বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

উপচে পড়া ভিড়ে দীর্ঘ অপেক্ষার পর টিকিট পেয়ে অধিকাংশ টিকিটপ্রত্যাশীর মুখে ছিল হাসি। তবে কয়েকটি পথে চাহিদা অনুযায়ী ট্রেনের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (এসি) কোচের টিকিট পাননি বলে অভিযোগ করেন তাঁরা। এ নিয়ে তাঁদের ছিল ক্ষোভ।
টিকিট বিক্রিতে ধীরগতির জন্য কিছুক্ষণ পরপর টিকিট কাটার সারিতে হইচই ও হর্ষধ্বনি শোনা যাচ্ছিল। কখনো কাঙ্ক্ষিত ট্রেনের টিকিট শেষ হয়ে যাওয়ায় চিৎকার করছিলেন লোকজন। যেমন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসের টিকিট শেষ হয়ে যায়। তখন সারিতে থাকা অপেক্ষমাণ মানুষেরা চিৎকার করে ওঠেন।

পছন্দের টিকিট মিলছে না

কমলাপুর স্টেশনে টিকিট বিক্রি শুরু হওয়ার মিনিট পনেরো পরই কয়েকটি গন্তব্যের তাপানুকূল চেয়ারের (এসি) টিকিট শেষ হয়ে যায়। কাউন্টার থেকে টিকিট শেষ হওয়ার কথা জানালে সারিতে অপেক্ষমাণ মানুষেরা হইচই করে ওঠেন। অগত্যা শোভন চেয়ারসহ নন এসি টিকিট কিনতে হয় তাঁদের।

চাকরিজীবী কাওসার আহমেদ এমনই একজন। রামপুরা থেকে এসেছেন তিনি। যাবেন রংপুর। নীলসাগর এক্সপ্রেসের দুটি এসি টিকিট কিনবেন। স্টেশনে এসেছেন ভোর চারটায়। তিনি বলেন, ‘এসির টিকিট তো আসলে কাউন্টারেও পাওয়া যায় না, অনলাইনেও পাওয়া যায় না। গতকাল অনলাইনে চেষ্টা করেছি পারিনি। আজ এ জন্য কাউন্টারে টিকিট নিতে এসেছি, কিন্তু এসির টিকিট পাইনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘টিকিটের অর্ধেক অনলাইনে, অর্ধেক কাউন্টারে। কাউন্টারে প্রথম ১০ থেকে ১২ জনের পরই বলে এসির টিকিট শেষ। ১৫ মিনিটের ব্যবধানে এত এসির টিকিট গেল কই। এত টিকিট কাটল কে?’

বেলা দুইটার দিকে স্টেশন ব্যবস্থাপকের রুমে আসেন ২০ থেকে ২৫ জন। তাঁরা প্রত্যেকেই কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসের টিকিট কিনতে কেউ গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায়, কেউ রাতে, কেউবা সাহ্‌রির সময় স্টেশনে এসেছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর টিকিট না পেয়ে হইচই করেন তাঁরা। পরে ব্যবস্থাপকের কাছে অভিযোগ নিয়ে আসেন। এ সময় তাঁদের টিকিট দেওয়ার আশ্বাস দিলে চলে যান তাঁরা।

চেয়ার নিয়ে টিকিটের সারিতে

টিকিট কিনতে গতকাল সন্ধ্যার পর স্টেশনে আসা অনেকের একজন ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী সকাল রায়। তাঁর সঙ্গে একটি প্লাস্টিকের চেয়ার। সারির অন্যরা যখন দাঁড়িয়ে, তিনি তখন সারির মাঝে একটি চেয়ারে বসে।
সকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘গতকাল সন্ধ্যায় ইফতারের পরপরই চলে এসেছি। নীলসাগর এক্সপ্রেসের চারটি টিকিট পেয়েছি। টিকিট পেয়ে খুব ভালো লাগছে। পান্থপথে বাসা আমাদের। প্রতিবছর আমিই টিকিট কাটি। অনেকক্ষণ ধরে বসে থাকা লাগবে। তাই এবার বাসা থেকে চেয়ার নিয়ে এসেছি। বাসে করে এনেছি।’

কালোবাজারি বন্ধে এনআইডি

কালোবাজারি বন্ধে টিকিট কেনার সময় যাত্রীদের জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন সনদের ফটোকপি কাউন্টারে দেখাতে হচ্ছে। ৫৭ বছর বয়সী জসিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘টিকিট কাটতে এমনি কোনো সমস্যা হয়নি। এবার টিকিট কাটতে এনআইডি কার্ড লাগছে।’

জসিম আরও বলেন, ‘প্রথমে বলা হয়েছিল, এনআইডি যাঁদের আছে, টিকিট তাঁরা কিনতে পারবেন। কিন্তু এটাও তো সমস্যা। পরিবারের সবার এনআইডি তো না–ও থাকতে পারে। তারপর বলা হলো, একজন একটি এনআইডি দিয়ে সর্বোচ্চ চারজনের টিকিট কিনতে পারবেন। এভাবে বিভ্রান্তি তৈরি না করলেও পারত।’

ঈদযাত্রা শেষে ট্রেনের ফিরতি টিকিট বিক্রি শুরু হবে আগামী ১ মে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আজ ২৭ হাজার ৮৫৩টি টিকিট বিক্রি হবে। এর মধ্যে অনলাইনে বিক্রি হবে ১২ হাজার ১৫৭টি ও কাউন্টারে বিক্রি হবে ১৫ হাজার ৬৯৬টি।

অনলাইনেও টিকিট না পাওয়ার অভিযোগ

গতকাল দিবাগত রাত তিনটায় ফার্মগেট থেকে কমলাপুর স্টেশনে এসে টিকিট কাটার লাইনে দাঁড়িয়েছেন সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার আরেফীন। তাঁর অভিযোগ, এসির টিকিট তিনি কাউন্টারেও পাননি, অনলাইনেও পাননি। বলেন, ‘সাহ্‌রি খেয়ে স্টেশনে এসেছি। সকাল আটটায় অনলাইনে টিকিট বিক্রি শুরু হয়। সার্ভারে লগইন করেছি তখন। কিন্তু সার্ভারে প্রবেশ করতে লেগেছে ২৬ মিনিট। সার্ভারে ঢুকে দেখি টিকিট বিক্রি ততক্ষণে শেষ।’
শাহরিয়ার বলেন, ‘এভাবে অনলাইনে টিকিট দেওয়ার কোনো মানে হয় না। নীলসাগর এক্সপ্রেসের দুটি এসির টিকিট দরকার ছিল। এখন শোভন চেয়ার টিকিট কিনে ফেরত যেতে হচ্ছে।’

এ বিষয়ে কমলাপুর রেলস্টেশনের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মাসুদ সারোয়ার বলেন, ‘আমরা জেনেছি, অনলাইনে অনেকে টিকিট কাটতে পারছে না। এ বিষয়ে সহজডটকম কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানাল, সবাই যখন সকাল আটটায় টিকিটের জন্য একসঙ্গে সার্ভারে লগইন করে, তখন সার্ভারে সাইবার জ্যাম হচ্ছে। এ কারণে সকাল ৮টা ১০ মিনিট নাগাদ টিকিট পেতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে।’

default-image

ব্যবস্থাপক বলেন, ‘টিকিট কাটার সময় জন্মনিবন্ধন বা জাতীয় পরিচয়পত্র দেখা হচ্ছে; যাতে টিকিট বাইরে বা কোনো কালোবাজারির হাতে না যায়। এ ব্যাপারে আমরা সচেষ্ট। টিকিট অন্য কোথাও পাওয়ার সুযোগ নেই।’

প্রতিবার ঈদ এলে স্টেশনে টিকিট কাটতে ভিড় হয়, টিকিট কাউন্টারের সংখ্যা কেন বাড়ানো হয় না—এমন প্রশ্নের জবাবে ব্যবস্থাপক বলেন, ‘টিকিট কাউন্টারের সংখ্যা পর্যাপ্ত। একটা টিকিটের বিপরীতে কখনো ৭০০ মানুষের চাহিদা। আগে কমলাপুর থেকে সব ট্রেনের টিকিট বিক্রি হতো। এবার সেটি ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। ঢাকার অন্য আরও চারটি স্থান থেকে টিকিট বিক্রি হচ্ছে। তবু স্টেশনে মানুষের চাপ নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।’

স্টেশনে মানুষের চাপের ব্যাখ্যায় মোহাম্মদ মাসুদ সারোয়ার বলেন, ‘কোনো কোনো পথের ট্রেনে টিকিট ৭০০। এর মধ্যে কাউন্টারে ৩৫০ টিকিট। কিন্তু মানুষ টিকিটের সারিতে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার। এত চাপ নেওয়া কঠিন। যেহেতু আসনসংখ্যা সীমিত, তাই সীমিতসংখ্যক যাত্রীকে টিকিট দিতে পারব।’

কাউন্টারে টিকিট কেনায় ধীরগতি প্রসঙ্গে স্টেশন ব্যবস্থাপক বলেন, ‘মানুষ টিকিট পাওয়ার জন্য ভোররাতে বা রাতে এসে দাঁড়িয়েছে। এনআইডি নম্বর নেওয়া হচ্ছে। টিকিট কাটতে গিয়ে একজন যাত্রী অনেক অপশনে সময় নিচ্ছে। ফলে দেরি হচ্ছে।’
যাত্রার সময় যাত্রীর জন্মনিবন্ধন বা জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই করা হবে কি না জানতে চাইলে স্টেশন ব্যবস্থাপক বলেন, ‘স্টেশনের কর্মকর্তারা, ট্রেনের টিকিট এক্সামিনাররা এটা নিশ্চিত করবেন। যে এনআইডি দিয়ে টিকিট কেনা হয়েছে, যাত্রীর সঙ্গে সে এনআইডি থাকতে হবে। ভ্রমণের সময় যাত্রীকে এনআইডির কপি রাখতে হবে।’

কমলাপুর স্টেশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কমলাপুর স্টেশনে সমগ্র পশ্চিমাঞ্চল ও খুলনাগামী ট্রেনের টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে। ঢাকা বিমানবন্দর স্টেশনে চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীগামী আন্তনগর ট্রেনের টিকিট ও তেজগাঁও স্টেশনে ময়মনসিংহ, জামালপুরগামী, দেওয়ানগঞ্জ স্পেশালসহ ওই অঞ্চলের সব আন্তনগর ট্রেনের টিকিট পাওয়া যাচ্ছে। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনে মোহনগঞ্জ ও হাওর এক্সপ্রেস ট্রেনের এবং ফুলবাড়িয়া পুরোনো রেলওয়ে স্টেশন থেকে সিলেট ও কিশোরগঞ্জগামী আন্তনগর ট্রেনের টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে।

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন