বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

হেলেনার মতো চলতি আগস্টে পূর্ব জুরাইনের অন্তত আটজন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তাঁরা হলেন ইসরাত জাহান (৭), তোহা (৯), মুস্তাফিজুর রহমান (১১), ফাতেমা (৪৫), হোসনে আরা (৪৫), আকরাম হোসেন (৬২) ও সাঈদা খানম (৭৫)।

এক মাসের বেশি সময় ধরে পূর্ব জুরাইনের বাগানবাড়ি এলাকায় প্রতিটি ঘরে ঘরে ডেঙ্গু রোগী। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঠিকমতো মশার ওষুধ ছিটানো হচ্ছে না। বিকেলে ছিটানো ওষুধে কেরোসিনের গন্ধ বের হয়। ওষুধের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলে তাঁরা বলেছেন, তাঁদের এলাকায় অন্তত এক হাজার জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত।

সড়ক উঁচু করায় পূর্ব জুরাইনের বেশির ভাগ ভবনের নিচতলা রাস্তার উচ্চতা থেকে নিচে নেমে গেছে। অনেক ভবনের নিচতলা ব্যবহারের অনুপযোগী হওয়ায় সেখানে পানি জমে থাকছে। আবার এলাকায় প্রচুর পরিত্যক্ত ভবন রয়েছে। ওই সব ভবনে পানি জমে থাকার কারণে এডিস মশা ব্যাপক হারে বংশবৃদ্ধি ঘটাচ্ছে। এ ছাড়া এলাকাটি তুলনামূলক নিচু হওয়ায় বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় মশকনিধন কার্যক্রমও পর্যাপ্ত নয়। এ কারণেই এ এলাকায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপের দিকে চলে গেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসেবে, এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে দেশে ৪০ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে চলতি আগস্ট মাসের প্রথম ২৫ দিনেই ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর শনাক্ত হয়েছেন ৮ হাজার ৮৫৩ জন।

পূর্ব জুরাইনের বাগানবাড়ির পুষ্পভিলা নামের একটি ভবনে এক যৌথ পরিবারের ১৭ সদস্যের মধ্যে ১৩ জন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন। এখন সবাই সুস্থ আছেন।

একই এলাকার রাহাত মঞ্জিল নামের একটি ভবনের নিচতলায় স্ত্রী–সন্তান ও মাকে নিয়ে বসবাস করেন ভাঙারি ব্যবসায়ী মো. হান্নান। গতকাল বুধবার বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, মো. হান্নান ও তাঁর সন্তান একটি মশারি টাঙিয়ে ভেতরে শুয়ে আছেন। আর মা রাশিদা বেগমকে আরেকটি কক্ষে মশার টাঙিয়ে শুইয়ে রাখা হয়েছে। সবাই ডেঙ্গু আক্রান্ত।

হান্নানের স্ত্রী শিরিন আক্তার বলেন, হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা করার সামথ্য তাঁদের নেই। তাই সবাইকে পরীক্ষার পর বাসায় নিয়ে এসেছেন।

পূর্ব জুরাইনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে এক দিনে সব উড়ন্ত মশা মেরে ফেলতে হবে। এ ক্ষেত্রে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম পরিচালনা করা যেতে পারে।
অধ্যাপক কবিরুল বাশার, কীটতত্ত্ববিদ

গতকাল বিকেলে পূর্ব জুরাইনে যাওয়ার পর সাংবাদিক এসেছে, এ খবরে অনেকেই বাসা থেকে বেরিয়ে আসেন। এ সময় অন্তত ৩৩ জনের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। এসব ব্যক্তি হয় নিজে, না হয় তাঁদের পরিবারের সদস্য ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন। প্রায় আড়াই ঘণ্টা ওই এলাকায় অবস্থানের সময় ছয়জনকে হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে বাসায় ফিরতে দেখা গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ফখরুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, পূর্ব জুরাইনের পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ, তা কেউ না এলে বুঝতে পারবে না।

গতকাল বেলা সোয়া দুইটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত পূর্ব জুরাইনের কমিশনার রোড ও বাগানবাড়ি এলাকার অন্তত ২৩টি বাড়ি পরিদর্শন করে প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেছে।

পূর্ব জুরাইন এলাকা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৫৩ নম্বর ওয়ার্ডে পড়েছে। ডেঙ্গু পরিস্থিতি খুব খারাপ অবস্থায় রয়েছে জানিয়ে ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মীর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর এলাকায় এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ৮ জন মারা গেছেন। পরিস্থিতি তিনি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছেন।

জানতে চাইলে দক্ষিণ সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফরিদ আহাম্মদ প্রথম আলোকে বলেন, পূর্ব জুরাইন এলাকার পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁরা অবগত। সেখানে মশার ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রম নিয়ে তাঁরা বিশেষ ব্যবস্থা নিচ্ছেন।

এ মাসের শুরুতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক গবেষণায় দক্ষিণ যাত্রাবাড়ী ও পূর্ব জুরাইনকে ডেঙ্গুর হটস্পট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।

কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার প্রথম আলোকে বলেন, পূর্ব জুরাইনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে এক দিনে সব উড়ন্ত মশা মেরে ফেলতে হবে। সিটি করপোরেশনকে দ্রুতই এ কাজ করতে হবে। তা না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাবে।

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন