default-image

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উত্তর দিকের গাছে গাছে ঝুলছে বইয়ের ডিজিটাল পোস্টার। কোনো কোনোটিতে প্রচ্ছদের পাশে লেখকের ছবি। উদ্যানের প্রবেশমুখে চেনা জটলা। পরস্পরে করবন্দী তরুণ যুগল, নবীন দম্পতি। নারীদের মাথায় ফুলের রিং। শিশুর হাতে রঙিন বেলুন। স্রোতের মতো প্রবেশ করছে সবাই ফটক পেরিয়ে উদ্যানে। তাদের মাথার ওপর দিয়ে কাগজের পাখি উড়িয়ে দিচ্ছেন বিক্রেতারা। ডানা ঝাপটা দিয়ে চক্কর দিচ্ছে সেগুলো। বাঁশির প্যাঁ-পোঁ, ঢোল-ডুগডুগির বাদ্য, মাইকে নতুন বইয়ের ঘোষণা। মেলায় যেমন আনন্দঘন সরগরম পরিবেশ মানায়, তেমনই ছিল গতকাল শনিবার অমর একুশে গ্রন্থমেলা। অন্তত এই একটি জায়গা, যেখানে দৃশ্যত দেশের চলমান বৈরী পরিস্থিতির ছাপ পড়েনি।
মেলার ঝাঁপ খুলেছিল সকালেই। শিশু প্রহরের ছিল শেষ দিন। দিনের প্রথমার্ধে মেলার দখল ছিল তাদেরই। মঞ্চে সাধারণ জ্ঞানের বক্তৃতা প্রতিযোগিতা। তার পর থেকে ঘুরে ঘুরে বই কেনা। তবে বারণ ছিল না বড়দের আসতেও। জুটি বেঁধে এসেছিলেন তাঁরা। পশ্চিমা ঘরানার ভালোবাসা দিবস অধুনা এ দেশেও জনপ্রিয়। সেই দিবস ছিল গতকাল। বসন্তের পোশাক হলুদ, ভালোবাসায় লাল। সুবেশ নর-নারীর পোশাকের রক্তিম ছটা রাঙিয়ে তুলেছিল দৃশ্যপট। অনেক মানুষের চলাচল। তাঁদের পদাঘাতে ওড়া রুক্ষ ধুলায় ধূসর হলো ভালোবাসার বিকেল। তাই নিয়ে নাসিকাকুঞ্চিত বিরক্তি গ্রন্থানুরাগীদের। প্রকাশকেরা জানালেন, সকালে একবার পানি ছিটানো হলেও বিকেলে এদিন মাঠে পানি না দেওয়ায় এই ধুলার পরাক্রম।
ঢাকা শহর এবং এর নিকটবর্তী এলাকার মানুষ মেলায় এলেও দেশের প্রান্তবর্তী গ্রন্থানুরাগীরা মেলায় আসতে পারছেন না অবরোধের কারণে—প্রকাশকেরা এই মন্তব্য করলেন। বিদ্যাপ্রকাশের মজিবুর রহমান, ঐতিহ্যর আমজাদ হোসেনসহ আরও অনেকে বললেন, এই মেলায় একটি বড় অংশের ক্রেতা আসেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে। এ ছাড়া আঞ্চলিক পাঠাগার বা স্কুল-কলেজের পাঠাগারের জন্যই মেলা থেকে বই কিনতে আসেন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা। এসব প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতার কাছে বেশ মোটা অঙ্কের বই বিক্রি হয় প্রতিবছর। এবার তা হচ্ছে না। মেলায় এটি একটি বড় ঘাটতির দিক। তবে মোটের ওপর বিক্রি মন্দ নয়।
গত বছর থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রধান প্রকাশকদের এবং একাডেমির মাঠে শিশুতোষ বই ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রকাশনার স্টল নিয়ে দুটি অংশে মেলা হচ্ছে। উদ্যানে এবার পরিসর অনেক বড় বলে পরিবেশ বেশ স্বস্তিকর। স্টলগুলো বড় হয়েছে। প্যাভিলিয়ন তৈরি করায় এত দিনের টিনের ছাপরার তলায় চাপাপড়া বস্তির মতো ঘিঞ্জি চেহারা ঘুচে গিয়ে নান্দনিক হয়ে উঠেছে পরিবেশ। পাঠক, লেখক, প্রকাশক সবারই আশা—দিনে দিনে আরও খোলতাই হবে, সুন্দর হয়ে উঠবে আরও। মেলার একাডেমি অংশেও কাল লোকসমাগম ছিল বিপুল। তবে পূর্ব-পশ্চিমে পথের দুই পাশে দুই অংশে যাতায়াত নিয়ে অসুবিধার সঙ্গে খানিকটা ভোগান্তি তো রয়েছেই। ভবিষ্যতে হয়তো পাঠকের অভ্যস্ততা বাড়বে, তবে উদ্যানের অংশে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত পাঠকের বসার জন্য বেঞ্চ বা এ ধরনের কোনো ব্যবস্থার কথা ভাবা যেতে পারে।
নতুন বই: গতকাল মেলায় তথ্যকেন্দ্রের তালিকা অনুযায়ী নতুন বই এসেছে ১৪৭টি। প্রথমা প্রকাশন থেকে এসেছে মশিউল আলমের উপন্যাস দ্বিতীয় খুনের কাহিনি। প্রথমার বিক্রয় প্রতিনিধি জানালেন, প্রথমার এবারের বইগুলোর মধ্যে চলছে এবিএম মূসার স্মৃতিকথা আমার বেলা যে যায়, মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের প্রবন্ধ নাগরিকদের জানা ভালো, আনিসুল হকের উপন্যাস বিক্ষোভের দিনগুলিতে প্রেম, হরিশংকর জলদাসের এখন তুমি কেমন আছ। পাঠক সমাবেশ থেকে গতকাল এসেছে মাসরুর আরেফিন অনূদিত হোমারের ইলিয়াড, বিভাস থেকে নির্মলেন্দু গুেণের আত্মস্মৃতি গিনসবার্গের সঙ্গে, ঐতিহ্য থেকে বুলবুল সরওয়ার অনূদিত বোধে ও বেদনায় মীর তকী মীর, মাওলা ব্রাদার্স থেকে আনু মুহাম্মদের প্রবন্ধ ঈশ্বর পুঁজি ও মানুষ, দন্ত্যস রওশনের কিশোর উপন্যাস এলিয়েন পরিবার, শোভা থেকে সাইফুল আহসান বুলবুলের আদিবাসীবিষয়ক বাংলাদেশের সমতল ভূমির নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী, চন্দ্রদ্বীপ থেকে মঞ্জু সরকারের গল্প ছদ্মবেশী ভূত, আগামী থেকে ফারুক ওয়াসিফের কবিতা জল জবা জয়তুন ইত্যাদি।
মেলার মেয়াদ এখনো মাসের আধাআধি। দেশের পরিস্থিতি যা-ই হোক, শেষার্ধের দিনগুলো আড্ডায় বেচাকেনায় প্রাণস্পন্দিত থাকবে পরিবেশ—এমনই প্রত্যাশা সবার।

বিজ্ঞাপন
রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন