default-image

বইমেলা উপলক্ষে আপনাদের নতুন কোনো সংখ্যা এসেছে? বিক্রয়কর্মী মলিন মুখে জানালেন, ‘না।’ তাঁর মলিন মুখ যতটা নতুন সংখ্যা না আসার জন্য, তার চেয়েও বেশি সারা দিনে একটি কপিও বিক্রি না হওয়ার জন্য। পাশেই পরান কথার স্টল। মেলা উপলক্ষে এসেছে তাদের গল্পসংখ্যা। বিক্রি সারা দিনে মোটে তিন-চারটি কপি।

দুই দিন বইমেলায় লিটল ম্যাগাজিন বা সাহিত্যের ছোটকাগজ চত্বরে ঘুরে, নানাজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল এমন তথ্য।

লিটল ম্যাগাজিনের প্রকাশক ও সম্পাদকদের মতে, এবার বিক্রি তেমন না হওয়ার প্রধান কারণ করোনা সংক্রমণ। প্রকৃত ক্রেতা ও পাঠকদের মেলায় না আসা। সাধারণত তাঁরা একটি সংখ্যা বিক্রি করে সেই খরচ দিয়েই পরবর্তী সংখ্যার কাজ করেন। কিন্তু এবারের মেলা তাঁদের আশাহত করেছে।

এরপরও বিক্রি নিয়ে প্রকাশক-সম্পাদকদের মধ্যে আছে দুই মত। এক পক্ষের কথা, লিটল ম্যাগাজিনের ক্রেতা নির্দিষ্ট। এটা মুড়িমুড়কির মতো বিক্রি হবে না ধরে নিয়েই তারা মেলায় আসে। অন্য পক্ষের ভাষ্য, নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে সাহিত্য পত্রিকা বের করার দিন শেষ। তাই লিটল ম্যাগাজিনে কিছু বিজ্ঞাপন থাকা দোষের নয়। লেখকদের সম্মানীও তারা দিতে চায়। এদের কারও কারও নিজেদের ‘বাণিজ্যিক সাহিত্য পত্রিকা’ বলতেও আপত্তি নেই।

কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন মনে করেন, লিটল ম্যাগাজিনগুলো সাহিত্যের বড় জায়গা। যেভাবে হোক, এই ধারা সচল থাকতে হবে।
বিজ্ঞাপন

দেড় দশক ধরে লিটল ম্যাগাজিন চত্বর ছিল বাংলা একাডেমির বহেড়াতলায়। বিশাল বৃক্ষটি ঘিরে বেশ জমে উঠত কবি-লেখকদের বিকেল-সন্ধ্যার আড্ডা। প্রথা ভেঙে দুই বছর ধরে লিটল ম্যাগাজিন চত্বর চলে এসেছে মেলার মূল অংশ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। গত বছর এ চত্বরের জায়গা করে দেওয়া হয়েছিল উন্মুক্ত মঞ্চের পার্শ্ববর্তী স্থানে। এবার জায়গা বদলে স্থান দেওয়া হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পূর্ব পাশে, রমনা কালীমন্দিরের পেছনে, যে জায়গাটিকে ‘বিচ্ছিন্ন স্থান’ হিসেবে উল্লেখ করেন প্রকাশক-সম্পাদকেরা। পরে আন্দোলনের মুখে আগের জায়গায় ফিরে আসে লিটল ম্যাগাজিন চত্বর।

শিল্প-সাহিত্য এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান বিষয়ে চলমান ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে ব্যতিক্রমধর্মী চিন্তাধারা ও মতামত ব্যক্ত করার বাহন লিটল ম্যাগাজিন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে এ ধরনের ম্যাগাজিনের যাত্রা শুরু উনিশ শতকের প্রথম দিকে। বাংলায় লিটল ম্যাগাজিনের আবির্ভাব প্রমথ চৌধুরী সম্পাদিত সবুজপত্র (১৯১৪) পত্রিকার মধ্য দিয়ে। বাংলাপিডিয়া বলছে, ষাটের দশকে লিটল ম্যাগাজিনগুলো ঘিরে যে সাহিত্য আন্দোলন শুরু হয়, সে ধারা স্বাধীনতার পর অব্যাহত থাকেনি। সাহিত্য ও সংস্কৃতি আন্দোলনের কর্মীদের অনেকের ভাষ্য, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু কিছু লিটল ম্যাগাজিন নানা কারণে বিতর্কিত হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, এ বছর বইমেলায় ১৩৬টি লিটল ম্যাগাজিন স্টল দিয়েছে। উল্লেখযোগ্য ম্যাগাজিনের মধ্যে রয়েছে শালুক, লোক, দ্রষ্টব্য, করাত কল, হালখাতা, বুনন, চৈতন্য, দেশ, ভিন্ন চোখ, পরান কথা, কালের ধ্বনি, স্বপ্ন ৭১, ভ্রমণ গদ্য, শিং, আনর্ত। এগুলোর মধ্যে মেলা উপলক্ষে পরান কথা এনেছে তাদের নতুন গল্পসংখ্যা। এ ছাড়া করোনাকালের গল্প, করোনাকালের কবিতা নিয়ে দুটো আলাদা বই করেছে তারা। লোক-এর স্টলেও দেখা গেল তাদের ‘২০ বছর পূর্তি সংখ্যা’। স্বপ্ন’ ৭১-এর স্টলে আছে মুক্তিযুদ্ধে রেডিও নিয়ে বিশেষ সংখ্যা। ভ্রমণ গদ্যর স্টলে এসেছে মাহমুদ হাফিজ সম্পাদিত তাদের নতুন সংখ্যা।

এসব সংখ্যা খুব সামান্য বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু তাতে খরচ সিকি ভাগও উঠছে না, বললেন কালের ধ্বনি সম্পাদক ইমরান মাহফুজ। ১১ বছর ধরে সংখ্যাটি বের করছেন তিনি। আরও বললেন, ‘প্রতিটি স্টল থেকে বাংলা একাডেমি ভাড়া নিয়েছে ৫০০ টাকা। আর লোগো করার জন্য নেওয়া হয়েছে ২৩০ টাকা। আমাদের এর বেশি দেওয়ার ক্ষমতা ছিল না। এর বাইরে একজন স্টাফ রাখলেও তাঁর মাসে বেতন ন্যূনপক্ষে ছয় হাজার টাকা। এ জন্য অনেকেই বাংলা একাডেমিকে টাকা জমা দিয়েও স্টল দিতে পারেননি, বিশেষ করে ঢাকার বাইরের সম্পাদক-প্রকাশকেরা, করোনা পরিস্থিতির কারণে।

ইমরান মাহফুজের মতে, লিটল ম্যাগাজিন কোনো ব্যবসার জায়গা নয়। এটা একটা আন্দোলন। তাই এবার যে পরিস্থিতি, তাতে বিক্রি আর মূল উদ্দেশ্য নয়, অংশগ্রহণ বা উপস্থিতিই মূল কথা।

লিটল ম্যাগাজিনের প্রকাশকদের মধ্যে অনেকেই আছেন, যাঁরা পরবর্তী সময়ে প্রকাশনা সংস্থা গড়ে তোলেন। এ রকম একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাশরিক-ই-হাবিব। পরান কথার এই সম্পাদক-প্রকাশক বলেন, ২০১৯ সাল থেকে তিনি একই নামে প্রকাশনা সংস্থা গড়ে তুলে বই প্রকাশ করে আসছেন। এ বছর মেলায় তিনি ১৫টি বই প্রকাশ করেছেন। কিন্তু বেচাবিক্রি কম। ইদানীং পাঠকদের অনেকেরই লিটল ম্যাগাজিন সম্পর্কে ধারণা নেই। বই ও সাময়িকী মিলে প্রতিদিন গড়ে তাঁর মাত্র পাঁচটি কপি বিক্রি হয়।

বিজ্ঞাপন

সিলেটের ছোট কাগজ বুনন। এ বছরের জানুয়ারিতে তাদের বেরিয়েছে ৬৪২ পৃষ্ঠার প্রবন্ধসংখ্যা। মেলায় এই সংখ্যাসহ অন্যান্য সংখ্যা নিয়ে এসেছেন সম্পাদক খালেদ উদ-দীন। প্রথম চার-পাঁচ দিন মেলায় থেকে তিনি সিলেটে চলে যান। রোববার রাতে টেলিফোনে খালেদ উদ-দীন প্রথম আলোকে বলছিলেন, সবার ক্ষেত্রে এ কথাই প্রযোজ্য যে এ বছর মেলায় বিক্রি নেই। গত বছর যা বিক্রি ছিল, এর ১০ ভাগের ১ ভাগও এবার নেই। করোনার ভয়ে মেলায় ক্রেতা বা পাঠক আসেননি। তাঁর মতে, এভাবে মেলা চালিয়ে যাওয়া অনুচিত।

মেলায় দেখা গেছে, বেচাবিক্রি না থাকায় বিকেলবেলা লিটল ম্যাগাজিনের লেখক-সম্পাদকেরা সামনের খোলা জায়গায় চেয়ার পেতে আড্ডা দিচ্ছেন। পাশাপাশি চলে তবলা বাজিয়ে গানবাজনা। তবে লকডাউনের প্রথম দিন সোমবার কোনো গানবাজনা হয়নি।
এবারের মেলায় লিটল ম্যাগাজিনগুলোর সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, লিটল ম্যাগাজিনগুলো সাহিত্যের বাঁকবদলের দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখে, নতুন লেখকদের লেখা মূল্যায়ন করে। যারা ভালো লেখে, তাদের এগিয়ে নেয়। তাই যেকোনোভাবে হোক, সাহিত্য-সংস্কৃতির এই বিশেষ ধারা সচল থাকতে হবে। লিটল ম্যাগাজিনগুলো যদি আবেদন করে, বাংলা একাডেমি বা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় তাদের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার কথা ভাবতে পারে।

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন