বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

গানের সুর ভেসে আসছে। রিকশার পিছু নিয়ে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। জ্যামে আটকে সওয়ারি ভাড়া মিটিয়ে নেমে গেলেন বিরক্ত মুখে। চালক গান গাইতে গাইতেই ভাড়া গুনে পকেটে রাখলেন। জট নিয়ে তিনি নির্বিকার। দুপাশে চেপে দাঁড়ানো দুই গাড়ির উপস্থিতি নিয়ে ভাবলেশহীন আরও বেশি। সুখী মুখের চালকের সঙ্গে কথা বলতে এগিয়ে গিয়ে পাওয়া গেল সামনের পরিস্থিতি। সেখানে হরলিকসের বড় কৌটা থেকে শুরু করে অ্যালুমিনিয়ামের পাতিলের মধ্যে একগাদা স্টিলের বল। চাকা ঘোরার সময় এর সবগুলো মিলে একটা ঝনঝন শব্দ তৈরি হয়। এই শব্দ নিজের শুনতে ভালো লাগে। বৃষ্টি হলে পাতিলের মধ্যে পানি জমে। সুযোগ পেলে পাখি বসে সে পানি পান করে। অঙ্গসজ্জার ব্যাপারটা কী জানতে চাওয়ায় মুহম্মদ ভাই যারপরনাই খুশি। মোট ১৩ হাজার টাকা খরচ করে তিনি এই হাঁড়ি–পাতিল লাগিয়েছেন, তবে কাজ নাকি এখনো শেষ হয়নি। আরও কিছু খরচ আছে। দুই যুগ আগে সুন্দরগঞ্জ থেকে ঢাকা এসেছেন রিকশা চালাতে। এক পুত্র আর স্ত্রী নিয়ে থাকেন কামরাঙ্গীর চরে।

default-image

অঙ্গসজ্জার গূঢ় কারণ হিসেবে বললেন, ‘ আমার খুশি। এইটাই তো আমার জীবিকা তাই তারে ( রিকশাকে) সুন্দর লাগানো দায়িত্ব। জীবিকাকে অবহেলা করতে হয় না’। রিকশার প্রতি এই পরম মমতা দেখে জানতে চাইলাম, সবাই তো পেইন্টিং করায়। আপনি এসব হাঁড়ি-পাতিল কেন লাগিয়েছেন? তিনি বললেন, এসব রান্নাবান্না খাওয়ার প্রতীক। রিকশাটা তো এ কারণেই চালানো হয়। ঢাকা শহরে বিভিন্ন সড়কে রিকশা চলাচলের বাধা আর তাঁর অভিজ্ঞতা নিয়ে জানতে চাইলাম। হাসি ধরে রেখেই কথা বলছেন। জানালেন, এসব বড় বড় গাড়ির ভিড়ে নিজের রিকশা নিয়ে মোটেই বিচলিত নন, বরং গাড়ির চালকদের যে জ্যামের মধ্যেও দরজা আটকে গরমের মধ্যে বসে থাকতে হয় এটা অমানবিক ব্যাপার। তখন নাকি তাঁদের দেখতে জেলখানার কয়েদির মতো লাগে। গাড়িচালকদের প্রতি এই করুণার দৃষ্টিভঙ্গি চমকপ্রদ ঠেকল। গরমে তিনি নিজে বাতাস খেতে পারেন, গান গাইলে কেউ থামায় না, পাশের আরেক রিকশাচালক ভাইয়ের কাছ থেকে আগুন ধার নেওয়া যায়। এসব স্বাধীনতা তাঁকে বিপুল আনন্দ দেয়।

default-image

এত বছর ধরে রিকশা চালিয়ে যাচ্ছেন। টাকা জমিয়ে সিএনজি কেনার কথা ভাবেন না? তাহলে তো আরও একটু বড় লোক হতেন। আশপাশের বড় গাড়িগুলো তো জ্যামের জন্য রিকশাকে সারাক্ষণ তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, সওয়ারি ভাড়া নিয়ে বাহাস করে, এসব বিরক্ত করে না? সুন্দরগঞ্জের মুহম্মদ ভাই সুন্দর হাসি বহাল রেখেই এবার একটু দার্শনিক হয়ে উঠলেন। আপা, সারাক্ষণ তুলনা করলে কখনো ভালো থাকা যায় না। তুলনা বাদ দিয়ে সব সময় আনন্দে থাকার চেষ্টা করবেন। হাসিখুশি থাকলে দেখবেন নিজেরে রাজা-বাদশাহর মতো লাগে। নিজেরে সব সময় বড় মনে করবেন, তাইলে আশপাশের কে ট্রাক চালাইতেছে আর কে গরুর গাড়ি এসব আপনার মন খারাপের কারণ হবে না। কয়েক মিনিটের মধ্যে এমন জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য দেওয়ার সুযোগে তাঁকে আরও একটু সুখী মানুষ মনে হলো। ঠিক সেই মুহূর্তে পেছনের গাড়ির কর্কশ হর্ন চিৎকার করল, এবার সামনে থেকে হটো। প্যাডেলে টান দিতে দিতে সুন্দরগঞ্জের মানুষ বললেন, আপা আমার রিকশাটা সুন্দর না? সবকিছু লাগানো হইলে আরও সুন্দর হবে।
ধাবমান গতি দেখতে দেখতে একটা কথাই মাথায় রয়ে গেল, হাসিখুশি থাকলে যেকোনো মানুষই নিজেকে রাজা-বাদশাহ ভাবতে পারে। দিনমান রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, বুকের হাঁপর টেনে সামান্য কয়টি টাকা আয় করা মানুষ তিনিও পারেন।

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন