default-image

করোনার কারণে নির্মাণশ্রমিক মোতালেব মিয়ার প্রতিদিন কাজ জোটে না। তাই তো তাঁকে স্ত্রী সীমা আক্তারের আয়ের ওপর নির্ভর করতে হতো। সীমা ঘরে বসে টুকটাক সেলাইয়ের কাজ করতেন। কিন্তু শুক্রবার রাতের অগ্নিকাণ্ডে ঘরের জিনিসপত্রের সঙ্গে সেলাই মেশিনটাও পুড়ে যায়। এই সেলাই মেশিনটি ছিল তাঁদের আয়ের অন্যতম অবলম্বন। তাই সব হারিয়ে এই দম্পত্তি এখন দিশেহারা।

মোতালেব-সীমা দম্পত্তি কল্যাণপুরের নতুনবাজার বস্তিতে দুই সন্তান নিয়ে থাকেন। তাঁদের মতো বস্তির প্রায় এক শ পরিবার ওই অগ্নিকাণ্ডে নিজেদের সহায়–সম্বল সব হারিয়ে দিশেহারা।

সীমা প্রথম আলোকে বলেন, ‘কিছুই সরাইতে পারি নাই। কোনোমতে জানডা নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসছি।’ ঘরের ভেতরে থাকা হাঁড়িপাতিল, পরনের জামাকাপড়, সেলাই মেশিন, সেলাইয়ের জন্য নিয়ে আসা কাপড়চোপড়, আসবাবপত্র সবই ছাই হয়ে গেছে বলেও তিনি জানান।

নতুনবাজার বস্তির অনেক বাসিন্দার নিজেদের কেনা ঘর রয়েছে। তাঁদের কোনো ঘরভাড়া দিতে হয় না। ঘরের মালিক নিজেরা হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্থ ঘরটাও পুনরায় মেরামত করতে হবে তাঁদের। বস্তির এ রকম একজন বাসিন্দা আরজু বেগম। তাঁর স্বামী জসিম মিয়া এক বছর ধরে খাদ্যনালির সমস্যায় ভুগছেন। আগে রিকশা চালাতেন। এখন কাজ করতে পারেন না। আরজু বাসাবাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করে মাসে ছয় হাজার টাকা উপার্জন করেন। এ দিয়েই স্বামীর চিকিৎসা, সন্তানদের ভরণপোষণসহ কষ্টে চলছিল আরজুর সংসার। কিন্তু আগুনে তাঁর ঘরের জিনিসপত্র পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। পোড়া ঘর, অসুস্থ স্বামী ও ছোট দুই মেয়েকে নিয়ে এখন কী করবেন—সেটাই মাথায় আসছে না তাঁর।

বিজ্ঞাপন

পুড়ে যাওয়া ঘরের সামনে আরজু বেগম বলেন, ‘৫ বছর আগে ৩০ হাজার টাকায় ঘরটা কিনেছিলাম। নিজের ঘর ছিল বলে বাসাভাড়াটা বেঁচে যেত। কিন্তু আগুনে ঘরটা পুড়ে গেছে। এখন ঘর ঠিক করব কীভাবে?’

নতুনবাজার বস্তির বেশির ভাগ বাসিন্দা কেউ রিকশা–ভ্যান চালান, কেউ ফেরি করে হরেক রকমের পণ্য বিক্রি করেন, আর স্ত্রীরা বেশির ভাগই বাসাবাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে ঘর, ঘরে থাকা আসবাব ও অন্যান্য জিনসপত্র। ক্ষতিগ্রস্থ বস্তিবাসীদের কেউ কেউ পোড়া জিনিসপত্র সরাচ্ছেন, কেউ কেউ পোড়া জিনিসপত্র সরিয়ে মেঝে পরিষ্কারের চেষ্টা করছেন। খানিকটা মেঝে পরিষ্কার করে তাতে মাদুর পেতে জিরিয়ে নিচ্ছেন অনেকে। বস্তির ঘরগুলো ছিল কাঠ বা বাঁশের সঙ্গে বেঁধে টিনের বেড়া ও ছাউনির। অগ্নিকাণ্ডে কিছুই রক্ষা হয়নি। এখন তাঁরা খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছেন। কেউ কেউ রোদের তাপ থেকে বাঁচতে পুরাতন কাপড়, বিছানার চাদর বা পলিথিন নিয়ে রশির সঙ্গে বেঁধে ছায়া তৈরির চেষ্টা করছেন। তবে আগুনে পুড়ে যাওয়া জিনিস, ছাই–কয়লা কোথায় ফেলবেন? এ নিয়েও ভোগান্তিতে পড়ছেন তাঁরা।

চানাচুর বিক্রেতা ইয়াসিন মিয়া ১৫ বছর ধরে নতুনবাজার বস্তিতে রয়েছেন। শনিবার দুপুরে পোড়া কাঠ ও আসবাব সরানোর কাজ করছিলেন তিনি। তিনি জানান, সারা দিন খাটুনির পর রাতে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। হঠাৎ বিকট শব্দে ঘুম ভাঙে। চারদিকে ‘আগুন আগুন’ চিৎকার শুনতে পান। উঠেই স্ত্রী–সন্তানকে নিয়ে দৌড়ে রাস্তায় চলে যান।

কয়েকজন বস্তিবাসী জানান, মসজিদ থেকে এক বেলা খিচুরি খাওয়ানো হয়েছে। ডিএনসিসির ১১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর দেওয়ান আবদুল মান্নানও দুপুরের খাবার দিয়েছেন। মিরপুর থানা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মনসুর আলী হাঁড়িপাতিল, গ্লাস–প্লেট দিয়েছেন। বিকেলে বস্তিবাসীদের বালতি, মগ, প্লেট, গ্লাস, চামচ, কড়াই প্রভৃতি দিয়েছে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক। তবে শনিবার রাতে খাবার জুটবে কি না, এ বিষয়ে অনিশ্চয়তার কথা জানান ভুক্তভোগীরা।

default-image

নুসরাতের বয়স চার বছর, আর লামিয়ার দেড় বছর। সম্পর্কে তারা আপন চাচাতো বোন। আগুনে তাঁদের ঘরটাও পুড়ে গেছে। দুপুরে মাথা গোঁজার একমাত্র ঠায়টি পুনরায় মেরামতের কাজেই যখন এই দুই শিশুর মা–বাবারা ব্যস্ত ছিলেন, তখন নুসরাত ভাঙা একটি কলস থেকে লামিয়াকে পানি খাইয়ে দিচ্ছিলেন। পরে কথা হয়, নুসরাতের মা রেহানা বেগমের সঙ্গে। পেশায় তিনি গৃহিনী। রেহানা জানায়, চিৎকার–চেঁচামেচিতে তাঁদের ঘুম ভেঙে যায়। উঠেই দেখেন দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। দ্রুত চার সন্তান আর স্বামীকে নিয়ে ঘরের বাইরে চলে আসেন।
কবুতরের শোকে বিষণ্ন জাবেদ

দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র জাবেদ মিয়া। কবুতর তার অনেক পছন্দের। ১৬ জোড়া কবুতর ছিল জাবেদের। স্কুল থেকে ফিরে কবুতরের সঙ্গে খেলা করা, খাবার দেওয়া, আকাশে ছেড়ে দিয়ে খেলা করা—এগুলোই ছিল তার নিত্যদিনের কাজ। যখন আগুন লাগে, তখন নিজে নিরাপদে সরে যেতে পারলেও প্রিয় কবুতরগুলোকে সরাতে পারেনি। ফলে পুড়ে সব কবুতর মরে গেছে। ঘর হারিয়ে যতটুকু না কষ্ট জাবেদের, তার চাইতে বেশি কষ্ট কবুতরের মৃত্যুতে।

কতগুলো কবুতর ছিল তোমার—এমন প্রশ্নের জবাবে কাঁদো কাঁদো স্বরে জাবেদের মৃদু জবাব, ‘অনেকগুলো কবুতর ছিল আমার। সব মরে গেছে।’ পাশে থাকা জাবেদের নানা জানালেন, কবুতরগুলো মারা যাওয়ায় সে অনেক চুপ হয়ে গেছে। ঠিক করে কথাও বলছে না।

এদিকে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের জন্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম জরুরি ভিত্তিতে প্রতিটি পরিবারকে পাঁচ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের জন্য ডিএনসিসির পক্ষ থেকে খাবার ও পানি সরবরাহের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ডিএনসিসির ১১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মান্নানকে সার্বিক বিষয় তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
মিরপুর মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সাদ্দাম হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, আগুনে বস্তির ৮৪টি ঘর পুড়ে গেছে। এ ঘটনায় দুজন আহত হয়েছেন। তাঁদের শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0