চাঁদাবাজিতে খালেদের ঘনিষ্ঠরা

বিজ্ঞাপন
default-image

খিলগাঁও ও শাহজাহানপুরে লেগুনাস্ট্যান্ডে এককভাবে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করতেন যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। ক্যাসিনো–বাণিজ্যের অভিযোগে তিনি এখন কারাগারে। কিন্তু এই লেগুনায় চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি। বন্ধ হয়নি আরামবাগ এলাকার দূরপাল্লার বাস কাউন্টার ও সংলগ্ন এলাকার ফুটপাত থেকে চাঁদা তোলা। স্থানীয় যুবলীগ নেতা-কর্মীরা এই চাঁদাবাজি অব্যাহত রেখেছেন। পাশাপাশি তাঁরা মতিঝিলে ফুটপাতে চাঁদাবাজি ও পাড়া-মহল্লায় ডিশ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণেও আধিপত্য বিস্তার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাসিনো–বাণিজ্যের অভিযোগে খালেদকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)। পরে তাঁকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করে কেন্দ্রীয় যুবলীগ। খিলগাঁও, শাহজাহানপুর ও মতিঝিলের স্থানীয় বাসিন্দা ও লেগুনাচালকেরা জানান, আগে এই তিনটি এলাকার লেগুনা, দূরপাল্লার বাস কাউন্টার ও ফুটপাত থেকে মাসে ৪৫ লাখের বেশি টাকা চাঁদা তুলেছেন খালেদ মাহমুদ। এই টাকার দুই-তৃতীয়াংশ নিতেন তিনি। বাকি টাকা পুলিশ ও অন্যান্য সংগঠনের নেতা–কর্মীরা ভাগ করে নিতেন।

তবে চাঁদাবাজির বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে দাবি করেছেন খিলগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মশিউর রহমান। তিনি বলেন, খালেদ মাহমুদ গ্রেপ্তারের সময় খিলগাঁও রেলগেটে চাঁদাবাজির বিষয়টি নিয়ে কথা উঠেছিল। কিন্তু তাঁর কাছে কেউ অভিযোগ করেনি। পুলিশের কোনো সদস্য এর সঙ্গে জড়িত নন।

গণপরিবহনে চাঁদাবাজি: খোঁজ নিয়ে জানা যায়,খিলগাঁওরেলগেট থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত দিনে প্রায় ৬০টি লেগুনা যাতায়াত করে। প্রতিটি লেগুনা থেকে ৮২০ টাকা করে চাঁদা তুলতেন খালেদ মাহমুদ। তিনি গ্রেপ্তারের পর চাঁদার হার একটু কমেছে। এখন প্রতিটি লেগুনা থেকে ৭০০ টাকা করে চাঁদা তোলেন যুবলীগের স্থানীয় নেতা–কর্মীরা। এই হিসাবে এখন দিনে ৪২ হাজার টাকা চাঁদা ওঠে, মাসে চাঁদার পরিমাণ দাঁড়ায় ১২ লাখ ৬০ হাজার টাকা।

গত মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, খিলগাঁও রেলগেটের পশ্চিম পাশে যাত্রীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে অনেকগুলো লেগুনা। কিছুক্ষণ পরপর যাত্রী নিয়ে খিলগাঁও থেকে গুলিস্তানে যাচ্ছে। তাদের তদারকি করছেন লাইনম্যান আইয়ুব রহমান। তিনি বলেন, ‘গাড়ি থেকে চাঁদা তোলার কাজটি করেন জাতীয় শ্রমিক লীগের খিলগাঁও থানা কমিটি। তারা এই টাকা কী করে, তা আমি জানি না।’

পরে যোগাযোগ করা হলে লেগুনা থেকে চাঁদা তোলার কথা স্বীকার করেন জাতীয় শ্রমিক লীগের খিলগাঁও থানা কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক মো. সোহেল। এই টাকা তাঁদের সংগঠনের কাজে খরচ করা হয় বলে তিনি দাবি করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাতীয় শ্রমিক লীগের এক নেতা বলেন, আগে এই চাঁদার টাকার একটা বড় অংশ নিতেন খালেদ মাহমুদ। কিন্তু তিনি গ্রেপ্তারের পর চাঁদার টাকায় ভাগ বসান খালেদের পছন্দের কর্মী তামিম ও বাহাদুর। তাঁরা দুজন প্রতিদিন সন্ধ্যার পর ৪ হাজার করে ৮ হাজার টাকা নেন। বাকি ৩৪ হাজার টাকা অন্যরা ভাগ করে নেন।

লেগুনাচালক আমজাদ হোসেন জানান, একটি লেগুনা দিনে গড়ে ১৬ বার গুলিস্তানে যাতায়াত করে। এতে তাঁদের আয় হয় প্রায় ৩ হাজার টাকা। এর মধ্যে ৭০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। গাড়ির মালিকের জমা ও গ্যাস খরচ দিয়ে মাত্র ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা থাকে। তা দিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অবিলম্বে এই চাঁদাবাজদের কবল থেকে তাঁদের রক্ষা করতে আকুতি জানান তিনি।

এ ছাড়া মতিঝিলের আরামবাগ এলাকায় গ্রিনলাইন, হানিফ, এস আলম, হিমাচলসহ ১৮টি দূরপাল্লার বাস কোম্পানির কাউন্টার রয়েছে। প্রতিটি কাউন্টার থেকে মাসে খালেদ মাহমুদ দেড় লাখ টাকা করে চাঁদা তুলতেন। এই হিসাবে এসব কাউন্টার থেকে মাসে ২৭ লাখ টাকার বেশি চাঁদা তোলা হতো।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে একটি কাউন্টারের ব্যবস্থাপক বলেন, প্রতি মাসের ১ তারিখে তাঁর কোম্পানি খালেদকে দেড় লাখ টাকা দিত। তিনি গ্রেপ্তারের পর অনেকে চাঁদা তুলতে আসছেন। এর মধ্যে খালেদের ডান হাত হিসেবে পরিচিত জামাল নামের এক নেতা রয়েছেন। তিনি আগে খালেদের পক্ষে এসব কাউন্টার থেকে চাঁদা তুলতেন। তবে খালেদের বদলে এখন কে চাঁদা তুলবেন, তা নির্ধারিত হয়নি বলে এ মাসে তাঁদের চাঁদা দিতে হয়নি।

ফুটপাতে যুবলীগ নেতার চাঁদাবাজি ও ডিশ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ: মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনের ফুটপাতে শতাধিক দোকানপাট রয়েছে। এর প্রতিটি দোকান থেকে দিনে ২০০ টাকা করে চাঁদা তুলতেন খালেদ মাহমুদের ঘনিষ্ঠ সাইফুল মোল্লা। এই হিসাবে দিনে এই ফুটপাত থেকে ২০ হাজার টাকা চাঁদা তোলা হতো, যা মাসে প্রায় ৬ লাখ টাকা। এখন এই চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে নিতে দৌড়ঝাঁপ করছেন যুবলীগের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি মারুফ রেজা। এ ছাড়া মারুফ মতিঝিল এজিবি কলোনির ডিশ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ সম্পর্কে জানতে চাইলে মারুফ রেজা ফুটপাতে চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, চাঁদাবাজির সঙ্গে তিনি জড়িত নন। তবে পাঁচ–ছয় বছর আগে তিনি এজিবি কলোনিতে ডিশ ব্যবসা করতেন। খালেদ মাহমুদ তাঁর ব্যবসা দখল করে নিয়েছিলেন। এখন তিনি তাঁর হারানো ব্যবসা ফিরে পেতে চেষ্টা করছেন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন