একাত্তর টেলিভিশনের সহকারী প্রযোজক রিফাত সুলতানা গত বছরের ১৬ এপ্রিল সকালে মেয়ে হৃদিতাকে জন্ম দিয়ে বিকেলে মারা যান। রিফাতের স্বামী নাজমুলও একাত্তর টেলিভিশনের প্রযোজক। গত বছর করোনায় তিনি শুধু স্ত্রী নয়, মা (৩ মে) ও বাবাকেও (৬ মে) হারিয়েছেন।

default-image

নাজমুল ইসলাম জানালেন, রিফাত সুলতানা ১০ বছরের মতো একাত্তর টিভিতে কাজ করেছেন। তাঁর সহকর্মীরা রিফাতকে স্মরণ করে আজ কিছু আনুষ্ঠানিকতা করেছেন। তবে শুধু রিফাতের মৃত্যুদিনই তো নয়, একই সঙ্গে মেয়ের জন্মদিনও। মেয়ের তো কোনো দোষ নেই। তাই তাকে জন্মদিনের আনন্দ থেকে বঞ্চিত করা হবে না। কয়েক দিন পর স্বজনেরা মিলে মেয়ের জন্মদিন পালন করবেন।

রিফাত সুলতানার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে নাজমুল বললেন, ‘করোনায় বাবা, মা ও স্ত্রী—সবাইকে হারিয়েছি। সবার কাছে করোনা হয়তো স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। তবে করোনার ছোবল কী ছিল, যাঁরা স্বজন হারিয়েছেন, শুধু তাঁরাই জানেন। একসময় হয়তো পৃথিবীতে করোনা থাকবে না, কিন্তু স্বজন হারানোর কষ্ট তো আর কোনো কিছু দিয়ে পূরণ হবে না।’

এক মাসের কম সময়ে নাজমুল হারিয়েছিলেন পরিবারের তিনজন প্রিয় মানুষকে। কাছাকাছি সময়ে বাবা, মা আর স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে দৌড়াতে হয়েছে। নাজমুল বললেন, ‘মাকে স্ত্রীর মৃত্যুর খবর পর্যন্ত দিতে পারিনি। শুধু মেয়ের ছবি দেখিয়েছিলাম। মা আর বাবা একই হাসপাতালের আইসিইউতে পাশাপাশি বিছানায় ছিলেন। মা যেদিন মারা যান, সেদিন বাবার জ্ঞান ছিল না। তাই মা মারা গেছেন, এটা তিনি বুঝতে পারেননি। তারপর বাবাও চলে গেলেন।’

default-image

নাজমুল বললেন, মেয়েটা মায়ের আদর কাকে বলে, তা আলাদাভাবে বুঝতেই পারল না। জন্মের পর মাকে একদিকে আইসিইউতে নেওয়া হয়েছে, আর মেয়েকে আরেক হাসপাতালে পাঠাতে হয়েছে। রিফাত সুলতানা মারা যাওয়ার পর হৃদিতার হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরতে ১৮ দিন লেগেছিল। এখন নানি–খালারাই মেয়ের কাছে মায়ের মতো। আলাদা করে মায়ের স্পর্শ তো মেয়েটা বুঝতেই পারেনি।

হৃদিতা এবং সাড়ে তিন বছর বয়সী তার দুই যমজ ভাই ধ্রুব আর রুদ্র—এ তিনজনকেই সামলাতে হচ্ছে নাজমুল ইসলামকে। বললেন, ওদের মা থাকলে হয়তো ওদেরকে সামলানো অনেক সহজ হতো।

এ তিন সন্তানের নানা, নানি, খালারা বলতে গেলে নিজেদের সংসার ছেড়ে নাজমুল ইসলামের বাসায় থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। তাঁরা আছেন বলেই সংগ্রামটা কিছুটা সহজ হয়েছে। তিনটি শিশুসন্তানকে লালনপালন করা কষ্টের, যা বাবার পক্ষে সহজ হচ্ছে না।

নাজমুল বললেন, ‘ছেলেদের প্রথম জন্মদিন খুব ধুমধাম করে পালন করা হয়েছিল। দাদা–দাদি, নানা–নানি, মা–খালাসহ সবাই মিলে আনন্দ করেছেন। রিফাতের মেয়ের খুব শখ ছিল। এই মেয়েটা ছিল তাঁর খুব আদরের ধন। তাই রিফাত বেঁচে থাকলে মেয়ের জন্মদিনও সেভাবেই করত।’

default-image

কবরস্থানে দাঁড়িয়েই হৃদিতার নানি ও খালারা জানালেন তিন শিশুকে নিয়ে তাঁদের লড়াইয়ের কথা। সারা দিন কোনোভাবে পার হলেও রাতে তিনজনই সহজে ঘুমাতে চায় না। হয়তো তারা মাকে খোঁজে।

হৃদিতার নানি হাজেরা সিদ্দিকী বললেন, ‘ওর বয়স এক বছর হলেও হয়তো ও ঠিকই মায়ের আদর বুঝতে পারে বা মায়ের আদর চায়। আমি বুকে নিই, আমার মেয়েরা বুকে নিয়ে রাখে। কিন্তু তারপরও ঘুমাতে চায় না। মায়ের ছবির সামনে গিয়ে এইটুকুন মেয়ে হাত দিয়ে আয় আয় বলে মাকে ডাকতে থাকে। ছেলে দুটি বুঝতে পারে মা নেই। তারপরও আমার মেয়ে চাঁদনীর পেটের, বুকের মধ্যে গড়াগড়ি করে, বলতে থাকে আম্মুর বুকে মাম্মামের গন্ধ। ওরা ভাবে, একদিন ঘুম থেকে জেগে দেখবে, ওদের মাম্মাম চলে এসেছে।’

রাজধানীর বনশ্রীর বাসায় দেয়ালের ফ্রেমে ঝুলছে নাজমুল ও রিফাতের ছবি। বিছানায় বসে খেলতে খেলতেই যমজ দুই ভাই ডাকতে থাকে—মাম্মাম পাপা, মাম্মাম পাপা...। এখন এই ছবির সামনে গিয়ে হৃদিতাও মাকে ডাকতে থাকে। তখন পরিবারের সদস্যদের চোখের পানি ফেলা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না।

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন