বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

২০১৬ সালে ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা মিতালিকে রেখে চলে যান তাঁর স্বামী। এখন সেই ছেলের বয়স পাঁচ বছর হতে চলেছে। মা ও ছেলে বলতে গেলে যুদ্ধ করে টিকে আছে এই শহরে। তবে ফুটপাতে বসেই এই মা স্বপ্ন দেখছেন, ছেলেকে ‘অফিসার’ বানাবেন। তবে এ স্বপ্নের কথা বলে নিজেই আবার বললেন, ছেলেকে অফিসার বানাতে তো অনেক টাকার দরকার। ফুটপাতে বসে মানুষের ওজন মেপে মিতালিকে কোনো দিন ২০০ টাকা আবার কোনো দিন ৫০ টাকা নিয়ে ঘরে ফিরতে হয়।

ছেলের লেখার স্লেট, বাংলা-ইংরেজিসহ বিভিন্ন বই রাখার জন্য কাপড়ের ব্যাগ, ছোট পানির বোতল, একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকা আর ওজন মাপার মেশিন—এই নিয়েই মিতালি ও তাঁর ছেলের সংসার।

মিতালি এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলেন। তবে ফলাফল জানার আর সুযোগ পাননি বলে জানালেন। বাবা মারা গেছেন ১৯৯৯ সালে। মা ও দুই বোন আছেন, তবে তাঁদের সঙ্গে তেমন যোগাযোগ নেই।

মিতালির স্বামীও ওজন মাপার কাজ করতেন। তিনি চলে যাওয়ার পর মিতালি একটি বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ নেন। কাজ করে টাকা জমান। এরই মধ্যে সন্তানের জন্ম দেন। তবে এ জন্য তাঁকে অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। হাসপাতালের বিল পরিশোধ করেন সেই জমানো টাকায়। অস্ত্রোপচারের পর ছোট বাচ্চাকে নিয়ে মিতালি আগের মতো কাজ করতে পারছিলেন না। তাই মাত্র ৪৪ দিন বয়সী ছেলেকে নিয়ে গৃহকর্মীর কাজটি হারান। পরে পরিচিত একজনের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন সাজেদা ফাউন্ডেশনের খোঁজ পান। এই ফাউন্ডেশনেরই একটি সেন্টারে রাতে ছেলেকে নিয়ে থাকার সুযোগ পান মিতালি। ছেলেকে ছয় মাস বয়স থেকেই ফাউন্ডেশনের পশ্চিম তেজতুরী বাজারের শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে রাখেন মিতালি। কিন্তু করোনার সংক্রমণ শুরুর পর থেকে কেন্দ্রটি বন্ধ আছে। তবে কেন্দ্র থেকে এখনো দুপুরের খাবার দেওয়া হয়। তাই ছেলের দুপুরের খাবারের জন্য তাঁকে চিন্তা করতে হয় না। শীতের কাপড়সহ অন্যান্য সহায়তাও পাচ্ছেন।

default-image

মিতালি কারও কাছে হাত পাততে চান না। তাঁকে ও তাঁর ছেলেকে দেখে অনেকেই বিভিন্নভাবে সহায়তা করার জন্য এগিয়ে এসেছেন বলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন মিতালি। বললেন, ব্র্যাক ব্যাংকে চাকরি করা একজন তাঁকে ওজন মাপার মেশিনটি কিনে দিয়েছেন। শাহনাজ বেগম নামের এক নারী তাঁর নিজের বাসার ছাদে ছোট একটি ঘর করে তাঁকে ছেলেসহ থাকতে দিয়েছেন। সেই ঘরের কোনো ভাড়া দিতে হচ্ছে না গত প্রায় পাঁচ বছর ধরে।

ছেলের লেখার স্লেট, বাংলা-ইংরেজিসহ বিভিন্ন বই রাখার জন্য কাপড়ের ব্যাগ, ছোট পানির বোতল, একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকা আর ওজন মাপার মেশিন—এই নিয়েই মিতালি ও তাঁর ছেলের সংসার। সকাল ১০টা বা বেলা ১১টার দিকে মিতালি ফুটপাতে বসেন। দুপুরে সাজেদা ফাউন্ডেশন থেকে খাবার নিয়ে ঘরে ফেরেন। ছেলে ও নিজের গোসল–খাওয়া শেষ করে আবার ফুটপাতে বসেন। রাত ১১টার দিকে ছেলেকে নিয়ে পশ্চিম তেজতুরী বাজারের ঘরে ফেরেন।

মিতালি জানান, সাজেদা ফাউন্ডেশনের শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র খুললে সেখানে ছেলে ছয় বছর বয়স পর্যন্ত থাকার সুযোগ পাবে। তারপর ছেলেকে কোথায় রাখবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা শুরু হচ্ছে। ফুটপাতে বসে ছেলেকে এখন নিজেই পড়াচ্ছেন। কিন্তু ছেলেকে তো স্কুলে ভর্তি করতে হবে, তা নিয়েও চিন্তা তাঁর।

স্বামী চলে যাওয়ার পর আর দ্বিতীয় বিয়ে করার চেষ্টা করেননি জানিয়ে মিতালি বলেন, প্রথম স্বামীই ছেড়ে চলে গেছেন, দ্বিতীয় স্বামী তাঁর পাশে থাকবেন, সে নিশ্চয়তা তো নেই। মা ও ছেলে যেমন আছেন, তাতেই খুশি মিতালি। কারও বিরুদ্ধে রাগ, অভিমান বা অভিযোগ নেই। বললেন,‘ছেলে হওনের পর থেকে আমার ভাগ্য খুলছে।’ প্রথম দিকে ফুটপাতে বসে ওজন মাপার কাজ করলে আশপাশের অনেকেই বাজে মন্তব্য করতেন। এখন আর তেমন শুনতে হয় না।

কথা শেষে মা ও ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকা মিতালি বললেন,‘ভবিষ্যতে কী আছে কপালে, তা তো জানি না।’

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন