default-image

ঢাকার রামপুরা থেকে ডেমরা পর্যন্ত চার লেনের একটি সড়ক নির্মাণকাজে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বাড়তি সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)। এতে সরাসরি ৭১ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করতে হবে দেশকে। সঙ্গে মোটা অঙ্কের শুল্ক ও কর থেকে বঞ্চিত হবে সরকার।

প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত সূত্র জানায়, চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি ও চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনকে (যৌথ) বাড়তি সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি ধরা পড়েছে সরকারের অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে (সিসিইএ)। এ কারণে গত ৯ ডিসেম্বর ও ২৭ জানুয়ারি দুই দফায় কমিটি ঠিকাদার নিয়োগের অনুমোদনের প্রস্তাব ফেরত পাঠিয়েছে।

রাজধানী ঢাকার সঙ্গে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বিকল্প সংযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০১৫ সালে সওজ এই প্রকল্প নেয়। পরিকল্পনা অনুসারে, সড়কটির শুরু হবে রামপুরা সেতুর কাছ থেকে। আমুলিয়া হয়ে এর এক মাথা যাবে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চিটাগং রোড মোড়ে। আরেক মাথা গিয়ে মিলবে নারায়ণগঞ্জের তারাবে, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে। সড়কটির দৈর্ঘ্য হবে ১৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৯ দশমিক ৫ কিলোমিটার উড়ালপথ। বাকি চার কিলোমিটার মাটিতে হবে। এর দুই পাশে স্থানীয়দের যাতায়াতের জন্য দুটি সড়ক নির্মাণ করা হবে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সড়কটি চালু করার চিন্তা আছে।

প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৯৪ কোটি টাকা। সরকারি-বেসরকারি যৌথ বিনিয়োগের (পিপিপি) ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসনসহ অন্যান্য সহায়ক কাজের জন্য ১ হাজার ২১০ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্প চলমান। এর পুরো ব্যয়ভার সরকার বহন করছে। সব মিলিয়ে এই সাড়ে ১৩ কিলোমিটারে ব্যয় হবে ৩ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা।

পরিকল্পনা অনুসারে, পিপিপির আওতায় চার বছরের মধ্যে নিজের টাকায় মূল ও স্থানীয় যাতায়াতের সড়ক নির্মাণ করবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ সরকার সড়ক চালুর পর ২১ বছরে লাভসহ ঠিকাদারকে বিনিয়োগের টাকা ফিরিয়ে দেবে। পিপিপি প্রকল্পে বিনিয়োগ ফিরিয়ে দেওয়ার একাধিক প্রচলিত পদ্ধতি আছে। তবে এই প্রকল্পে ছয় মাস অন্তর টাকা ফেরত দেওয়ার যে পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে, এর নাম বেস অ্যাভয়লেবিলিটি পেমেন্ট (বাপ)। এ ক্ষেত্রে ‘বাপ’ হিসেবে সবচেয়ে কম টাকা প্রস্তাব করা ঠিকাদারকেই কাজ দেওয়ার কথা। এই পদ্ধতিতে ২১ বছর পর্যন্ত সড়কটি নিয়ন্ত্রণ করবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তবে টোলের টাকা পাবে সরকার।

*সাড়ে ১৩ কিলোমিটার সড়কের ৯ দশমিক ৫ কিলোমিটার হবে উড়ালপথ *ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা। সড়কে চলতে টোল দিতে হবে
বিজ্ঞাপন

সর্বনিম্ন দরদাতা, শুল্ক ও কর জটিলতা

প্রকল্পের বিনিয়োগকারী ঠিকাদার নির্বাচন করতে ২০১৮ সালের নভেম্বরে দরপত্র আহ্বান করে সওজ। পরের বছর ১ জুলাই চীনের চারটি প্রতিষ্ঠান আর্থিক ও কারিগরি প্রস্তাব জমা দেয়। মূল্যায়নে একটি প্রতিষ্ঠান বাদ পড়ে। যোগ্য তিনটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড (সিসিসিসিএল) ও চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন (সিআরবিসি) যৌথভাবে অংশ নেয়। তারা প্রকল্প বাস্তবায়নের বিনিময়ে বছরে ‘বাপ’ হিসেবে ২১৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা করে ফেরত নেওয়ার প্রস্তাব দেয়।

চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন ইনভেস্টমেন্ট গ্রুপ (সিআরসিআইজি), চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিসিইসিসি) এবং ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড—এই তিন প্রতিষ্ঠানও যৌথভাবে দরপত্রে অংশ নেয়। তারা বছরে ২১২ কোটি ৩ লাখ টাকা করে ফেরত নেওয়ার প্রস্তাব দেয়। আর চায়না স্টেট কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের (সিএসসিইসি) প্রস্তাব ছিল বছরে ৩৬৪ কোটি টাকা।

সওজ সূত্র জানায়, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড (সিসিসিসিএল) ও চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনকে (সিআরবিসি) সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে নির্বাচন করে। কিন্তু চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন ইনভেস্টমেন্ট গ্রুপ (সিআরসিআইজি), চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিসিইসিসি) এবং ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের যৌথ প্রস্তাব এর চেয়ে ৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা কম। এ অবস্থায় সওজের পছন্দের প্রস্তাব অনুযায়ী ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হলে ২১ বছরে সরকারকে প্রায় ৭১ কোটি টাকা বাড়তি ব্যয় করতে হবে।

দরপত্র মূল্যায়ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত সূত্র বলছে, ঠিকাদারকে যে টাকা ফেরত দেওয়া হবে, এর ওপর শুল্ক ও অগ্রিম কর পাওয়ার কথা সরকারের। কিন্তু সওজের বাছাই করা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাদের প্রস্তাবে শুল্ক ও করের বিষয়টি উল্লেখ করেনি। ফলে কর ও শুল্ক সরকার, নাকি ঠিকাদার দেবে, তা এখন পরিষ্কার নয়। অন্যদিকে সত্যিকারের সর্বিনম্ন দরদাতা চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন ইনভেস্টমেন্ট গ্রুপ (সিআরসিআইজি), চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিসিইসিসি) এবং ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার বলেছে, তাদের প্রস্তাবে শুল্ক ও কর অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

সওজের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, যে পদ্ধতিতে ‘বাপ’ হিসাব করা হয়, তাতে শুল্ক ও কর অন্তর্ভুক্ত করা যায় না। সে ক্ষেত্রে সওজ যে ঠিকাদারকে বাছাই করেছে, তাদের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক ও কর সরকারকে দিয়ে দিতে হবে। এটা করলে তারা আর সর্বনিম্ন দরদাতা থাকে না।

এই জটিলতার কারণে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন পিপিপি কর্তৃপক্ষ ২০১৮ সালে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দেয় কমিটি। এতে চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড (সিসিসিসিএল) ও চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনকে (সিআরবিসি) সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে বিবেচনায় নিতে হলে শর্ত জুড়ে দেওয়ার সুপারিশ করে। শর্ত হচ্ছে তাদের দর প্রস্তাবে ভ্যাট ও করের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত আছে, এই মর্মে ঠিকাদারকে লিখিত অঙ্গীকার করতে হবে।

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সওজ তাদের বাছাই করা ঠিকাদারের কাছ থেকে স্পষ্টভাবে লিখিত অঙ্গীকার জোগাড় না করেই গত ৯ ডিসেম্বরে প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠায়। কমিটি তা অনুমোদন না করে ফেরত পাঠায়। এরপর সওজ ঠিকাদারকে এ বিষয়ে চিঠি দেয়। ৩১ ডিসেম্বর ঠিকাদারের জবাব আসে। ২৭ জানুয়ারি আবার সওজের প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য কমিটিতে তোলা হয়। এবারও বিষয়টি স্পষ্ট হয়নি বলে প্রস্তাব ফেরত দেয় কমিটি।

সওজ সূত্র জানায়, সওজের বাছাই করা প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় এজেন্ট সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের প্রতিষ্ঠান সাকো।

এই প্রকল্প দেখভালের দায়িত্বে থাকা সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী এ বি এম ছেরতাজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, কর ও শুল্কসংক্রান্ত বিষয়ে পিপিপি কর্তৃপক্ষের করা কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়ে মন্ত্রিসভা কমিটির কিছু পর্যবেক্ষণ ছিল। এ জন্য তাঁরা ফেরত পাঠিয়েছেন। এটি আবার অনুমোদনের জন্য পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। এবার তাঁদের প্রস্তাব মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন পাবে বলে আশা করছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

সড়কে চলতে টাকা লাগবে

সড়কটির জন্য প্রাথমিক টোল হারও ঠিক করেছে সওজ। পুরো সড়ক ব্যবহার করলে বড় ট্রাকের টোল দিতে হবে ৪৩২ টাকা। মাঝপথে সড়ক থেকে নেমে গেলে প্রতি কিলোমিটারের জন্য ৩২ টাকা টোল লাগবে।

বড় বাসের মোট টোল ৩২৫ টাকা। প্রতি কিলোমিটারের টোল ধরা হয়েছে ২৪ টাকা ১০ পয়সা। মিনিবাসের জন্য প্রতি কিলোমিটারের টোল ১৬ টাকা ১০ পয়সা। আর পুরো সড়কের জন্য ২১৭ টাকা। প্রতিটি কারের টোল ধরা হয়েছে ৭৫ টাকা ৬০ পয়সা। এ ক্ষেত্রে প্রতি কিলোমিটারে ৫ টাকা ৬০ পয়সা।

সড়কের এই টোল সরকার পাবে। তবে সড়কের বিভিন্ন স্থানে বিজ্ঞাপন প্রচার থেকে আয় হলে তা সরকার ও ঠিকাদের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ হবে। ২০২৫ সালে এই সড়ক দিয়ে দিনে ৩০ হাজার যানবাহন চলাচল করবে বলে ধরা হয়েছে।

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন