default-image

আষাঢ় মাসে হাঁটুসমান কাদা আর প্রায় ছয় মাস থইথই পানিতে তলিয়ে থাকা গ্রাম ছেড়ে সব সময় আমি পালাতে চেয়েছি। যে পানি-কাদার জন্য বছরের অর্ধেকটা সময় স্যান্ডেল ছাড়াই ক্লাসে যেতে হয়েছে, সেই গ্রামে আমি আটকে থাকতে চাইনি। উচ্চশিক্ষার জন্য গ্রাম ছেড়ে ঢাকা শহরে এলাম।

শুধুই কি উচ্চশিক্ষা? হয়তো না। হয়তো পড়াশোনার আড়ালে জাদুর শহরে থেকে যাওয়ার ভাবনা ছিল। আর তাই পড়াশোনার পর চাকরি পেয়ে, শহুরে মেয়েকে বিয়ে করে বসবাসও শুরু করেছি। কিন্তু এই শহর কি আপন হয়েছে আমার?

করোনাভাইরাসের এই মহামারির সময়ে এসে তা আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছে আমাকে, হয়তো অনেককেই। যদি আপনই হবে এই শহর, তাহলে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত এই আমি গভীর রাতে কাতর কণ্ঠে কেন বউয়ের কাছে আবদার করব, আমাকে ওই কবিতাটা শোনাবে?

‘কোনটা বলো তো?’

ওই যে, হিজলের-তমালের ছায়…বলে একটা কবিতা আছে না, ওইটা।

এরপর পরম মায়া নিয়ে সেই কবিতা শুনতে শুনতে আমি চোখ বন্ধ করে কেন হারিয়ে যাব আমার শৈশবে, নড়াইলে, আমার কুমড়ী গ্রামে। সেই রাতে জীবনানন্দ দাশের ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি’ শুনতে শুনতে কেন ফিরে যাব শিকদারবাড়ির খালপাড়ে? যেখানে খালের পানিতে সিঁদুররঙা হিজল ফুলের সর পড়ে থাকত। ভোরের দোয়েল পাখির কথা শুনে আমার কেন মনে হবে, বাড়ির পেছন দিকে ডুমুরের পাতায় বাসা বানানো সেই টুনটুনির কথা। এসব মনে করতে করতেই ঘুমিয়ে পড়লাম শেষ রাতে।

তখনই আমার মনে এল ফটিকের কথা। রবীন্দ্রনাথের সেই ফটিক, যে গ্রাম থেকে শহরে মামাবাড়ি এসেছিল লেখাপড়া শিখতে। আমার ১০৩ ডিগ্রি জ্বরে কেবলই নিজেকে ফটিক মনে হতো। মনে হতো আমাকে গ্রামে নিয়ে গেলে, খালের পাড় বা আঠালো কাদামাখা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকলেই আমি সুস্থ হয়ে যাব।

যেভাবে আক্রান্ত হলাম
১ জুন সকালেও মনে হয়নি আমার গ্রামে ফেরা দরকার। হোম অফিসের কাজ আর পরিবার নিয়ে বেশ কেটে যাচ্ছিল করোনাভাইরাসের দিনগুলো। তখন আমার স্ত্রী হুর এ জান্নাতের জ্বর। যাকে আমরা কাছের মানুষেরা জান্নাতি বলেই ডাকি। অফিসের কাজ করছিলাম আর ফাঁকে ফাঁকে জ্বরাক্রান্ত স্ত্রীর খোঁজ নিতে ঘরে ঢুঁ মারছিলাম।

একটানা চেয়ারে বসে কাজ করতে করতে দুপুর প্রায় পেরিয়ে যেতে বসেছে। চেয়ারের ওপর আসন গেড়ে বসা পা দুটোকে নিচে নামাতে গিয়েই বাধল বিপত্তি। পায়ের মাংসপেশিতে তীব্র ব্যথা। কয়েকবারের চেষ্টাতেও সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারলাম না। কোনো রকমে খাটের ওপর এলাম। সেদিন স্ত্রীর জ্বরের তৃতীয় দিন, তবে সে বেশ ঝরঝরে। সকাল থেকে শরীরের তাপমাত্রাও কম। কিন্তু বাড়তে শুরু করল আমার তাপমাত্রা। পায়ের ব্যথা বাড়তে বাড়তে পিঠ ও হাতে এসে পৌঁছাল।

সন্ধ্যার পর থেকে বাড়তে শুরু করল গায়ের তাপমাত্রা ৯৯, ১০০, ১০১…। জ্বর এলেও খুব একটা পাত্তা দিলাম না। কারণ, ঈদের এক দিন পর (২৬ মে) আমার শ্বশুরের জ্বর হয়, এরপর শাশুড়ির, তারপর আমার স্ত্রীর। সবারই তিন দিনে জ্বর ভালো হয়েছে।

আমরা পরিচিত চিকিৎসকের পরামর্শে চলছিলাম। তিনি জানান, ‘যেহেতু সবারই তিন দিনে জ্বর ভালো হয়ে যাচ্ছে, হয়তো সাধারণ ভাইরাস জ্বর হচ্ছে। চিন্তার কিছু নাই।’

তাঁর অভয়বানী মিলল না আমার বেলায়। চতুর্থ দিন জ্বর এল একই শক্তি নিয়ে। ১০৩ ডিগ্রি তাপমাত্রা কখনো ১০২ হচ্ছে, তবে এর নিচে নামছে না। শরীরে যে তীব্র ব্যথা ছিল, তা কিছুটা কমেছে, কিন্তু শুরু হয়েছে নতুন উপসর্গ শুকনা কাশি, তাও একটা–দুটো। স্ত্রীকে বললাম আলাদা ঘরে যেতে, সে যাবে না। তার একটাই যুক্তি, ‘আমারও তো জ্বর হয়েছিল, কিছু হলে দুজনেরই হয়েছে।’

পঞ্চম দিন আমার ঘুম ভাঙল খুব ভোরে। মনে হলো জ্বর কমেছে। বাথরুমে গেলাম একা একা। কমোডে বসা পর্যন্ত সব মনে আছে, এরপর একসময় আবিষ্কার করলাম আমি বাথরুমের মেঝেতে পড়ে আছি। বালতির পানি পড়ে মেঝে থেকে আমার নাকে ঢোকার পর জ্ঞান ফিরেছে। কোনো রকমে স্ত্রীকে ডাকলাম। ভেজা গা পরিষ্কার করে সে আমাকে বিছানায় নিয়ে এল।

প্রথম আলোয় ফিচার বিভাগে কাজ করি। ফোন করলাম পল্লব মোহাইমেনকে। বললাম, আমার করোনা পরীক্ষা করানো দরকার। তিনি আমাকে বললেন, ‘চিন্তা করতে হবে না, দেখছি।’ পরীক্ষার জন্য কিছু তথ্য পাঠালাম। ৮ জুন জাতীয় প্রেসক্লাবে আমার করোনা পরীক্ষার সিরিয়াল পেলাম। আরও কিছু সময় পর তিনি আমার স্ত্রীকে গ্রিনলাইফ মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক তানজিনা হোসেনের ফোন নম্বর দিলেন। বললেন, ‘যেকোনো প্রয়োজনে তাঁকে ফোন দিতে।’

তানজিনা হোসেনের পরামর্শে ৭ জুন আমরা গ্রিন লাইফ হাসপাতালে গেলাম ডেঙ্গু, নিউমোনিয়াসহ কিছু পরীক্ষা করাতে। জরুরি বিভাগে চিকিৎসক দেখিয়ে আমার বুকের এক্স–রে এবং সেসব পরীক্ষা করালাম। চিকিৎসকের পরামর্শে পরদিন বাসায় আমার শরীরে একটি স্যালাইন দেওয়া হলো।

সন্দেহ সত্যি হলো
কাশি, জ্বর আর মৃদু শরীর ব্যথা নিয়ে অষ্টম দিন (৮ জুন) গেলাম জাতীয় প্রেসক্লাবে। সাংবাদিকদের জন্য এখানে করোনা পরীক্ষার একটি বুথ করা হয়েছে প্রেসক্লাবের পক্ষে। বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক এটি পরিচালনা করছে। ঘণ্টা দেড়েক পর ঝামেলা ছাড়াই নমুনা দিয়ে বাসায় এলাম।

সন্ধ্যায় গ্রিন লাইফে করা টেস্টগুলোর রিপোর্ট হাতে পেলাম। পাঠালাম ডা. তানজিনাকে। তিনি দেখে গ্রিন লাইফ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক রাশেদুল হাসানকে দেখাতে বললেন। ১০ জুন বিকেলে গেলাম রাশেদুল হাসানের কাছে। সঙ্গে জান্নাতি। সিঁড়ি দিয়ে একতলা উঠেই আমি হাঁপিয়ে গেলাম। দম নিতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। কিছুক্ষণ জিরিয়ে চিকিৎসকের চেম্বারে গেলাম।

চিকিৎসক একজন সম্ভাব্য কোভিড রোগী দেখছেন কোনো ধরনের পিপিই ছাড়া। মুখে একটা মাস্ক আর দূরত্ব মেনে বসেছেন। আন্তরিকতার সঙ্গে তিনি দেখলেন, নতুন কিছু পরীক্ষাও দিলেন। কারণ, চিকিৎসক নিজেও ধারণা করছেন আমি কোভিড–১৯–এ আক্রান্ত হয়েছি। তাই এই পরীক্ষায় তিনি শরীরের ভেতরের সর্বশেষ ক্ষতির পরিমাণ আন্দাজ করতে চান।

চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু হলো। এত দিন শুধু প্যারাসিটামল, লেবুপানি, গরম পানির ভাপ আর কুলিকুচি করছিলাম। এবার ফেক্সো, জিংক, ভিটামিন ডি ইত্যাদি যোগ হলো। বাসায় পালস অক্সিমিটার দিয়ে দেখলাম অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৯২। এক ঘণ্টা পর ৯০ থেকে ৮৯। ফোনে তানজিনা হোসেনকে জানানো হলো। তিনি আমার স্ত্রীকে বললেন, ‘দ্রুত অক্সিজেন সুবিধা আছে এমন হাসপাতাল খোঁজো। অক্সিজেন কমে যাওয়া ভালো লক্ষণ না।’

পল্লব মোহাইমেনকে জানালাম। বাসায় আমি চিকিৎসকের পরামর্শে শ্বাস–প্রশ্বাসের ব্যায়াম করতে থাকলাম। এর মধ্যে আমার ফোনে একটা এসএমএস এল। আমার স্ত্রীর কাছে এল পল্লব মোহাইমেনের ফোন, দুটোরই এক তথ্য—আমি কোভিড–১৯ পজিটিভ, করোনায় আক্রান্ত।

প্রথম হাসপাতাল অভিজ্ঞতা
করোনাভাইরাসে আক্রান্তের খবরে আমি বা আমার স্ত্রী কেউই ভয়ে মুষড়ে পড়িনি। মানসিকভাবে আমরা প্রস্তুত ছিলাম। আমার সহকর্মী ও বন্ধুরা আমাকে চাঙা রাখতে চেষ্টা করেছে সব সময়। তবে রাত ১০টা বেজে গেলেও হাসপাতাল না পাওয়ায় বেশ চিন্তায় পড়ে গেল সবাই। এদিকে আমার অক্সিজেনপ্রবাহ (স্যাচুরেশন) কমে তখন ৮৭ থেকে ৮৮। এর মধ্যে পল্লব মোহাইমেনের ফোন। জান্নাতিকে বললেন, দ্রুত তৈরি হয়ে আমাকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে। সেখানে কথা বলা হয়েছে। গেলেই ভর্তির ব্যবস্থা হবে। দ্রুত আমরা কলাবাগানের বাসা থেকে বেরিয়ে পড়লাম রিকশা করে।

সুনসান রাস্তায় ঢাকা কলেজের (আমি এখানে পড়াশোনা করেছি) সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় এই প্রথম নিজেকে প্রশ্ন করলাম, ফিরব তো? পরক্ষণেই আমার বাঁ হাতে আরেকটি নরম হাতের শক্ত বন্ধনী দেখে নিজেই উত্তর ঠিক করে নিলাম, অবশ্যই ফিরব, ফিরতেই হবে।

এর মধ্যে হাসপাতাল থেকে ফোন এল, আমরা কত দূরে?
‘কাছাকাছি’, বললাম। ঢাকা মেডিকেলে পৌঁছে আমরা গেলাম নতুন ভবনের জরুরি বিভাগে। একজন আমার অক্সিজেন স্যাচুরেশন মেপে নিলেন। জরুরি বিভাগের পরামর্শে একটা এক্স–রে করানোর পর ভর্তি করলেন তাঁরা। পাঠানো হলো ৯০২ নম্বর করোনা ওয়ার্ডে।

দশতলায় উঠে এলাম ভর্তির কাগজপত্র আর ছোট্ট ব্যাগে একটা কাঁথা ও বিছানার চাদর নিয়ে। হাসপাতালে এসে স্ত্রীকে একটাই অনুরোধ করে যাচ্ছিলাম, ‘তুমি কিন্তু এখানে থাকবা না। আমি একাই সামলে নিতে পারব।’ কিন্তু সে কিছুতেই আমাকে একা ছাড়বে না। ওয়ার্ডে আসার পর দেখলাম নার্স আমার আগের একজন রোগীর ভর্তিপ্রক্রিয়া শেষ করছেন। সব শেষ করে নার্স তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনার সঙ্গে কে এসেছে? কেউ না বলার পর নার্স বললেন, ‘কিন্তু আপনার তো লোকের দরকার পড়বে। বাড়ি থেকে কাউকে আসতে বলুন।’

এসব দেখে আমি স্ত্রীর দিকে তাকালাম, তাঁর মুখে তখন হাসি। এর প্রায় আধা ঘণ্টা পর আমার ভর্তির প্রক্রিয়া শেষ হলো। নার্স আমাদের বললেন, ৫০ নম্বর বেডে চলে যান। সেখানে গিয়ে দেখি বেডের ওপরে নিচে ময়লার স্তূপ। সকালে যিনি এই বেড থেকে ছাড়া পেয়েছেন, তাঁর ব্যবহৃত জিনিসপত্র এখানে। আমার স্ত্রীর অনেক দৌড়াদৌড়ি আর ফোনাফোনির প্রায় ঘণ্টাখানেক পর একজন ছেলে এসে কিছু অংশ পরিষ্কার করে দিল। আমরা কোনোরকমে বিছানার ওপর আমাদের চাদর পেড়ে বসলাম। এদিকে আমার শরীর আরও খারাপ লাগছে, নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। অক্সিজেন মাস্ক দিয়ে যাচ্ছে না কেউ। কয়েকবার নার্সের কাছে বলেও মাস্ক না পাওয়ায় আমার এক বন্ধুর পরিচিত ডিউটি ডাক্তারকে ফোন করলাম। ৩০ মিনিট বাদে তিনি অক্সিজেন মাস্ক ব্যবস্থা করে দিলেন। আমি শ্বাস নিলাম। বেশ আরাম পেলাম। প্রথমবার হাসপাতালে ভর্তির অভিজ্ঞতা যে এমন হবে, তা কি ভেবেছিলাম কখনো? এসব ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে গেলাম।

default-image

হাসপাতালের দিনগুলো
পরদিন (১১ জুন) ভোরে ঘুম ভাঙল। স্ত্রী রাত থেকে একটা চেয়ারে বসে আছে। আমি ওয়াশরুমে যাওয়ার জন্য বিছানা থেকে উঠলাম। রুম ছেড়ে বারান্দায় যেতেই দেখি পুরোটাজুড়ে ময়লার স্তূপ। কোনোরকমে ময়লা টপকে টয়লেটের কাছে এলাম। এ পাশে চারটি টয়লেটের একটা তালা মারা, পরেরটা নোংরা, বাকি দুটোর কোনোটাতেই ছিটকিনি নেই। ফিরে এলাম রুমে। নিশ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছিল। অক্সিজেন মাস্ক লাগালাম, ঘণ্টাখানেক পর আবার টয়লেট অভিযানে গেলাম। এবার জান্নাতিকে দাঁড় করালাম দরজার ওপাশে। এভাবে প্রথম সকাল কাটল।

রুমে ফিরে এসে খেয়াল করলাম আশপাশে কারা আছেন। পুরো ঘরে ছয়টা বেড। চারটিতে রোগী (আমিসহ), বাকি দুটি ফাঁকা অক্সিজেন–সুবিধা নেই বলে। ৪৯ নম্বর বেডে আছেন বয়স্ক মতি মিয়া ও তাঁর তিন সন্তান। যাঁর গল্প আমি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে বাবা দিবসের জন্য লিখে পাঠিয়েছিলাম প্রথম আলোয় (২১ জুন প্রথম আলো অনলাইনে প্রকাশিত)। চিকিৎসকদের পাশাপাশি এই মতি মিয়ার তিন সন্তান প্রায় এক মাস দিনরাত ২৪ ঘণ্টা বাবার সেবা করেছেন। এরপর তিনি করোনামুক্ত হয়েছেন।

৫০ নম্বর বেডে আমরা, ৫৩ নম্বর বেডে টঙ্গী থেকে আসা ব্যবসায়ী হানিফ সরকার ও তাঁর স্ত্রী রহিমা বেগম। আর ৫৪ নম্বর বেডে প্রথম দিন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র। এক দিন পর তিনি চলে গেলে সেখানে আসেন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সাইফুর রহমান। চারজন রোগীর সঙ্গে এই ঘরে থাকেন আরও পাঁচজন, তাঁরা আমাদের স্বজন।

চারদিকে যখন করোনার রোগীকে ফেলে পরিবারের লোকদের পালানোর কিংবা নিষ্ঠুরতার খবর শুনে আতঙ্কিত, তখন ঢাকা মেডিকেলে এসে সেই চিত্র দেখছি পুরো উল্টো। হানিফ সরকারের স্ত্রী রহিমা বেগমও স্বামীর সঙ্গে ছিলেন পুরোটা সময়। এ ছাড়া তাঁর সন্তান ও শ্যালিকা আসতেন নিয়মিত। এক নারীকে দেখলাম পাঁচ বছরের শিশুকে নিয়ে স্বামীর বিছানার পাশে বসা।

৯০২ নম্বর ওয়ার্ডের মোট ১০টি কক্ষের প্রতিটিতে এভাবে ৪, ৫ বা ৬ জন করে রোগী ও তাঁদের স্বজন রয়েছেন দেখলাম। এই ওয়ার্ডে থাকা প্রায় প্রত্যেক রোগীরই অক্সিজেন সরবরাহের দরকার পড়ছে। অনেকের অবস্থা দেখলাম আমার চেয়ে খারাপ। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষদের এক মিনিটও বাড়তি অক্সিজেন ছাড়া চলছে না। খাওয়া, টয়লেট সবই তাঁদের ঘরে করতে হয়, অক্সিজেন মাস্ক পরে। তাই রোগীর সঙ্গে দরকার পড়ে স্বজন। চিকিৎসার পাশাপাশি এই মানুষদের দরকার হয় প্রিয়জনের মমতা ভরা স্পর্শ। কারণ, এখানে দায়িত্বে থাকা নার্সরা সকাল–সন্ধ্যা দুই বেলা ইনজেকশন আর ওষুধ দিয়ে যান। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র দেখে সেই ওষুধ আবার বুঝে নিতে হয় রোগী বা তার স্বজনদের। মাঝেমধ্যে কোনো কোনো ওষুধ দিতে ভুলে যান তাঁরা। তখন আবার ব্যবস্থাপত্র দেখে তাঁদের বলতে হয়। অবশ্য তাঁদেরইবা দোষ কী, একে তো পিপিই পরা, তার ওপর মুখে দুটি মাস্ক, হাতে গ্লাভস, পায়ে প্লাস্টিকের জুতার আবরণী, চোখে বিশেষ চশমা, মুখে আবার একটা ফেসশিল্ড। এত কিছুর পর তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে ও বুঝতে যথেষ্ট ধৈর্যের দরকার হয়।

১২ জুন বিকেলে প্রথমবারের চিকিৎসক এলেন আমাদের রুমে, রাউন্ডে। এখানে কোনো কোনো চিকিৎসক রাউন্ডে আসেন, বাকিরা বসে থাকেন ওয়ার্ডের বাইরের দিকে নির্ধারিত কক্ষে। কোনো রোগীর সমস্যা হলে তাঁর ফাইল নিয়ে যেতে হয় সেই কক্ষে। তাঁরা ফাইল দেখে সমস্যা শুনে সেভাবে ওষুধ লিখে দেন।

অধিকাংশ রোগীকে দেখলাম শেষ মুহূর্তে হাসপাতালে আসতে। সারা দিন কয়েকজন চিকিৎসক মিলে এত রোগীর চাপ সামলানোও মুশকিল। এখানে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ডিউটির শিডিউল আছে। সাত দিন অফিস করার পর ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিন। এরপর আবার সাত দিন ডিউটি।

হুটহাট একেক রুম থেকে ভেসে আসে কান্নার শব্দ। জান্নাতি ঘুরে এসে বলে, আরেকজন মারা গেল।

এক দিন সকালের ঘটনা। ২৭ থেকে ২৮ বছরের একজন ছেলে করোনা আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন আগের দিন সন্ধ্যায়। তাঁর সঙ্গে ছোট দুই ভাইবোন। ছেলেটির সকালে হঠাৎ অবস্থা খারাপ হতে শুরু করল। ছোট ভাইবোন দুটি তাঁর পাশে বসে চিৎকার করে শুধু কাঁদছে। এদিকে ছেলেটি অক্সিজেন মাস্ক পরলেও ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারছে না। আমার স্ত্রী দৌড়ে গেলেন সিস্টারকে ডাকতে। অনেকটা নিরুত্তাপ গলায় সিস্টার জানান, ‘ছেলেটির আইসিইউ সাপোর্ট দরকার। আমরা খোঁজ নিয়েছিলাম, বেড খালি নেই।’ তারও প্রায় দুই ঘণ্টা পর বোনের হাত পাখার বাতাস গায়ে মাখতে মাখতে সে নিথর হয়ে পড়ল। বাড়ির একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে ভাইবোন তখন দিশেহারা।

খুব কম চিকিৎসক রুম ভিজিটে এলেও, চিকিৎসকদের ভালোবাসা কিন্তু কম পাইনি। যদিও পিপিই পরে থাকায় কোনো চিকিৎসকেরই নাম জানতে পারিনি। কয়েকজন চিকিৎসক নিয়মিত রুমে আসতেন, সমস্যার কথা শুনতেন, অভয় দিতেন। কয়েকজন নার্স ছিলেন, যাঁদের দেখলে খুব আপনজন মনে হতো। এত মিষ্টি করে মানুষ কথা বলতে পারেন! তাঁদের ইনজেকশন দেওয়ার কৌশলও দারুণ। কোনো ব্যথা পেতাম না। এটা–সেটা গল্প করতে করতেই তাঁরা কখন ইনজেকশন দিতেন, টেরই পাইনি। প্রতিদিন ৫টা করে ইনজেকশন! সঙ্গে তিন বেলা এক গাদা করে ওষুধ। আবার কোনো কোনো সিস্টার আসতেন রাজ্যের তাড়া নিয়ে। বেশ দূরত্বে দাঁড়িয়ে কোনোমতে ইনজেকশনটা ক্যানোলায় ঢুকিয়ে সাঁই বেগে চালান করে দিতেন।

এক ভোররাতে ক্যানোলা করা হাতের ব্যথায় ঘুম থেকে উঠে বসলাম। বাইরেটা পরিষ্কার হতে শুরু করেছে। বিছানা ছেড়ে উঠে এলাম বারান্দায়, আকাশ দেখব বলে। দেখি একজন লোক বারান্দার কোনায় করিডরের মুখে দুহাতে দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ব্যথায় উহু, আহা করছে। হেঁটে সামনে যেতে পারছেন না। একটু পর দেখি তিনি সেখানে দাঁড়িয়েই মলমূত্র ত্যাগ করে ফেলেছেন। আমি অনেকক্ষণ খুঁজে রিসেপশনের কাছে একজন পিপিই পরা লোককে দেখে সেটা বললাম। তিনি বললেন, ‘আপনি যান আমি দেখছি।’ আমি রুমে এসে ঘুমিয়ে পড়লাম। সকাল আটটার দিকে বেশ শোরগোল শুনে উঠে দেখি রাতের সেই মানুষ দেয়াল ধরে ধরে আমাদের কক্ষের সামনে চলে এসেছেন। নিজের ঘর চিনতে পারছেন না। তাঁকে তাঁর বিছানায় পৌঁছে দিলেন আরেক রোগীর এক স্বজন। সকাল নয়টার দিকে সেই মানুষের স্বজনেরা এসে করিডরের সব নোংরা পরিষ্কার করলেন। স্ত্রী আর কন্যা থেকে গেলেন কলেজশিক্ষক ওই রোগীর কাছে।

হাসপাতালের পঞ্চম দিনে এসে দেখলাম আমার বাড়তি অক্সিজেন দরকার হচ্ছে না। এমনিই শ্বাস নিতে থাকলাম। তবে কাশি কমেনি।

default-image

ভালোবেসে সখী
বিয়ের ৯ মাসের মাথায় হাসপাতালে এসে স্ত্রীকে যেন নতুনভাবে আবিষ্কার করলাম। সারা দিন আমাকে খাওয়ানো, গোসল, গা মোছা, ওষুধ খাওয়ানো, জরুরি প্রয়োজনে ওষুধ বাইরে থেকে কিনে আনা ছাড়াও তাঁর আরেকটি কাজে বেশ অবাক হলাম। সে শুধু আমার না, আশপাশের রোগীদেরও খোঁজ নিয়েছে। আমাদের রুমের অন্য রোগীদের রক্তচাপ মাপা, অক্সিজেনের মাত্রা দেখাসহ নানা কাজে সে এগিয়ে গেছে। আশপাশের রুমে অসহায় অনেক মানুষ ছিলেন, যাঁরা সাধারণ লেখাপড়াটুকুও জানেন না। সেখানেও এগিয়ে গিয়েছে জান্নাতি। কার কোন ওষুধ কখন খেতে হবে বা বেশি অসুস্থ হলে নার্সদের ডাকা—সবই করতে দেখেছি তাঁকে।

কয়েকবার নিষেধ করেছি, পরে দেখলাম সবার ওপরে তো মানুষই সত্য। হাসপাতালে সে প্রায় ২৪ ঘণ্টা মাস্ক পরেছে। ঘুমিয়েছে আমার সঙ্গে একই বিছানায়। ৪৯ নম্বর বেডের মতি মিয়া ও তাঁর তিন ছেলে আগেই করোনা পরীক্ষা করান, চারজনেরই ফলাফল আসে নেগেটিভ। বাকি রইলাম আমরা তিন রোগী ও দুজনের স্ত্রীসহ মোট পাঁচজন। হাসপাতালে আমাদের ১১তম দিনে রুমের সবাই দিলাম করোনা পরীক্ষার নমুনা। ১৩তম দিন সকালে পাঁচজনের মুঠোফোনে একে একে এসএমএস আসে। সবার ফলাফলই নেগেটিভ! ৯ জন মানুষের সবাই তখন করোনা মুক্ত। এর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে!

সেদিনই আমাদের হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হলো। বাসায় ফিরলাম আমরা। জান্নাতিকে নিয়ে যাঁরা চিন্তায় ছিলেন, খবর শুনে স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়লেন তাঁরাও। নিয়মিত আমাদের খোঁজ রাখতেন ফিচার সম্পাদক সুমনা শারমীন ও সম্পাদক মতিউর রহমান। তাঁদের ফোন করে খবরটা জানালাম। তাঁরা উৎকণ্ঠায় ছিলেন আমার স্ত্রীকে নিয়েও। সম্পাদক বললেন, ‘খুব ভালো খবর। এবার বাসায় এসে পরিপূর্ণ বিশ্রাম করো।’

নিউ নরমালের চক্করে
এখন তো অনেক বাড়িতেই করোনা রোগী কিংবা করোনা থেকে সেরে ওঠা মানুষ। অফিস খুলে যাওয়ায় বাইরে চলাচল করা মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। তবে এই মানুষেরা যেন আলাদা। বাইরের পরিবেশও বদলে গেছে। শপিং মল থেকে গণপরিবহন—সবখানেই নতুন স্বাভাবিক (নিউ নরমাল) জীবনযাত্রা শুরু হয়েছে। এই অবস্থা কবে কাটবে কেউ জানি না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার টিকার উদ্ভাবন হলেও তো মানুষ সাবধানে চলবে, মাস্ক পরবে, দূরে দূরে বসে আড্ডা দেবে।

আমার এক সহকর্মী একদিন মেসেঞ্জারে গল্পচ্ছলে তাঁর এক বন্ধুর আফসোসের কথা বলছিল, ‘নতুন এই অবস্থার চক্করে পড়ে আমার সন্তান (২ বছর) বোধ হয় জানবেও না, একসময় মানুষ মাস্ক ছাড়া চলাফেরা করত!’

কথাটা খুব ছুঁয়ে যায়। আসলেই তো! একজন শিশু, যে নতুন স্বাভাবিক যুগে বেড়ে উঠবে সে কীভাবে জানবে, বন্ধুদের আড্ডায় একসময় মানুষ হাসতে হাসতে একজন আরেকজনের গায়ে ঢলে পড়ত। বাইরে চলাচলের সময় মানুষের মুখ দেখে অনেক কিছু বুঝে নেওয়া যেত।

চিকিৎসকের পরামর্শে আমার এখন ১৪ দিনের বাসায় সঙ্গনিরোধ মানে হোম আইসোলেশন পর্ব চলছে। করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর এত এত মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি যে আমরা অবাক! এ যাত্রায় যখন বেঁচে গেছি, নতুন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে দ্রুত আমি একবার গ্রামে যেতে চাই। আমি কয়েক দিনের জন্য হলেও ফিরতে চাই জাম, জামরুল আর হিজলের ছায়ায়।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0