বিশেষ প্রণোদনা চাই ক্ষুদ্র জাতিসত্তার

বিজ্ঞাপন
default-image

করোনা সংকটে কাজ হারিয়ে নিজ এলাকায় ফিরে গেছেন পার্বত্য অঞ্চলের চাকমা, মারমা ও সমতলের গারো, সাঁওতালসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার কয়েক হাজার মানুষ। কৃষি ও দৈনিক পারিশ্রমিকের কাজের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের জীবনেও নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন। সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত কোনো উদ্যোগ না নেওয়া হলে প্রান্তিক এসব মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।

গতকাল শনিবার ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস: করোনাকালে জাতীয় উন্নয়নে অন্তর্ভুক্তি’ শীর্ষক ভার্চ্যুয়াল গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। বৈঠকটির আয়োজন করে প্রথম আলো ও অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি)। আজ ৯ আগস্ট জাতিসংঘ ঘোষিত ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস’। দিবসটি উপলক্ষে এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়।

আদিবাসীবিষয়ক সংসদীয় ককাসের আহ্বায়ক সাংসদ ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা কোনো মন্ত্রণালয়ের অধীনে নয়। জাতীয় বাজেটে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় কিছু বরাদ্দ পেলেও তারা কোনো বরাদ্দই পায় না। সমতলের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় করতে হবেই।

ফজলে হোসেন বলেন, সংকটের সময় এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভূমি দখলের অপতৎপরতা চলে। করোনা সংকটের সময়েও তাদের জমি জোরপূর্বক দখল করা হচ্ছে। একদিকে তারা ত্রাণ পাচ্ছে না, চিকিৎসা পাচ্ছে না, উল্টো মামলা দিয়ে ভূমি থেকে উৎখাতের চেষ্টা করা হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশনকে সক্রিয় করতে হবে। সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জন্য ভূমি কমিশন গঠন করতে হবে।

বিশিষ্ট গবেষক ও লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষ এমনিতেই নানা সমস্যায় জর্জরিত। করোনার কারণে তারা নতুন করে সমস্যায় পড়েছে। তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার প্রয়োজন রয়েছে। পার্বত্য চুক্তির যে ধারাগুলো বাস্তবায়িত হয়নি, সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। রাষ্ট্রের উচিত চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ার কারণগুলো জাতির সামনে তুলে ধরা।

মানবাধিকারকর্মী রানী য়েন য়েন বলেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অঙ্গীকার অনুযায়ী, যারা সবচেয়ে পিছিয়ে, তাদের বেশি গুরুত্ব দিয়ে কাজ হওয়ার কথা। কিন্তু সেটি হচ্ছে না। পাহাড় ও সমতলের মানুষ কেন পিছিয়ে আছে, কীভাবে তাদের বঞ্চনা দূর করা যাবে, এগুলো এখনো চিহ্নিত হচ্ছে না। তাঁর মতে, জাতীয় উন্নয়নে ওই সব প্রান্তিক মানুষের অংশীদারত্ব নিশ্চিত করতে পারলেই প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব।

এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, আওয়ামী লীগের ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার বেশ কিছু দাবির প্রতি সমর্থন দেওয়া হয়েছিল। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত সঠিক হয়নি।

বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং। এতে বলা হয়, করোনায় সৃষ্ট সংকটে দেশের সমতলের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার শতকরা ৭০ ভাগ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। তাদের সরকারের বিশেষ অর্থনৈতিক প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন।

সঞ্জীব দ্রং বলেন, এসডিজির স্লোগান ‘কাউকে পেছনে ফেলে রাখা নয়’। এসডিজিতে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের কথা বিশেষভাবে বলা হয়েছে। তাই করোনাকালে ও আগামী দিনে এসডিজি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জনগণ এবং তাদের সংগঠনগুলো কীভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে, সেটির উপায় খুঁজে বের করা জরুরি।

প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম সূচনা বক্তব্য দেন।

প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন সাদেকা হালিম বলেন, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা সনাতন ভূমি ব্যবস্থাপনায় বিশ্বাস করে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সেটা খর্ব করা হচ্ছে। বিশেষ করে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে সমতল ও পার্বত্য—দুই ক্ষেত্রেই এমনটি ঘটছে।

বাংলাদেশ আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন বলেন, সমতলের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের ভূমি দখল হতে হতে এখন তাদের কাছে আর জমি নেই। মাত্র ৮ শতাংশ মানুষের কাছে যৎসামান্য জমি আছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটির সভাপতি গৌতম দেওয়ান বলেন, পার্বত্য চুক্তির ২৩ বছর পার হয়েছে, কিন্তু তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। করোনার প্রভাব দীর্ঘদিন থাকবে। এখনই কোনো উদ্যোগ না নেওয়া হলে পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে।

বৈঠকে এএলআরডির উপনির্বাহী পরিচালক রওশন জাহান মনি বিশ্বব্যাপী করোনা সংকটে দেশের পাহাড়ি ও প্রান্তিক মানুষদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার চিত্র তুলে ধরেন।

সভাপতির বক্তব্যে এএলআরডির চেয়ারপারসন খুশী কবির বলেন, জাতীয় উন্নয়নে পাহাড়ি ও সমতলের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার প্রান্তিক মানুষদের কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায় এবং কোভিড সংকটে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য করণীয় বিষয়ে সব মহলে আলোচনা প্রয়োজন। সরকার সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে অংশীদারত্ব নিশ্চিত করতে পারলে কোভিডের ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যাবে। একই সঙ্গে তাদের সব বঞ্চনার সমাধানও করা সম্ভব হবে।

বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন