কথাগুলো হাসনাইনের বাবা ফজলুল হকের। ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। পুড়ে যাওয়া অনেক লাশের মধ্যে রয়েছে তাঁর ১২ বছরের ছেলেটির লাশও। কিন্তু সেটা কোনটা, তা বোঝার উপায় নেই। তাই নমুনা দিতে এসেছেন ফজলুল হক। ডিএনএ মিললে নিয়ে যেতে পারবেন ছেলের লাশ। সেটা কত দিনে হবে তা–ও জানেন না তিনি।

হাসনাইন ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার দক্ষিণ আমিনাবাদ কবি মোজাম্মেল হক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। বাবা ফজলুল হক কৃষক। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে কাজ করতে পারছিলেন না। বাবার কষ্ট দেখে হাসনাইন নিজেই নারায়ণগঞ্জে কাজ করতে আসার সিদ্ধান্ত নেয়।

বাবা ফজলুল হক বলেন, ‘ওরে বলেছিলাম, “বাবা, তোমার তো এখন লেখাপড়ার বয়স। তুমি কাজ করতে পারবে না।’ সে আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিল, “তুমি চিন্তা করো না। তোমার কষ্ট আমি আর সইতে পারছি না। আমি কাজ করে তোমার চিকিৎসা করাব। আর এখন তো স্কুল খোলা নেই। স্কুল খুললে আবার চলে আসব”।’

এক মাস আগে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের হাসেম ফুডস লিমিটেডের কারখানায় পাঁচ হাজার টাকা বেতনে কাজ নিয়েছিল হাসনাইন। কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে হাসনাইনের আর কোনো খোঁজ নেই।

ফজলুল হকের সঙ্গে মর্গে এসেছেন হাসনাইনের খালা লাইজু বেগম। তিনি জানান, হাসনাইনের বাবা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। তাঁর পেটে টিউমার হয়েছে। কোনো কাজ করতে পারেন না। হাসনাইনের বড় দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। মা নাজমা বেগম গৃহিণী। গত বৃহস্পতিবার আগুন লাগার পর হাসনাইন নিখোঁজ হয়। তার কাছে কোনো মুঠোফোন ছিল না। সে থাকত চাচাতো ভাই রাকিবের সঙ্গে। ঘটনার পর রাকিবকেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

বৃহস্পতিবার বিকেলে হাসেম ফুডস লিমিটেডের কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুনের ঘটনায় প্রথম দিন তিনজনের মৃত্যু হয়। আহত হন অর্ধশত শ্রমিক। ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের ১৮টি ইউনিট ২০ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে গতকাল শুক্রবার আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর ওই ভবনের চারতলা থেকে ২৬ নারীসহ ৪৯ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। সব মিলিয়ে এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৫২ জনের প্রাণহানি হয়েছে।

আজ সকাল থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গের সামনে নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনেরা ডিএনএ নমুনা দিচ্ছেন। নমুনা সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) জানায়, বেলা ১টা পর্যন্ত ৩০ জনের মরদেহ শনাক্তের জন্য ৪২ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।