বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

শুনানিকালে আদালত সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের উদ্দেশে বলেন, ‘বাংলাদেশে পীর সাহেবের কাণ্ড দেখেন। জায়গা–জমি দখলের জন্য পীর সাহেব কী করেছেন, দেখেন। সম্পত্তির জন্য তথাকথিত মুরিদ দিয়ে মামলা করেছেন। পীর সাহেবের কেরামতি দেখেন।’

ধর্ষণ, মারধর, চুরি, মানব পাচার—এমন সব অভিযোগে দেশের ১৩টি জেলায় করা ২০টি মামলার চক্করে রাজধানীর শান্তিবাগের বাসিন্দা একরামুল আহসানকে ১ হাজার ৪৬৫ দিন কারাভোগ করতে হয়। এ অবস্থায় জামিনে বের হয়ে ওই সব মামলা ‘মিথ্যা’ উল্লেখ করে মামলা দায়েরে সম্পৃক্ত বা বাদীকে খুঁজে বের করতে তদন্তের নির্দেশনা চেয়ে গত ৭ জুন হাইকোর্টে রিট করেন ৫৫ বছর বয়সী ব্যবসায়ী একরামুল। রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ১৪ জুন হাইকোর্ট রুলসহ অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেন।

হাইকোর্ট ওই সব মামলা করা ও এর পেছনে কারা আছেন, তা খুঁজে বের করতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। তদন্তের অগ্রগতি জানিয়ে ৬০ দিনের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। এর ধারাবাহিকতায় সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হয়।

অন্যদিকে একরামুলের বিরুদ্ধে করা পৃথক মামলার কয়েকজন বাদী হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত হয়।

রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী এমাদুল হক বশির। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিপুল বাগমার। একরামুলের বিরুদ্ধে মামলাকারী আফজাল হোসেনের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী ওয়াজি উল্লাহ।

শুনানিতে আইনজীবী ওয়াজি উল্লাহ বলেন, ২০ নম্বর বিবাদীর (আফজাল হোসেন) পক্ষে আপিল বিভাগে আবেদন করা হয়। হাইকোর্টের আদেশ ৫ সেপ্টেম্বর স্থগিত করা হয়।

আদালত বলেন, ‘তাহলে কি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না? তদন্ত স্থগিত করলে তদন্তও করা যাবে না?’ ওয়াজি উল্লাহ বলেন, ‘যাবে।’

এ সময় আইনজীবী এমাদুল হক বশির বলেন, ‘৪৯টি মামলা হলেও ২০টি মামলা নিয়ে রিট। ২০টি মামলার পাঁচজন বাদী আপিল বিভাগে পৃথক আবেদন করেন। তাঁদের মামলার ক্ষেত্র হাইকোর্টের আদেশে স্থগিত হয়েছে শুনেছি। তবে কপি পাইনি।’ আদালত বলেন, ‘কপি নিয়ে আসেন। এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেন। আপিল বিভাগের আদেশ নিয়ে আসেন। এই সপ্তাহের জন্য বিষয়টি মুলতবি রাখা হলো।’

সিআইডির প্রতিবেদনে যা রয়েছে

সিআইডির প্রতিবেদনের ভাষ্য, একরামুল আহসানের তিন ভাই ও এক বোন। ১৯৯৫ সালে তাঁর বাবা আনোয়ারুল্লাহ মারা যান। রাজারবাগ দরবার শরিফের পেছনে ৩ শতাংশ জমির ওপর তিনতলা পৈতৃক বাড়ি তাঁদের। বাবার মৃত্যুর পর একরামুলের বড় ভাই আক্তর-ই-কামাল, মা কোমরের নেহার ও বোন ফাতেমা আক্তার পীর দিল্লুর রহমানের মুরিদ হন। কিন্তু রিট আবেদনকারী ও তাঁর আরেক ভাই কামরুল আহসানকে বিভিন্নভাবে প্ররোচিত করেও ওই পীরের মুরিদ করা যায়নি। এর মধ্যে একরামুল আহসানের মা, ভাই ও বোনের কাছ থেকে তাঁদের পৈতৃক জমির অধিকাংশই পীরের দরবার শরিফের নামে হস্তান্তর করা হয়। আর একরামুল আহসান ও তাঁর ভাইয়ের অংশটুকু পীর ও তাঁর দরবার শরিফের নামে হস্তান্তর করার জন্য পীর দিল্লুর ও তাঁর অনুসারীরা বিভিন্নভাবে চাপ দেন। কিন্তু সম্পত্তি হস্তান্তর না করায় পীর দিল্লুর রহমান ও তাঁর অনুসারীদের সঙ্গে একরামুল আহসানের শত্রুতার সৃষ্টি হয়। সে শত্রুতার কারণেই একরামুল আহসানের বিরুদ্ধে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় হয়রানিমূলক মামলা করেন পীর দিল্লুর রহমান ও তাঁর অনুসারীরা।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, একরামুল আহসানের বিরুদ্ধে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় মোট ৪৯টি মামলা করা হয়। এর মধ্যে জিআর মামলা ২৩টি এবং সিআর মামলা ২৬টি। ইতিমধ্যে জিআর ১৫টি মামলা এবং সিআর ২০টি মামলায় আবেদনকারী আদালত থেকে খালাস পেয়েছেন। বর্তমানে ১৪টি মামলা আদালতে বিচারাধীন। আরও বলা হয়, অধিকাংশ মামলার নথিপত্র সংগ্রহের পর পর্যালোচনায় দেখা যায়, আবেদনকারীর বিরুদ্ধে একাধিক মানব পাচার, নারী নির্যাতন, বিস্ফোরক দ্রব্য আইন, হত্যাচেষ্টার মামলাসহ প্রতারণা, জাল-জালিয়াতি, ডাকাতির প্রস্তুতিসহ বিভিন্ন ধর্তব্য ও ধর্তব্য ধারায় ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় মামলা করা হয়েছে। অধিকাংশ মামলার বাদী, সাক্ষী, ভুক্তভোগীর কোনো না কোনোভাবে রাজারবাগ দরবার শরিফ এবং ওই দরবার শরিফের পীরের সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে।

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন