পদচারী সেতু ও পাতালপথ ব্যবহার না করে রাস্তা পার হওয়ার চেষ্টা করায় ৩৩১ জন পথচারীকে জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উদ্যোগে গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর রূপসী বাংলা মোড় থেকে ফার্মগেট পুলিশ বক্স পর্যন্ত এ অভিযান চলে। সর্বনিম্ন ২০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানাও করা হয়। 
অভিযান চলাকালে পুলিশের ধরপাকড়ের কারণে বেশ বিশৃঙ্খলারও সৃষ্টি হয়েছে। রাসেল স্কয়ার থেকে পান্থপথ, মগবাজার থেকে বাংলামোটরসহ আশপাশের রাস্তায় যানজট ছড়িয়ে পড়ে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েন নগরবাসী।
২২ নভেম্বর সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসার কথা ঘোষণা দিয়েছিল ডিএমপি। প্রাথমিকভাবে ২২ থেকে ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত রূপসী বাংলা মোড় থেকে ফার্মগেট পুলিশ বক্স পর্যন্ত সড়কে পদচারি সেতু (ফুটওভারব্রিজ) ও পাতাল পথ (আন্ডারপাস) ব্যবহারে প্রচার চালানো হয়। গতকাল সকাল আটটা থেকে বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত সক্রিয় ছিলেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
ঢাকা জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল কুদ্দুস ও সারওয়ার আলম আদালত পরিচালনা করেন। বাংলামোটর মোড়ের পুলিশ বক্সে এবং সোনারগাঁও মোড় ও ফার্মগেট পুলিশ বক্সের কাছে এই আদালত পরিচালনা করেন দুই ম্যাজিস্ট্রেট। ডিএমপির প্রায় ২০০ পুলিশ সদস্যও এতে অংশ নেন। মোড়ে মোড়ে ছিল প্রিজন ভ্যান।
দুই ম্যাজিস্ট্রেট জানান, দণ্ডবিধির ২৯০ ধারা অনুযায়ী ৩৩১ জন পথচারীকে মোট ২৪ হাজার ৯৫ টাকা জরিমানা করা হয়। এঁদের মধ্যে ১৮ জন নারীও আছেন। ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান থাকলেও গতকাল তা কারও ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়নি।
দণ্ডবিধির ২৯০ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি সর্বসাধারণের জন্য আপদ সৃষ্টিকারী এমন কোনো কাজ করেন, যার শাস্তির জন্য অত্র বিধিতে অন্য কোনো বিধান করা হয়নি। তাহলে সেই ব্যক্তি ২০০ টাকা পর্যন্ত যেকোনো পরিমাণ জরিমানা দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
বেলা ১১টার দিকে বাংলামোটর পুলিশ বক্সের পাশে মাইকে চলছিল প্রচারণা। কেউ রাস্তা পার হতে গেলেই হাত ধরে একে একে পথচারীদের আদালতের সামনে নিয়ে আসছিল পুলিশ। একসময় পথচারীদের ভিড় বেড়ে যায়। ছানাউল্লাহ নামের এক যুবক তখন পুলিশকে বলছিলেন, ‘ভাই, আমার চাকরি চলে যাবে, জরিমানা নেন, ছাইড়া দেন।’
রামকৃষ্ণ দাশ ও নূরে আলম নামের দুই যুবক বলেন, ‘রূপসী বাংলা হোটেলের সামনে তো কোনো ওভারব্রিজ নাই। রাস্তা পার হওয়ার সময় পুলিশ ধরে ফেলে। জরুরি কাজ থাকার পরও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে পারছি না।’
হলি ফ্যামিলিতে চিকিৎসাধীন মাকে দেখে মিরপুরের বাসায় ফেরার পথে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছেন মুক্তা আক্তার মোর্শেদা। তাঁর সঙ্গে আনা হয় মেডিকেলে ভর্তি-ইচ্ছুক আইরিন আক্তার ও তাঁর বাবা আবদুল জলিলকে। এগিয়ে গিয়ে জলিল ম্যাজিস্ট্রেটকে বলেন, ‘স্যার, বরিশাল থেইকা মেয়েরে মেডিকেলে ভর্তির জন্য আনছি। ঢাকায় যে এ নিয়ম চালু হইছে জানতাম না।’ ম্যাজিস্ট্রেট পদচারি সেতু ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে সবাইকে চলে যেতে বলেন।
ম্যাজিস্ট্রেটকে নিজের ছেঁড়া ব্যাগটি দেখিয়ে সেকান্দর নামের এক যুবক বলছিলেন, ‘স্যার, গরিব মানুষ। টাকা নাই।’ ম্যাজিস্ট্রেট তাঁকে ২০ টাকা দিতে বলেন। আরেক যুবক মানিব্যাগ বের করে দেখিয়ে বললেন, ‘স্যার, মাত্র ৩০ টাকা আছে।’ ম্যাজিস্ট্রেট তাঁকে দোষ স্বীকার করে চলে যেতে বলেন।
আদালতের সামনে ধরে আনা হয়েছে প্রায় ৬০ বছর বয়সী তিনজনকে। তাঁরা তিনজনই মুক্তিযোদ্ধা বলে জানালেন। হরিরামপুর থেকে ঢাকায় এক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের কাছে এসেছিলেন। দেখা করে ফেরার জন্য বাংলামোটরে বাস খোঁজার সময় পুলিশ তাঁদের ধরে ফেলে।
তবে পদচারি সেতু ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়ার পর কয়েকজন যুবক ম্যাজিস্ট্রেটকে বলেন, ফুটপাতে অনেক দোকানপাট, হাঁটা যায় না। অনেক সেতুর পাশে দোকানপাট থাকায় ওঠাও যায় না। এ ছাড়া রাস্তায় পুলিশ চাঁদাবাজি করে। সবকিছুই বন্ধ করতে হবে।
দুপুর পৌনে ১২টার দিকে রূপসী বাংলা মোড়ে গিয়ে দেখা যায়, পথচারীদের যত্রতত্র রাস্তা পারাপারে বাধা দিচ্ছে পুলিশ। নিয়মের বাইরে পার হলেই ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আদালতের সামনে।
সকাল সোয়া ১০টার দিকে সোনারগাঁও মোড়ে জাকির নামের এক যুবককে ধরে আনা হয় আদালতের সামনে। পুলিশের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করায় ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম তাঁকে প্রিজন ভ্যানে তুলতে বলেন। পুলিশ হাতকড়া পরিয়ে তাঁকে প্রিজন ভ্যানে বসিয়ে রাখে। প্রায় আধঘণ্টা পর ২০০ টাকা জরিমানা করে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
দুপুর পৌনে একটার দিকে কারওয়ান বাজার এলাকায় অভিযান দেখতে আসেন পুলিশ কমিশনার বেনজীর আহমেদ। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই মানুষ নিজ দায়িত্বে আইন মেনে রাস্তা পার হোক। মানুষ যদি রাস্তায় না হেঁটে ফুটপাতে হাঁটে তাহলে সেখানে আর হকার বসতে পারে না। তাই মানুষের উচিত ফুটপাত দিয়ে হাঁটা।’
বেলা তিনটার দিকে ফার্মগেট পুলিশ বক্সে ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার বেশ কয়েকজন পথচারীকে জরিমানা করেন। চারটার দিকে ফার্মগেট এলাকায় একটি বাস থেকে নেমেই হাঁটা শুরু করে দেন কয়েকজন যাত্রী। পুলিশ একজনকে ধরে নিয়ে যায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের সামনে। তখন এক পুলিশ কর্মকর্তা ওই যুবককে ধমক দিয়ে বলেন, ‘এভাবে রাস্তা পার হবা না, যাও।’
যানজট, গ্রাম থেকে আসা বিভিন্ন ব্যক্তির অভিজ্ঞতাসহ বিভিন্ন ক্ষোভের বিষয়ে জানতে চাইলে ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার বলেন, ‘প্রথম দিনের সফলতা ও ব্যর্থতা নিয়ে আমরা বৈঠকে বসব। যদি কোনো সমস্যা থাকে তাহলে পরবর্তী সময়ে তা শোধরানো হবে।’ আরও অন্তত সাত দিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত এ অভিযান চলবে। ধীরে ধীরে রাজধানীর অন্যান্য জায়গায়ও অভিযান শুরু হবে—জানালেন ম্যাজিস্ট্রেট।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0