চোখ মুছতে মুছতে নাঈমের মা বলেছিলেন, ওই দিন ঠিক ৬টা ৪০ মিনিটে ঘর থেকে বেরিয়েছিল নাঈম। তিনি নিজে শক্ত করে ছেলের জুতার ফিতাটা বেঁধে দিয়েছিলেন। কামরাঙ্গীরচরে তাঁদের বাসায় রেলিং ছাড়া সিঁড়ি, কিছুটা অন্ধকারও, তার ওপর বিড়ালের উৎপাত। আলো জ্বেলে ছেলেটাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে বলেছিলেন সাবধানে যেতে। ছেলে ঘাড় নেড়ে বলেছিল, ঠিক আছে। সেই ছেলে কয়েক ঘণ্টা পর লাশ হয়ে যাবে, এখনো ভাবতে পারেন না জান্নাতুল ফেরদৌস।

ঘরটাও এমনভাবে গোছানো, ভ্রম হয়। এখনো ওর টেবিলে থরে থরে সাজানো বই, বিছানার চাদর টান টান, পাশে কাপড়চোপড় রাখার ড্রয়ার। মনে হয়, এ বাড়ির কলেজপড়ুয়া ছেলেটি যেকোনো সময় বাসায় ফিরবে। মায়ের হাতে বানানো শরবত খেয়ে তার শ্রান্তি জুড়াবে।

জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, যখন তাঁর বিয়ে হয়, তখন শাহ আলম দেওয়ান সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে ছিলেন। ২০০০ সালে চাকরিটা ছেড়ে দেন শাহ আলম। নীলক্ষেতে একটা ছোট বইয়ের দোকান দেন। তখনো জান্নাতুল দুই ছেলেকে নিয়ে লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে শ্বশুরবাড়িতে। বছর চারেক পর সাড়ে ৫ বছরের মুনতাসীর আর ১০ মাসের নাঈমকে নিয়ে ঢাকায় সংসার পাতেন তাঁরা। এই দম্পতির একটাই লক্ষ্য ছিল, তাঁদের ছেলে দুটি ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়বে। তারা মানুষের মতো মানুষ হবে।

এবারের ঈদ তাই এই পরিবারে এসেছে নিরানন্দ হয়ে। ঈদের কথা বলতেই আরেকবার অশ্রুসিক্ত হলেন জান্নাতুল ফেরদৌস। উৎসবের দিনগুলোতে যে ছেলেটি হাসি–আনন্দে মাতিয়ে রাখত সবাইকে, সে যে এবার নেই।

ছেলেরাও বিমুখ করেনি। লটারিতে স্কুলে ভর্তি যুগের আগে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তারা গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলে ভর্তি হয়েছিল। বড়টি এখন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে অ্যাকাউন্টিংয়ে লেখাপড়া করে। শাহ আলম দেওয়ান চাইতেন ছোট ছেলেটা অন্তত ডাক্তারি পড়ুক। নটর ডেমে ভর্তি হয়েই নাঈম মা–বাবাকে জানায়, সে আইন পড়বে, বার-অ্যাট-ল করবে। একদিন বিচারক হবে। মা–বাবাও মেনে নিয়েছিলেন।

ছেলে প্রতিদিন কামরাঙ্গীরচর থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশায় ‘সেকশন’ পর্যন্ত যেত, সেখান থেকে টেম্পুতে করে গুলিস্তান মাজার, এরপর বাসে নটর ডেম কলেজ। প্রথম প্রথম বাবাই দিয়ে আসতেন ছেলেকে। বেলা একটার দিকে নাঈমকে বাসায় রেখে দোকানে বসতেন। একটা সময় নাঈমই বলে, বাবাকে আর দিয়ে আসতে হবে না। দোকান খুলতে এত দেরি হলে তাদের সংসারটা চলবে না, এমন শঙ্কা ছিল তার।

ছেলেকে একা ছাড়ার আফসোস এখনো যায়নি শাহ আলম দেওয়ানের। জান্নাতুল যখন কথা বলছিলেন, নাঈম হাসানের বাবা আর বড় ভাই মুনতাসীর মামুন একরকম নির্বাক হয়ে বসেছিলেন। কথোপকথনের শেষ পর্যায়ে শাহ আলম বললেন, ‘নীলক্ষেতে আমার দোকানটা খুব ছোট্ট। কিন্তু আমার ছেলেদের লেখাপড়া নিয়ে কোনো আপস করিনি। বই–খাতা, কোচিং সব করিয়েছি। আমাদের একটা স্বপ্ন ছিল...।’

এবারের ঈদ তাই এই পরিবারে এসেছে নিরানন্দ হয়ে। ঈদের কথা বলতেই আরেকবার অশ্রুসিক্ত হলেন জান্নাতুল ফেরদৌস। উৎসবের দিনগুলোতে যে ছেলেটি হাসি–আনন্দে মাতিয়ে রাখত সবাইকে, সে যে এবার নেই।