করোনাকালের জীবনগাথা

করোনাকাল ও আত্মশুদ্ধি

বিজ্ঞাপন
>করোনাভাইরাস পাল্টে দিয়েছে আমাদের জীবনের বাস্তবতা। দেশ-বিদেশের পাঠকেরা এখানে লিখছেন তাঁদের এ সময়ের আনন্দ-বেদনাভরা দিনযাপনের মানবিক কাহিনি। আপনিও লিখুন। পাঠকের আরও লেখা দেখুন প্রথম আলো অনলাইনে। লেখা পাঠানোর ঠিকানা: dp@prothomalo.com

আমি একজন কর্মজীবী নারী। পেশা আমার শিক্ষকতা। অভিজ্ঞতা বছর তিরিশের। ঢাকা থেকে বেশ দূরে আমার কর্মক্ষেত্র। তাই সাংসারিক জীবন আর পেশাগত কাজ নিয়ে অনেক ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। আগে বাড়ি থেকে কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার ব্যবস্থা ভালো ছিল না বিধায় প্রায়ই বিড়ম্বনায় পড়তে হতো। এখন অতটা না। যাতায়াত ব্যবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। তবে পাশাপাশি গাড়ির সংখ্যাও অনেক বেড়ে গেছে। সে সুবাদে যানজটও। তাই যাতায়াত বিড়ম্বনা অনেকাংশে সে রকমই রয়ে গেছে। বিড়ম্বনালব্ধ লম্বা সময়ের অপচয় তখনো ছিল; আজও আছে। বিক্ষুব্ধ মনটা সে কারণে প্রায়ই একটু অবসর খুঁজত। ভাবতাম একটু অবসর যদি মিলত!!

এখন করোনাকাল চলছে। সবার মতো আমিও গৃহবন্দী। ইতিমধ্যে এক লম্বা সময় পার হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত জানি না জীবন স্বাভাবিক কবে হবে। অলস হচ্ছে জীবন; শ্লথ হচ্ছে কাজের গতি। এত দিন সময়ের অভাবে যা করতে পারিনি, এখন তা করতে পারছি; প্রকৃতি আর জীবনকে বিশ্লেষণ করছি। দৃষ্টি এখন অনেক গভীরে; জীবন নামের স্মৃতিময় আঁধারটার কোনায় কোনায় হাতড়িয়ে বেড়ায় ফেলে আসা দিনগুলোকে। আগে একটা সময় গেছে, বুকের মধ্যে কেবলই পালাই পালাই ভাব হতো। ঢাকা ছাড়ার প্রবল ইচ্ছা পাগল করে তুলত। ছুটে যেতে চাইতাম কোলাহলমুক্ত গ্রামীণ পরিবেশে। ইচ্ছাটা বেশি তীব্র হতো যখন নাতনিটাও গ্রামে যাওয়ার বায়না ধরত। ও নদীর পাড়ে যেতে চায়। গরুর শরীর ছুঁতে চায়। ছাগলকে খাওয়াবে বলে দুটো কাঁঠাল পাতা নিয়ে ছাগলের পেছনে পেছনে দৌড়াতে চায়। পারিনি। পারতাম না। মনের ভেতর অনেক অনেক কষ্ট হতো। নিজের জন্য, ওর জন্য। ভাবতাম, কিসের ঢাকা। এখানে কিছু নেই। ঢাকা যান্ত্রিকতায় ভরা ভালোবাসাহীন একটা শহর; সময়ের সঙ্গে শুধু দৌড়াও আর দৌড়াও। দম নেওয়ারও যেন ফুরসত নেই।

এখন সময় পাল্টে গেছে। করনাকালের পাঁচটা মাস পেরিয়ে গেছে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এখন আর চলতে হয় না। জীবন যেন পেছনের দিকে হাঁটছে। এবার আমারও যেন ফিরে তাকানোর সময় এসেছে। আমার ঢাকা তো প্রাণহীন নয়। সে তো অনিন্দ্যসুন্দর, শহর-গ্রামের এক অপূর্ব মিশেল, চোখ মেলে শুধু দেখার পালা।

আমার থাকা হয় ঢাকার এক অভিজাত এলাকায়। জায়গাটা ভরে আছে আম, জাম, কাঁঠাল, সুপারিগাছে। আর তাতেই হরেক রকমের পাখপাখালির আনাগোনা। আগে ঘুম ভাঙত গাড়ির শব্দে। এখন ঘুম ভাঙে পাখির কলকাকলিতে। এখন আমার নাতনি চেনে কোনটা বুলবুলি, কোনটা শালিক, কোনটা দোয়েল আর কোনটা চড়ুই; বুঝতে পারে কাক আর চিলের পার্থক্য। আমি খুশি হই। চিড়িয়াখানায় না গিয়ে ঘরে বসেই ও জানছে কোনটা কী পাখি—এটাই তো হওয়া উচিত।

এখন প্রায়ই বৃষ্টি হয়। কিছুদিন আগেও আমার জন্য বৃষ্টি বিরাট এক বিড়ম্বনা ছিল। এখন উপভোগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, বৃষ্টিতে পাশের বাড়ির ছাদে পানি জমে। চড়ুই পাখির দল ওই পানিতে গা ভেজায়, আসর জমায়। স্বল্প পানিতে গা মোটেও ভেজে না। কিন্তু পাখির দলের ভাব-ই আলাদা। কিচিরমিচির শব্দে হুলুস্থুল চারদিক। মনে হয় তারা বিশাল কাণ্ড করল। প্রচণ্ড হাসি পায়। পাশাপাশি আমারও ইচ্ছা হয় ওদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার, বৃষ্টিতে ভেজার। কিন্তু সামাজিক কারণে তা আর হয় না। তার ওপর করোনাকাল। ঠান্ডা লাগলে বিপদ হতে পারে। তার ওপর আমার ডায়াবেটিস আছে। হার্টও খারাপ। সাবধানী হই। বৃষ্টিতে ভেজার ইচ্ছা বরাবরের মতো লুকিয়ে রাখি।

আমি আগে কখনোই গাছে ঝুলন্ত অবস্থায় পাকা আম দেখিনি। এবার দেখলাম। পাশের বাড়ি, সামনের বাড়ি সবখানে আম গাছ। আর যেহেতু এখন করোনাকাল, এলাকার দুষ্ট ছেলেদের আনাগোনা একেবারেই নেই। তাই সবখানে গাছভর্তি পাকা আম চোখে পড়ার মতো। পড়ন্ত বিকেলে সোনালি রোদ পাকা আমের ওপর পড়ে, সেই সঙ্গে সবুজ পাতা বাতাসে দুলে সবুজ-হলুদের মিশেলে তৈরি হয় রঙিন এক জীবন্ত ছবি। গ্রাম গ্রাম করে পাগল আমি, অথচ দেখছি সবই তো আমার হাতের নাগালে। মনের জানালার পর্দা তুললেই তো তার নাগাল পাওয়া যায়। আফসোস, এত দিন কেন চোখ মেলে তাকাইনি, দৃষ্টি দিয়ে ঢাকাকে খুঁজিনি ।

আসলে ঢাকাকে দেখার অবকাশই পাইনি। করোনাকে ধন্যবাদ, প্রকৃতিকে জানতে এবং চিনিয়ে দেওয়ার জন্য। আগে পড়ন্ত বিকেলে কাজ শেষে ঘরে ফিরে আসতাম। ক্লান্ত লাগত। এখন ছাদে যাই। প্রকৃতিকে দেখি। আকাশে সাদা সাদা মেঘ বাতাসের সঙ্গে মিতালি করে হালকা আমেজে কাক-চিল বুক ভরে দূষণমুক্ত বাতাস নিয়ে ডানা ছড়িয়ে মেঘের বুকে ভাসে। অলস মুহূর্তগুলো নবাবি কায়দায় কাটায়। আমি সাক্ষী হই। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। আকাশে তারা জ্বলে। হাজার হাজার তারা আকাশ ভরে তোলে, মনে হয় আকাশটা যেন এক রাজকীয় জামদানি শাড়ি। এখন তারাগুলো যেন অনেক বেশি উজ্জ্বল, অনেক বেশি স্পষ্ট। বাতাসে ধুলাবালি অনেক কমে গেছে, তাই হয়তো। তারা ঝিকমিক, করে চিকচিক—ছোটবেলার কবিতাটা মনে পড়ে। সঙ্গে মনে পড়ে গ্রামের কথাও। ওখানের আকাশটাও এমন, তারাগুলোও এমন। ঝকমকে চকচকে।

সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়। নিঝুম চারপাশ। রাস্তাঘাট জনশূন্য। এখন হর্নের শব্দ আর শোনা যায় না। কিছু বখে যাওয়া ছেলের তীব্র গতিতে মোটরসাইকেল চালানোর উৎকট শব্দও নেই। চারিদিক সুনসান, নীরব। মাঝেমধ্যে রিকশার টুং টাং শব্দে প্রকৃতির নীরবতা ভাঙে। এখন ওই টুং টাং শব্দগুলো ভয়ানক মিষ্টি মনে হয়। বুকের দুপদাপ আর রিকশার টুংটাং—সব মিলে একাকার। নতুন সুর, নতুন লয়।

ঘরের বেতর আমরা চারজন। যে যার মতো খেয়ে যার যার ঘরে চলে যাই। পরের দিনের জন্য প্রস্তুতির কী দরকার আছে? না নেই। আগের দিনের পুনরাবৃত্তি হবে মাত্র। জীবন এখন থমকে গেছে। সামনে কী আছে, কী হবে ভাবছি না। করোনা আমাদের আগামীর চিন্তাগুলোকে ১৫ দিনের বেড়ি দিয়ে আটকে দিয়েছে। তাই অতীত নিয়ে চর্চা করি। আর তাতেই খুঁজে পাই আমার ঢাকাকে, আনিন্দ্য সুন্দর ঢাকাকে।

সবাই ভালো থাকবেন। ভালোবাসবেন আমার ঢাকাকে, আমাদের ঢাকাকে। ওর যত্ন নিতে হবে। ওকে বাঁচাতে হবে। ওকে দিতে হবে দূষণমুক্ত পরিবেশ। নিষ্কলুষ জলবায়ু; ওঁ বাঁচলে তবেই না আমরা বাঁচব, সুন্দরভাবে বাঁচব। আমি হয়তো থাকব না, কিন্তু বাঁচবেন আপনি, আপনারা আর আমার আগামীর প্রজন্ম।

*লেখক: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন