default-image

বাংলা একাডেমি বাঙালি জাতিসত্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের অনন্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ যত দিন থাকবে, এই প্রতিষ্ঠানও তত দিন গৌরবের সঙ্গে তার ভূমিকা পালন করে যাবে। আজ বৃহস্পতিবার প্রতিষ্ঠানটির ৬৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনায় বক্তারা এই মূল্যায়ন করেন।

সকালে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছিল জাতীয় পতাকা এবং একাডেমির পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে। এরপর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এবং একাডেমির স্বপ্নদ্রষ্টা জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সমাধিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করা হয়। একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান ও মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজীসহ একাডেমির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এতে অংশ নেন। পরে বেলা ১১টায় একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে ছিল প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বক্তৃতা।

এবার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বক্তৃতার শিরোনাম ছিল ‘সবার আগে সংস্কৃতি সবার সঙ্গে সংস্কৃতি’। বক্তৃতা দেন রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ। সভাপতিত্ব করেন একাডেমির সভাপতি শামসুজ্জামান খান।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই ভাষাশহীদসহ সব শহীদ এবং করোনায় যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন এবং একাডেমির সঙ্গে যাঁরা নানাভাবে যুক্ত ছিলেন, সেই প্রয়াতদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

বিজ্ঞাপন

স্বাগত বক্তব্যে একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী বলেন, সাধারণত আনন্দ–উৎসবের মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্‌যাপিত হয়ে থাকে। কিন্তু এবার করোনার অতিমারি পরিস্থিতির কারণে আয়োজন সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশ এবং সুরক্ষায় একটি প্রতিষ্ঠানের স্বপ্ন দেখেছিলেন। বাংলা একাডেমির কার্যক্রম এখন নানা ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়েছে।

সংস্কৃতি ও জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। একই সঙ্গে একটি মানবিক প্রতিষ্ঠান হিসেবেও বাংলা একাডেমি তার নানামুখী কার্যক্রমের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

দীর্ঘ মূল প্রবন্ধে সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ প্রথমে সংস্কৃতির সংজ্ঞা, ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে জাতিসংঘের এ–বিষয়ক সংস্থা ইউনেসকোর উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করেন।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংস্কৃতি নিয়ে সবার দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়। গত শতকের সত্তরের দশকে কানাডায় ইউনেসকোর সংস্কৃতিবিষয়ক সভায় বিশেষজ্ঞরা যে মত দিয়েছেন, তাতে সংস্কৃতিতে জাতীয় মূল্যবোধ ও জনগণের একাত্মতা অনুভব করার বিষয়টির প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

default-image

পরের ধাপে তিনি আলোচনা করেন সংস্কৃতি এবং উপমহাদেশের ইতিহাস ও রাজনীতি নিয়ে। এ প্রসঙ্গে প্রাবন্ধিক বলেন, বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে সংস্কৃতির প্রভাব সুদূরপ্রসারী। প্রাচীন যুগের বঙ্গ-বরেন্দ্র-হরিকেল-চন্দ্রদ্বীপ-পুণ্ড্র, সমতট-রাঢ় প্রভৃতি জনপদের আগল ভেঙে যে সমন্বিত বাঙালি জাতি গড়ে উঠেছিল, তার বন্ধনসূত্র ছিল সংস্কৃতি।

এ পর্যায়ে তিনি দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগ, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাঙালি জাতিসত্তার উন্মেষ, রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষে পশ্চিম পাকিস্তানিদের বাধা, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ১৯৬৬ সালের বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান হয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধ। এই দীর্ঘ রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে বাঙালি সংস্কৃতির চেতনা এবং শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের বিষয়টি তুলে ধরেন।

পরিশেষে তিনি বলেন, বাঙালির সংস্কৃতি জীবনের সর্বক্ষেত্রে বিস্তৃত—অর্থনীতি, রাজনীতি, কূটনীতি, সমাজ, ধর্ম। এর যা কিছু বাঙালি সংস্কৃতির প্রতিকূল, তার স্থান এখানে হবে না।

সভাপতির বক্তব্যে শামসুজ্জামান খান প্রবন্ধের ওপর আলোকপাত করে বলেন, সংস্কৃতির প্রধান বৈশিষ্ট্য এর গতিশীলতা। সে কারণে তা কখনো থেমে যাবে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জীবনযাত্রায় অনেক নতুন বিষয় যুক্ত হবে, সংস্কৃতির সংজ্ঞাও বদলে যাবে।আর এর ভেতর দিয়েই তা নান্দনিক হয়ে উঠবে।


একাডেমির ভূমিকা ও কার্যক্রম সম্পর্কে সভাপতি বলেন, ‘বাংলা একাডেমি বাঙালি জাতিসত্তাকে এক উচ্চতম জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে। আমাদের দর্শন, সাহিত্য, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে এই প্রতিষ্ঠান সমগ্র বাংলাদেশ ও বাঙালির সঙ্গে একাত্ম হয়ে আছে।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন