default-image

প্রায় চার বছর আগে রাজধানী বাড্ডার আফতাবনগরে নিজ ফ্ল্যাটে খুন হন মনজিল হক (২৮)। খুনের পর তাঁর চাচা ফারুক মিয়া বাদী হয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের নামে মামলা করেন। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) তদন্তে উঠে আসে, সম্পত্তির লোভে মনজিলকে খুন করা হয়। আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনে সিআইডি জানিয়েছে, মনজিল হক হত্যাকাণ্ডের ‘মূল হোতা’ হলেন তাঁর সৎভাই ইয়াসিন হক (২৫) ও সৎমা লায়লা হাসান।

মনজিলকে খুন করার কথা স্বীকার করে সম্প্রতি ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন ইয়াসিন হক ও ‘ভাড়াটে খুনি’ রবিউল। তাতে উঠে এসেছে, কীভাবে এবং কেন ইয়াসিন ভাড়াটে খুনিদের সঙ্গে নিয়ে মনজিলকে হত্যা করেন। ইয়াসিন বর্তমানে কারাগারে আছেন। তাঁর মা লায়লা পলাতক বলে জানিয়েছে পুলিশ।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক মো. শামসুদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, মনজিল হক খুনের পরিকল্পনাকারী তাঁর সৎভাই ইয়াসিন হক ও তাঁর মা লায়লা হাসান। এ ছাড়া আরও কয়েকজন এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনায় ছিলেন বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন।

বিজ্ঞাপন

এই মামলার বাদী ফারুক মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশ যখনই তাঁকে ডাকবে, তিনি সেখানে গিয়ে হাজির হবেন। তিনি জানতে পেরেছেন, মনজিল হককে খুন করার কথা স্বীকার করে ইয়াসিন আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।

মনজিল হক ২০১৭ সালের ১১ ডিসেম্বর খুন হন। এর মাত্র ছয় মাস আগে তাঁর ব্যবসায়ী বাবা এ কে এম মইনুল হক হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান। মনজিলের বয়স যখন তিন বছর, তখন তাঁর মা মারা যান। এরপর তাঁর বাবা আবার বিয়েও করেন। সেই ঘরে ইয়াসিন হকের জন্ম হয়।

সৎভাই ও সৎমাকে মূল হোতা বলছে সিআইডি

মামলার কাগজপত্র এবং সিআইডির তথ্য বলছে, মনজিল হককে খুন করার পর হত্যাকাণ্ডে জড়িত ইয়াসিনসহ অন্যরা তাঁদের মুঠোফোন ধ্বংস করে ফেলেন। ইয়াসিন চলে যান চট্টগ্রামে। পরে সেখান থেকে তিনি খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি যান। ইয়াসিন প্রথমে নিজের নাম পরিবর্তন করেন। মনজিলকে খুন করার আগের দিন নিজ বাসায় একটি বৈঠক হয়। সেখানে চারজন ভাড়াটে খুনি ছাড়া আরও কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। যাঁরা সবাই ইয়াসিনের নিকটাত্মীয়।

এই খুনের মামলায় মনজিলের বান্ধবী শারমিন আক্তার নামের এক নারী আদালতে সাক্ষী হিসেবে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। যোগাযোগ করা হলে শারমিন আক্তার এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

মনজিল যে বাসায় খুন হন সে বাসার নিরাপত্তারক্ষী আবুল কালাম প্রথম আলোকে বলেন, মনজিল খুন হওয়ার মাত্র ১৫ মিনিট আগে চারজন যুবককে তাঁর কক্ষে ঢুকতে দেখেন। ওই যুবকেরা চলে যাওয়ার পর মনজিলের বান্ধবী ওই বাসায় ঢুকেছিলেন। মনজিলের বান্ধবী চিৎকার দিলে তিনি গিয়ে মনজিলের লাশ দেখতে পান।
সিআইডির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পাঁচ লাখ টাকার বিনিময়ে ভাড়াটে খুনিরা মনজিল হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়। খুনে সরাসরি অংশ নেন ইয়াসিন। আর হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা হলেন ইয়াসিন হক ও তাঁর মা লায়লা ইয়াসমিন।

খুনের দায় স্বীকার করে ভাড়াটে খুনি রবিউলও আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

সিআইডি কর্মকর্তা শামসুদ্দিন বলেন, মনজিল হত্যাকাণ্ডে এখন পর্যন্ত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। যত দ্রুত সম্ভব এই খুনের মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।

সম্পত্তির লোভে খুন

মামলার কাগজপত্র এবং পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মনজিল হক ‘ও’ লেভেল পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। এরপর তিনি গাড়ির ব্যবসা শুরু করেন। খুন হওয়ার পাঁচ বছর আগে বিয়ে করেন মনজিল। তবে দুই মাস যেতে না যেতেই বিচ্ছেদ হয় তাঁদের। পরে বাবার কেনা আফতাব নগরের ফ্ল্যাটে তিনি একা বসবাস করতেন। ঘটনার দিন (২০১৭ সালের ১১ ডিসেম্বর) মনজিল নিজ বাসায় ছিলেন। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে চারজন যুবক তাঁর বাসায় ঢোকেন। এর ১৫ মিনিট পর তাঁরা বেরিয়ে যান। পরে মনজিলের বাসায় ঢোকেন তাঁর এক বান্ধবী। তিনিই প্রথম দেখেন মনজিলের লাশ।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির শামসুদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, বাবার মৃত্যুর পর থেকে ইয়াসিন তাঁর সৎভাই মনজিলকে খুন করার ষড়যন্ত্র করেন। মনজিল তাঁর বাবার কেনা একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন। অপরদিকে ইয়াসিনরাও তাঁর বাবার কেনা আরেকটি ফ্ল্যাটে বনশ্রী এলাকায় বসবাস করতেন। সম্পত্তির লোভে ইয়াসিনসহ অন্যরা মনজিলকে হত্যা করেন।

বিজ্ঞাপন
রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন