জমে ওঠেনি হাট, লোকসানের শঙ্কা

বিজ্ঞাপন
default-image

আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে গতকাল থেকে রাজধানীতে আনুষ্ঠানিকভাবে গরু বেচাকেনা শুরু হয়েছে। তবে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় বসা ১৭টি পশুর হাট এখনো জমে ওঠেনি। করোনা পরিস্থিতির কারণে অন্যবারের তুলনায় হাটে এবার ক্রেতা অনেক কম। এই অবস্থায় লোকসানের আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। এদিকে ক্রেতাশূন্য হাটেও স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না বেশির ভাগ মানুষ।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় এ বছর ছয়টি পশুর হাট বসেছে। এর মধ্যে গাবতলীর হাটটি স্থায়ী। বাকি পাঁচটি অস্থায়ী। সিটি করপোরেশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, গতকাল মঙ্গলবার থেকে হাটে বেচাবিক্রি শুরু হয়েছে। গতকাল উত্তরের চারটি হাটে গিয়ে ক্রেতার উপস্থিতি কম দেখা গেছে। স্বাস্থ্যবিধি নিয়েও ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে সচেতনতা দেখা যায়নি।

গাবতলী হাটে গিয়ে দেখা যায়, শুয়ে-বসে, গল্প-আড্ডায় সময় কাটাচ্ছেন পশু ব্যবসায়ীরা। সরকারের পক্ষ থেকে হাটে ক্রেতা-বিক্রেতাদের প্রতি স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার কঠোর নির্দেশনা থাকলেও তাতে গরজ নেই অনেকের। হাটে আসা ক্রেতাদের মুখে মাস্ক থাকলেও ব্যবসায়ীদের মুখ খালি। অনেক ব্যবসায়ীর মাস্ক আবার নাক ও মুখের বদলে থুতনিতে ঝুলছে। হাসিল নেওয়ার নির্ধারিত ঘরের সামনে ভিড় হতে দেখা গেল। হাটের মূল প্রবেশপথের পাশে যে স্থানে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে, সেটা অব্যবহৃত পড়ে ছিল।

জামালপুরের জাকারিয়া অ্যাগ্রো ফার্ম গাবতলীর হাটে ৮১টি বড় আকারের গরু নিয়ে এসেছে। একেকটির দাম হাঁকা হচ্ছে আড়াই লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা। গতকাল পর্যন্ত তাঁদের মাত্র দুটি গরু পাঁচ লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ব্যবসায়ী ইকবাল হোসেন জানান, হাটে ক্রেতাই নেই। অনেকে দাম জানতে চায়, কিন্তু কোনো দরদাম করে না। দাম শুনেই চলে যায়।

যশোরের মনিরামপুর থেকে ১৫টি অস্ট্রেলিয়ান সংকর জাতের ষাঁড় নিয়ে গাবতলীতে এসেছেন ব্যবসায়ী আসমত আলী। তাঁর খামারে পালন করা ৩৩ মণ ওজনের একটি গরুর দাম চাইছেন ১২ লাখ টাকা। ওই গরুর দাম ৫ লাখ টাকা উঠেছে বলে জানান তিনি।

উত্তরা ১৭ নম্বর সেক্টরে বৃন্দাবন থেকে উত্তর দিকে বিজিএমইএ ভবন পর্যন্ত খালি জায়গায় বসা হাটে গিয়ে কাউকে স্বাস্থ্যবিধি কিংবা সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে দেখা যায়নি। মাইকে বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়েই দায় সারছেন ইজারাদারের লোকজন। উত্তরের এই হাটেও ক্রেতার উপস্থিতি ছিল অনেক কম।

হাট ব্যবস্থাপনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গাইডলাইন, হাটের প্রবেশপথে বাধ্যতামূলক হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রাখার কথা থাকলেও ডিএনসিসির ৪৩ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্বাচল ব্রিজ–সংলগ্ন মস্তুল-ডুমনী বাজারমুখী রাস্তার উভয় পাশের হাটটিতে এই ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ৩০০ ফুট সড়কের পাশে খালি জায়গার ওই হাটে একাধিক জায়গা দিয়ে প্রবেশ করার সুযোগ রয়েছে। ওই হাটে গিয়েও ক্রেতা-বিক্রেতাদের অনেকের মুখে মাস্ক দেখা যায়নি।

এই হাটে চারটি গরু নিয়ে পাবনা থেকে এসেছেন খামারি শিবলী খান। তিনি বলেন, ‘ইচ্ছা তো ছিল একেকটা ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকায় বেচব। আগের বছরেও এমন দামেই আমি বিক্রি করেছি। কিন্তু করোনার কারণে এবারে ওই দাম পাব না।’

ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম গতকাল দুপুরে ভাটারা-সাইদ নগরের হাট পরিদর্শনে যান। সেখানে তিনি বলেন, ‘করোনা মোকাবিলায় আমরা শহরের বাইরে হাট বসানোর জন্য চেষ্টা করেছি। হাটে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে কি না, সেটা ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের নিয়ে তৈরি করা একটি মনিটরিং টিম পর্যবেক্ষণ করছে। একটি করে ভ্রাম্যমাণ আদালতও আছে। তবে এটা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় এবার ১১টি অস্থায়ী পশুর হাট বসেছে। এর মধ্যে পুরান ঢাকার লালবাগের রহমতগঞ্জ খেলার মাঠ একটি। এই হাটে ছয়টি গরু নিয়ে গত তিন দিন ক্রেতার অপেক্ষায় আছেন ফরিদপুরের ব্যাপারী জহিরুল ইসলাম। ক্রেতাসংকটের পাশাপাশি কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় একটি গরুও তিনি বিক্রি করতে পারেননি।

রহমতগঞ্জ খেলার মাঠে জহিরুলের মতো আরও কয়েকজন ব্যবসায়ীর কাছে বেচাবিক্রি পরিস্থিতি জানতে চাইলে তাঁরা একই সুরে কথা বললেন। মোতালেব হোসেন নামের ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার আরেক ব্যাপারী অনেকটা আক্ষেপ করেই বললেন, লাভের আশা তিনি এবার করছেন না। কারণ, করোনার কারণে এবার পরিস্থিতি কিছুটা ব্যতিক্রম। ন্যূনতম লাভ হলেই গরু ছেড়ে দেবেন।

গতকাল বেলা দুইটার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, সামান্য বৃষ্টিতে গরুর হাটের প্রবেশমুখে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টির পানি জমে থাকার কারণে গরু নিয়ে ব্যাপারীরা বিপাকে পড়েছেন। আবার মাঠে পর্যাপ্ত গরু থাকলেও ক্রেতার দেখা নেই। আশপাশের বাসিন্দাদের অনেকেই গরু দেখতে হাটে গেছেন। ইচ্ছুক জনতার মধ্যে যাঁরাই হাটে আসছেন, তাঁদের বেশির ভাগেরই মুখে মাস্ক নেই।

বিকেল সাড়ে চারটায় ডিএসসিসির আরেক অস্থায়ী হাট উত্তর শাহজাহানপুরের মৈত্রী সংঘের মাঠে গিয়েও একই চিত্র দেখা গেছে। হাট ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা জানালেন, আনুষ্ঠানিকভাবে কেনাবেচার প্রথম দিনে গতকাল বিকেল পর্যন্ত মাত্র ১২টি গরু বিক্রি হয়েছে। হাসিল আদায়ের অফিসে দায়িত্বরত হাকিম নামের একজন বলেন, গত বছরের চেয়ে এবার হাটে গরু কম এসেছে। বেচাবিক্রির অবস্থা খুবই খারাপ।

উত্তর শাহজাহানপুর মৈত্রী সংঘের মাঠের আশপাশের খালি জায়গায় দরপত্র আহ্বানের পর থেকেই সেখানকার বাসিন্দারা হাট না বসানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে কেনাবেচা শুরু হলেও কলোনির বাসিন্দারা বলছেন, ছয় দিন আগে থেকেই সেখানে পশু রাখার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এলাকায় পশুর হাট বসানোর কারণে তাঁরা বেশ বিপাকে পড়েছেন।

কোরবানির পশুর হাটগুলোর দেখভালের দায়িত্ব পালন করে ডিএসসিসির সম্পত্তি বিভাগ। স্বাস্থ্যবিধি না মানা এবং ইজারার শর্ত ভঙ্গ করে বাসাবাড়ির আঙিনায় গরু রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা রাসেল সাবরিন প্রথম আলোকে বলেন, যারা ইজারার শর্ত ভঙ্গ করবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গতকাল থেকে প্রতিটি হাটে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন