অনুষ্ঠানের আলোচকেরা হতাশ না হয়ে আইনের খসড়া সংসদে উত্থাপনের বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখার আহ্বান করেন। তাঁরা এ জন্য সরকারকে সাধুবাদ জানান। ৫ এপ্রিল আইনের খসড়াটি সংসদে তোলার পর বিলটি ৩০ দিনের মধ্যে পরীক্ষা করে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে।

আজকের মিডিয়া ব্রিফিংয়ের আলোচকেরা সংসদীয় কমিটির সদস্যদের সঙ্গে দেনদরবার করে আইনটি যাতে শক্তিশালী আইনে পরিণত হয়, তার চেষ্টা চালানো হবে বলে জানান।

আইনের খসড়ায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোন কাজগুলো বৈষম্যমূলক কাজ বলে গণ্য হবে, তা তুলে ধরা হয়েছে। আইনটির অধীনে গঠিত মনিটরিং কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রীকে। এ মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের অধীনে বৈষম্যবিরোধী সেল গঠনের কথা বলা হয়েছে।

আজকের মিডিয়া ব্রিফিংয়ে সভাপতিত্ব করেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের কোর গ্রুপ সদস্য শাহীন আনাম। তিনি বলেন, ২০০৭ সাল থেকে এ ধরনের একটি আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া চলছে। আইনে যে সেন্ট্রাল মনিটরিং কমিটির কথা বলা হয়েছে, তাকে কার্যকর করতে হবে। দ্রুত আইনটির বিধি প্রণয়ন করতে হবে।

মিডিয়া ব্রিফিংয়ে সূচনা বক্তব্য ও সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, আইনের খসড়া জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হওয়াকে আন্দোলনের সাফল্য বলা যায়। এখন এটিকে সুষ্ঠু রূপ দিতে হবে। তাই আন্দোলন শেষ হয়ে গেছে, তা বলার উপায় নেই।

শাহদীন মালিক ২০১৬-১৭ সালে প্রায় ৪৫টি আইন পর্যালোচনার কথা উল্লেখ করে জানান, সংসদে উত্থাপিত বিল এবং পাস হওয়া আইনে কোনো পরিবর্তন খুঁজে পাননি। সংসদীয় ড্রাফটিং বিভাগে টুকটাক ভাষা সংশোধন করা হয় শুধু।

শাহদীন মালিক বলেন, পুলিশ-আমলাতন্ত্রের ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য আইন প্রণয়ন করা হয়। বর্তমান আইনটির খসড়াতেও জাতীয় কমিটিসহ বিভিন্ন কমিটিতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সদস্যদের সংখ্যাই বেশি রাখা হয়েছে। এই সদস্যরা এমন বহু আইনের কমিটিতে আছেন। তাই তাঁরা সভা করারও সময় পাবেন না। আইনে মনিটরিং সেল গঠনের কথা বলা হয়েছে, এতে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে জনবলকাঠামো তৈরি করতে হবে। এ কাজেই চলে যাবে ৮ থেকে ১০ বছর। তবে এতে আরও কিছু সরকারি কর্মকর্তার চাকরির ব্যবস্থা হবে।

শাহদীন মালিক বলেন, আইনে বলা আছে জেলা, বিভাগীয় ও জাতীয় কমিটির কাছে প্রতিকার না পেলে, অর্থাৎ একজন ব্যক্তিকে নোয়াখালী-চট্টগ্রাম-ঢাকা পর্যন্ত আসতেই তিন বছর পার করতে হবে। এরপর প্রতিকার না পেলে যাবেন আদালতে। অন্যদিকে আইনটিতে প্রতিকার কোন আদালতে চাওয়া হবে, তা–ও স্পষ্ট করা হয়নি।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান আলোচনায় বলেন, ‘আইনটি নিয়ে আশাবাদী হতে চাই, তবে বাস্তবে আশাবাদী হতে পারছি না।’ তিনি বলেন, আইনটিতে বৈষম্যের যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা অসম্পূর্ণ। সেল গঠন, কমিটি গঠনের কথা বলা হলেও তার ব্যাখ্যা–বিশ্লেষণ নেই। ফলে অপব্যবহার হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তি, গায়ের রঙের কারণে প্রতিনিয়ত যে বৈষম্যের শিকার হতে হয়, এ বিষয়গুলোকে আইনে সম্পৃক্ত করা হয়নি। ভূমির মালিকানার ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সদস্যদের প্রথাগতভাবে ভূমির মালিক হওয়ার বিষয়টি আইনে স্পষ্ট করতে হবে।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আইনে আলোচনার মাধ্যমে প্রতিকার পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে গবেষণার তথ্য বলছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আলোচনাকারীরা অভিযুক্ত ব্যক্তির পক্ষে থাকেন। তাই বলা যায়, এই বৈষম্যকে আইনি ভিত্তি দেওয়া হচ্ছে আইনটিতে। শুধু কোম্পানিকে বৈষম্যমূলক কাজের জন্য দায়ী করলে হবে না, রাষ্ট্রীয়-অরাষ্ট্রীয় সংগঠনকে আইনে যুক্ত করতে হবে। আইনটি বাস্তবায়নে আলাদা কমিশন গঠন না করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কার্যপরিধি বাড়িয়ে এ কমিশনের সঙ্গে যুক্ত করার সুপারিশ করেন তিনি।

বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন বলেন, আইনের খসড়াটিতে ভাষাগত বিভিন্ন সমস্যা আছে। এখানে তৃতীয় লিঙ্গ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যা নিয়ে প্রশ্ন আছে। আইনটির উদ্দেশ্য ও কারণসংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দেশে কোনো বৈষম্যমূলক আইন নেই। অথচ সাক্ষ্য আইনে ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাচ্ছে, নারীরা কাজি হতে পারছেন না, ভিন্ন ধর্মের নারীদের বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদসহ বিভিন্ন বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন বৈষম্যমূলক আইন বিদ্যমান, বিশেষ বিবাহ আইনে ধর্মত্যাগের ঘোষণা দিতে হচ্ছে, বিসিএস রুল, জুডিশিয়াল সার্ভিস রুল বিভিন্ন জায়গায় বৈষম্য রয়ে গেছে। এগুলো স্বীকার করে তাতে পরিবর্তন না আনলে সমাজ থেকে বৈষম্য বিলোপ হবে না।

আইনের খসড়ায় কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে কোনো বৈধ পেশা বা চাকরি গ্রহণ বা বৈধ ব্যবসা পরিচালনা থেকে নিষিদ্ধ করাকে বৈষম্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে সারা হোসেন বলেন, এতে করে যৌনকর্মীরা আইনটির সুফল পাবেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কেননা, যৌন পেশা বৈধ না অবৈধ, তা–ই তো স্পষ্ট করা হয়নি।

ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ফস্টিনা পেরেইরা বলেন, গত কয়েক দশকে আগের তুলনায় ধর্মান্ধ জনগোষ্ঠীর আক্রমণে সহিংসতা বেড়েছে, সংগঠিতভাবে আক্রমণের ঘটনা বেড়েছে। রাগের মাথায় কিছু একটা করে ফেলছে, তা হচ্ছে না, আক্রমণগুলো হচ্ছে ভেবেচিন্তে। এই আইনে এ বিষয়ের প্রতিকার আছে কি না, দেখতে হবে। শিয়া-আহমদিয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে দ্বন্দ্ব, তার প্রতিকার আছে কি না, তা–ও দেখতে হবে।

ফস্টিনা পেরেইরা বলেন, আইন অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকেই অভিযোগ করতে হবে। আলোচনার মাধ্যমে প্রতিকারের ব্যবস্থা করা হবে। আইনের আওতায় কমিটি নিজে থেকে কোনো উদ্যোগ নেবে না। তিনি অন্তঃসত্ত্বা নারীদের সঙ্গে চাকরিক্ষেত্রসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়, তাকে আইনের আওতায় আনার কথা বলেন।

একইভাবে এইচআইভি/এইডসে আক্রান্ত ব্যক্তি, শুধু বৈবাহিক সম্পর্ক না বৈবাহিক অবস্থা, অর্থাৎ বিয়ে করেননি বা করতে চান না, এ ধরনের ব্যক্তিদের ঘর ভাড়া না পাওয়াসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়, তাকেও আইনে সম্পৃক্ত করতে হবে বলে উল্লেখ করেন।

নাগরিক উদ্যোগের নির্বাহী প্রধান জাকির হোসেন বলেন, স্বাধীনতার ৫০ বছর পর আইনটির খসড়া সংসদে উত্থাপনের বিষয়টিকে বলা যায় সামাজিক ন্যায়বিচার এক ধাপ এগোল। আইনটিতে শাস্তির বিধান রাখা হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে আইনটির বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।