default-image

রাজধানীর আদাবরের মাইন্ড এইড হাসপাতালের সামনে মানববন্ধন করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থী। তাঁদের অভিযোগ, এই হাসপাতালে জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) আনিসুল করিমকে হত্যা করা হয়েছে। তাঁরা এই ঘটনার দ্রুত বিচার দাবি করেছেন। আনিসুল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র।

মাইন্ড এইড হাসপাতালটি আদাবরের বায়তুল আমান হাউজিংয়ের ২ নম্বর রোডের ২৮১ নম্বর বাড়িতে অবস্থিত। হাসপাতালটির সামনে আজ মঙ্গলবার বেলা পৌনে দুইটার দিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২৫ জন প্রাক্তন-বর্তমান শিক্ষার্থী জড়ো হন। তাঁরা সেখানে মানববন্ধন করেন।

বিজ্ঞাপন

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা অভিযোগ করে বলেন, মাইন্ড এইড হাসপাতালে আনিসুলকে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যার দ্রুত ন্যায়বিচার চান তাঁরা। তা ছাড়া এই ধরনের অবৈধ হাসপাতাল বন্ধ করে দিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর না ঘটে।

দুপুরের দিকে ঘটনাস্থলে আসেন ঢাকা জেলার সিভিল সার্জন মঈনুল আহসান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, হাসপাতালটি অনুমোদন চেয়ে আবেদন করেছিল। কিন্তু অনুমোদন দেওয়া হয়নি। তাই এটা কোনো হাসপাতালই না।

default-image

আদাবর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শাহজাহান জানান, আজ বেলা আড়াইটার দিকে হাসপাতালটি সিলগালা করে দেওয়ার কথা।

মাইন্ড এইড হাসপাতালে আনিসুলকে হত্যার অভিযোগে গতকাল সোমবার রাতে তাঁর বাবা বাদী হয়ে আদাবর থানায় একটি মামলা করেছেন। আনিসুলকে হত্যার অভিযোগে মাইন্ড এইড হাসপাতালের ১০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশ তাঁদের ১০ দিন করে রিমান্ড চায়। পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ আজ দুপুর ১২টার দিকে এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানান।

গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা হলেন হাসপাতালের মার্কেটিং ম্যানেজার আরিফ মাহমুদ, কো-অর্ডিনেটর রেদোয়ান সাব্বির, কথিত ফার্মাসিস্ট তানভীর হাসান, ওয়ার্ডবয় জোবায়ের হোসেন, তানিফ মোল্লা, সজীব চৌধুরী, অসীম চন্দ্র পাল, লিটন আহাম্মদ, সাইফুল ইসলাম ও শেফ মো. মাসুদ।

হারুন অর রশিদ বলেন, তাঁরা মনে করছেন, এটি হত্যাকাণ্ড। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা পুলিশের কাছে হত্যার দায় স্বীকার করেছেন।

default-image

হারুন অর রশিদ বলেন, হাসপাতালটি পরিচালনার জন্য কোনো বৈধ কাগজপত্র ছিল না। এটা একটা ভুঁইফোড় হাসপাতাল। তারা অবৈধভাবে মানসিক রোগীর চিকিৎসার নামে বাণিজ্য করে আসছিল। হাসপাতালের সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।

হারুন অর রশিদ বলেন, হাসপাতালটিতে চিকিৎসাসেবার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই।

বিজ্ঞাপন

মানসিক সমস্যায় ভুগে গতকাল আদাবরের মাইন্ড এইড হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন আনিসুল। ভর্তির পর কয়েক মিনিটের মধ্যেই মারা যান তিনি। পরিবারের অভিযোগ, ভর্তির পরপর হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করেছেন।

সিসিটিভি ফুটেজেও দেখা গেছে, পুলিশ কর্মকর্তাকে ভর্তির পরই একটি কক্ষে নিয়ে হাসপাতালটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মারধর করছেন।

default-image

আনিসুল ৩১তম বিসিএসের পুলিশ ক্যাডারে প্রথম স্থান অধিকার করেন। তিনি সর্বশেষ বরিশাল মহানগর পুলিশে কর্মরত ছিলেন। তাঁর বাড়ি গাজীপুরের কাপাসিয়ায়। তিনি এক সন্তানের জনক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের ৩৩ ব্যাচের ছাত্র ছিলেন তিনি।

আনিসুলের ভাই রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, পারিবারিক কারণে তাঁর ভাই মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তাঁকে নিয়ে মাইন্ড এইড হাসপাতালে যান তাঁরা। যখন ভর্তির ফরম পূরণ করছিলেন, তখন কয়েকজন কর্মচারী তাঁকে দোতলায় নিয়ে যান। এর কিছুক্ষণ পর তাঁদের জানানো হয় আনিসুল অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন। এরপর তাঁরা তাঁকে হৃদ্‌রোগ ইনস্টিটিউটে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

এ ঘটনায় ওই হাসপাতাল থেকে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছে পুলিশ। সেখানে দেখা যায়, বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটের দিকে পুলিশ কর্মকর্তা আনিসুল করিমকে টানাহেঁচড়া করে একটি কক্ষে ঢোকানো হয়। তাঁকে হাসপাতালের ছয়জন কর্মচারী মিলে মাটিতে ফেলে চেপে ধরেন। এরপর নীল পোশাক পরা আরও দুজন কর্মচারী তাঁর পা চেপে ধরেন। এ সময় দুজন কর্মচারী কনুই দিয়ে তাঁকে আঘাত করছিলেন।

হাসপাতালের ব্যবস্থাপক আরিফ মাহমুদও সেখানে ছিলেন। একটি কাপড়ের টুকরা দিয়ে আনিসুলের হাত বাঁধা হয়। চার মিনিট পর আনিসুলের শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ে। একজন কর্মচারী মুখে পানি ছিটান। আনিসুল নড়াচড়া করছিলেন না। তখন কর্মচারীরা কক্ষের মেঝে পরিষ্কার করেন। সাত মিনিট পর সাদা অ্যাপ্রোন পরা একজন নারী কক্ষে ঢোকেন। ১৩ মিনিটের মাথায় তাঁর বুকে পাম্প করেন ওই নারী।

রেজাউল বলেন, তাঁর ভাইয়ের রক্তচাপজনিত সমস্যা ছিল। কিছুটা হৃদ্‌রোগও ছিল। কিন্তু এ দুটির কোনোটিই প্রকট ছিল না। হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পিটুনিতেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করায় তারা পুলিশ কর্মকর্তাকে শান্ত করার চেষ্টা করেছিল।

পুলিশ জানায়, হৃদ্‌রোগ ইনস্টিটিউটের খাতায় লেখা রয়েছে ‘ব্রট ডেড’, অর্থাৎ সেখানে নিয়ে আসার আগেই আনিসুলের মৃত্যু হয়েছিল।

মন্তব্য পড়ুন 0