয়।

রাজধানীর সড়কে অবাধে ভাড়ায় চলছে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের জন্য নিবন্ধিত ‘প্রাইভেট’ অটোরিকশা। এসব অটোরিকশার ভাড়ায় চলার রুট পারমিট ও মিটার নেই। মালিক সমিতিসহ বিভিন্ন সূত্রের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকায় প্রায় পাঁচ হাজার প্রাইভেট অটোরিকশা ভাড়ায় চলাচল করে।

২০১৮ সালে ঢাকা সড়ক পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, প্রাইভেট নিবন্ধিত অটোরিকশা ভাড়ায় চলাচল করতে পারবে না এবং ভাড়ায় চললে তা আটক করতে হবে। কিন্তু সিদ্ধান্তটি মাঠপর্যায়ে কার্যকর হয়নি।

গত শনি ও রোববার মিরপুর ১ নম্বর, টেকনিক্যাল মোড়, কল্যাণপুর, শ্যামলী, ফার্মগেট এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ‘প্রাইভেট’ লেখা অসংখ্য ছাইরঙা সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়ায় চলছে। যাত্রীদের গন্তব্য শুনে চালক পছন্দমতো ভাড়া হাঁকছেন। দরদাম করে ভাড়ায় পোষালে যাত্রীরা গন্তব্যে যাচ্ছেন।

প্রাইভেট অটোরিকশার চালক জসীম মিয়া বলেন, ‘ঢাকায় এখন প্রাইভেট কি আর বাণিজ্যিক কি—সব অটোই ভাড়ায় চলে। প্রাইভেট অটোরিকশা ভাড়ায় চলে, এটা সবাই জানে। ট্রাফিক পুলিশদের ম্যানেজ করেই প্রাইভেট অটো চলে। ভেতরে মালিক আছে নাকি যাত্রী, কেউ তাকায়ও না।’

ট্রাফিক পুলিশের বিরুদ্ধে চালকদের অভিযোগ প্রসঙ্গে সৈয়দ নুরুল ইসলাম বলেন, এগুলো ঢালাও অভিযোগ। অটোরিকশাগুলো সড়কে চলার সময় চালকের লাইসেন্স আছে কি না, অন্য কোনো ত্রুটি আছে কি না, এগুলো দেখে থাকেন ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা।

ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ট্রাফিক-দক্ষিণ) সৈয়দ নুরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, মিটারে অটোরিকশা চলার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে। চালক–মালিকেরা প্রতিশ্রুতি দেন মিটারে চালাবেন। কিন্তু অনিয়ম থেকেই যাচ্ছে। কোনো যাত্রী অটোরিকশার নম্বর উল্লেখ করে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করলে পুলিশের পক্ষে ব্যবস্থা নিতে সুবিধা হয়।

অটোরিকশার মিটারে চলাচল না করা ও অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া বন্ধে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তৎপরতা চোখে পড়ে না। এ বিষয়ে বিআরটিএ পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) মোহাম্মদ খুরশীদ আলম প্রথম আলোকে বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত বিআরটিএর সাতটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব অভিযানে অটোরিকশার মিটারে না চলা, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধকে গুরুত্ব দিতে নির্দেশনা দেওয়া আছে।

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরীতে চলাচলরত অটোরিকশার ৯৮ শতাংশই চুক্তিতে চলে। এ বিষয়ে যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, এখন রাজধানীর শতভাগ অটোরিকশা চুক্তিতে চলে। জনগণের টাকায় চলা বিআরটিএ যাত্রীদের স্বার্থ না দেখে মালিক-চালকদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে। জনগণের ভোগান্তি ও পরিবহন খাতের নৈরাজ্য বন্ধে সরকারের সদিচ্ছারও অভাব রয়েছে।

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন