default-image

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়ায় পাহাড়ে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের প্রতি পাহাড়িদের অবিশ্বাস ও সন্দেহ বেড়েই চলেছে। পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। এভাবে চলতে থাকলে পাহাড়ে শান্তি তো আসবেই না, বরং পরিস্থিতি চুক্তি হওয়ার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে।

আজ শনিবার সকালে রাজধানীর শাহবাগ প্রজন্ম চত্বরে এক সমাবেশে বক্তারা এসব কথা বলেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২৩তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ‘চুক্তির শতভাগ বাস্তবায়নের দাবিতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে প্রজন্ম চত্বর পদযাত্রা’ শেষে বক্তারা এসব কথা বলেন। জাতীয় নাগরিক উদ্যোগ এ পদযাত্রার আয়োজন করে। এর আগে জাতীয় নাগরিক উদ্যোগের ডাকে সকাল সাড়ে ১০টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে পদযাত্রা করেন বাঙালি ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তার কিছু মানুষ।

অনুষ্ঠানে লেখক ও কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ অনলাইনের মাধ্যমে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের কোনো অংশে অশান্তি হলে তা দেশের সব মানুষের জন্য কষ্টের। পার্বত্য চুক্তির পর মানুষ ভেবেছিল সব সমস্যার সমাধান হবে। চুক্তির প্রথম কয়েক বছর কিছু অগ্রগতিও হয়েছিল, তারপর আর হয়নি। তিনি আরও বলেন, চুক্তির অগ্রগতি কেন থেমে গেল, তা রাষ্ট্রকেই বলতে হবে। এ সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে মানুষের মধ্যে হতাশা দেখা দেবে।

বিজ্ঞাপন

আবুল মকসুদ বলেন, অনেক দেরি হয়ে গেছে, আরও দেরি হলে মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হবে। ক্ষুব্ধ মানুষ নিজে যেমন শান্তিতে থাকতে পারে না, সে অন্যকেও শান্তিতে থাকতে দেয় না।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, ২৩ বছর আগে যখন চুক্তি হয়, তখন সেটা ছিল উন্নয়ন ও সম্ভাবনার। চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় এসব ভেস্তে গেছে। এখন যদি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে চুক্তির আগের অবস্থায় পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি ফিরে যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ কতখানি সভ্য, তা নির্ভর করে দেশের গরিব মানুষ কতটা ভালো আছে তার ওপর। গরিব-নির্যাতিত মানুষ ভালো না থাকলে এই উন্নয়ন মানুষের কাজে আসবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস লিখিত ঘোষণাপত্র পড়ে শোনান। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, চুক্তির ২৩ বছর পরও তা পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক পরিস্থিতি আজ অস্থিতিশীল। চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়ায় সরকার ও পাহাড়িদের মধ্যে অবিশ্বাস-সন্দেহ দেখা দিয়েছে। পাহাড়ি জনগণের জাতীয় জীবনে হতাশা ও নিরাশা চেপে বসেছে। তিনি আরও বলেন, জনসংহতি সমিতিসহ পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে সোচ্চার ব্যক্তি ও সংগঠনকে ‘সন্ত্রাসী’, ‘চাঁদাবাজ’, ‘অস্ত্রধারী দুর্বৃত্ত’ হিসেবে পরিচিত করার জন্য বিভিন্ন অপপ্রচার ও যড়যন্ত্র চলছে বলে অভিযোগ করেন।

রোবায়েত ফেরদৌস আরও বলেন, দমন-নিপীড়নের মাধ্যমে পাহাড়ি জনগণকে সত্তরের দশকের মতো দূরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। সরকারের এই ভুল নীতির কারণে চুক্তিপূর্ব সময়ের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো পরিস্থিতি আবারও অশান্ত হয়ে উঠছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জোবাইদা নাসরিন বলেন, সম্প্রতি চিম্বুক পাহাড়ে পাঁচ তারকা হোটেল নির্মাণের বিষয়ে গণমাধ্যমে মাত্র ২০ একর জমি নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এই হোটেলকে কেন্দ্র করে সেখানকার চারটি গ্রামকে পর্যটকদের জন্য প্রদর্শনী হিসেবে রাখা হবে। এসব গ্রামে পর্যটকেরা ম্রো জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রা দেখতে পাবেন। এই চার গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দা উচ্ছেদ হবেন। ১২টি পাহাড়ে কেবল–কার হবে। এর জন্য পাহাড়ে স্টেশন নির্মাণ করা হবে। এ প্রক্রিয়ায় পুরো চিম্বুক পাহাড় দখল হয়ে যাবে। পাঁচ তারকা হোটেল বানিয়ে তাকে পাহাড়িদের জন্য উন্নয়ন বলে প্রচার করা হচ্ছে। সেই জনগণ এই উন্নয়ন চায় কি না, তা সবার আগে জানুক সরকার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৌরভ সিকদারের সভাপতিত্বে ও সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সালেহ আহমেদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন মোহাম্মদ খায়রুল ইসলাম চৌধুরী।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন